রাজধানীর বাড্ডা, বিশেষ করে সাঁতারকুল ও উত্তর বাড্ডা এলাকা একসময় ছিল শান্ত আবাসিক অঞ্চল। কিন্তু বর্তমানে এই এলাকাগুলো অনিয়ন্ত্রিত ফার্নিচার কারখানার কারণে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা অসংখ্য অনুমোদনহীন কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, রাসায়নিক গন্ধ এবং তীব্র শব্দ স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।
৫০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন বাতাসে কাঠের গুঁড়া উড়তে দেখে এবং প্রায় ৮৮ শতাংশ শিশু নিয়মিত কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও এলাকাবাসীর দাবি)। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, বাতাসে ভাসমান কেমিক্যালের কারণে তাদের চোখে জ্বালাপোড়া হয় এবং শরীরে চুলকানি সৃষ্টি হয়। শিশুদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র—‘স্কুলে যেতে কষ্ট হয়’, ‘শ্বাস নিতে সমস্যা হয়’, ‘খেলতে গেলেই অসুস্থ লাগে’।
ফার্নিচার কারখানাগুলোয় ব্যবহৃত থিনার, লেকার এবং আঠা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকে। এসব উপাদান শিশুদের ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে (প্রতিদিনের সংবাদ : বায়ুদূষণ ও সিসার প্রভাববিষয়ক প্রতিবেদন)। জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু চোখে জ্বালাপোড়া ও ত্বকে অস্বস্তির কথা বলেছে। অনেক শিশু বলেছে, ‘চোখ লাল হয়ে যায়’; ধোঁয়ার গন্ধে মাথাব্যথা করে’—যা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ছে। প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা মনোযোগের সমস্যায় ভুগছে এবং অস্থিরতা অনুভব করে। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু দূষণের কারণে বাইরে খেলাধুলা করতে ভয় পায়। ফলে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিসেফ ও এসওজিএর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের পেছনে বায়ুদূষণ একটি বড় কারণ (ইউনিসেফ ও এসওজিএ প্রতিবেদন, জুন ২০২৪)।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও এই দূষণের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। আইডিয়াল হোমস স্কুল, সাঁতারকুল স্কুল এবং বাড্ডা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের শিক্ষকদের মতে, দূষণের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে এবং তারা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও এলাকাবাসীর দাবি)। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থতার কারণে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারছে না।
অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকরা কারখানার ভেতরেই বসবাস করে। তারা সেখানেই রান্না করে, ঘুমায় এবং অনেক সময় মশা তাড়াতে বা শীত নিবারণে কাঠ জ্বালায়, যা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায় (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪ : সাঁতারকুলে অগ্নিকাণ্ড প্রতিবেদন; বাড্ডা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের তথ্যচিত্র)। ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর সাঁতারকুলে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা পুরো এলাকার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪ প্রতিবেদন)।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব কারখানায় কোনো নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মানা হয় না। গভীর রাত পর্যন্ত চলে করাত, ড্রিল মেশিন ও পালিশের কাজ। এতে শিশুদের ঘুম ব্যাহত হয় এবং রোগীদের কষ্ট বাড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ‘রাতে শব্দে ঘুমানো যায় না’, ‘বাচ্চারা পড়াশোনা করতে পারে না’, ‘রাস্তায় বের হলেও নিরাপত্তা নেই’।
জরিপে শিশুদের মতামতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে। অনেক শিশু বলেছে, ‘কারখানা বাড়ি থেকে দূরে সরানো উচিত’, ‘দূষণ বন্ধ করতে হবে’, ‘আইন মেনে কারখানা চালাতে হবে’। প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি শিশু মনে করে, মানুষ এই সমস্যা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয় এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। তারা আরো বলেছে, ‘আমরা পরিষ্কার বাতাস চাই’, ‘নিরাপদে খেলতে চাই’, যা তাদের মৌলিক অধিকারের প্রতিফলন।
এ ছাড়া এলাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবনেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সরু রাস্তায় পিকআপ ভ্যান ঢুকে যানজট সৃষ্টি করছে, রাস্তায় লোহা ও কাঠের টুকরা পড়ে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। নর্দমায় কাঠের গুঁড়া ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এমনকি আশপাশের খাল-বিলের পানির রং ও গন্ধ পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, আবাসিক এলাকা থেকে এসব কারখানা সরিয়ে শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করতে হবে (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ)। দ্বিতীয়ত, কারখানায় আধুনিক ফিল্টার ও এগজস্ট সিস্টেম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে বায়ুদূষণ কমানো যায় (প্রতিদিনের সংবাদ প্রতিবেদন)। তৃতীয়ত, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার ডিটেক্টর ও নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন জরুরি (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪; অগ্নিকাণ্ড বিষয়ক তথ্যচিত্র)। চতুর্থত, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে (ইউনিসেফ ও এসওজিএ প্রতিবেদন)। একই সঙ্গে শিশুশ্রম বন্ধ করা এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, বাড্ডা ও সাঁতারকুল এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। অবহেলা ও অনিয়মের কারণে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই সমস্যা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। শিশুদের নিরাপদ, সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশব নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : উপপরিচালক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স (বিটিএস)



এই অপরাধ কেন টিকে থাকে এবং বাড়তে থাকে তা বোঝার জন্য কারণগুলোর একটি সৎ ও নির্ভীক পরীক্ষা দরকার

সবাই যে তোফায়েল আহমেদকে চেনেন, আমরা সেই তোফায়েল আহমেদকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম। সেদিন বলেছিলাম, ১৯৬২ সাল থেকে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়। সেদিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক সাক্ষাৎকারে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের স্কাউট জাম্বুরিতে তাঁর সঙ্গে দেখা। ১৯৬২ নয়, ওটা ১৯৫৮ সালই হবে। সেই স্কাউট জাম্বুরির পর তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে লতিফ ভাইয়ের শত শত চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। তখন সবারই চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় প্রায় ৬০ হাজার চিঠি পেয়েছি। আমিও তার উত্তর দিয়েছি। হয়তো দু-এক হাজারের উত্তর না-ও দেওয়া হতে পারে। আগের দিনে চিঠি ছিল ভাব আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম। এখন মোবাইলের জামানায় কে চিঠি লেখে? দরকারি চিঠিও লেখা হয় না। সবাই ফোনে ফোনে। উনসত্তরের ছাত্র গণ-আন্দোলনে প্রথম যেদিন হঠাৎই তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বের কথা শুনে হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠেছিল। বড় ভালো লাগে, ভীষণ উৎসাহ পাই। একের পর এক আন্দোলনকারী ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ আহত-নিহত হতে থাকে। পুরান ঢাকায় মতিউর রহমান শহীদ হন। আন্দোলন আরো বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত আসাদের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল হয়। আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের অঞ্চলও উত্তাল হয়ে ওঠে। লতিফ ভাই ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে। আমরা আন্দোলন করছি তো করছিই। এর মধ্যে উনসত্তরের পয়লা ফেব্রুয়ারি হঠাৎই আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। আবু আহমেদ আনোয়ার বক্স, শামীম আল মামুন ও আমাকে গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। টাঙ্গাইলে যে ছোট্ট কারাগার, তাতে রাজবন্দিদের তেমন রাখা হতো না। দু-তিন দিন পর সা