ঈদে মুক্তি পাওয়া তিনটি চলচ্চিত্র নিয়েই দর্শকের আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। তার উত্তাপ লেগেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দর্শক হলে গিয়ে ছবি দেখছে, ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনাও করছে। কিন্তু কী দেখছে তারা? ঈদের তিন ছবি দেখে এসে লিখেছেন জাতীয় পুরস্কার পাওয়া কাহিনিকার ও পরিচালক ছটকু আহমেদ দিন—দ্য ডে পরিচালনা : মুরতেজা অতাশজমজম গল্প : অনন্ত জলিল অভিনয় : অনন্ত জলিল, বর্ষা, সুমন ফারুক, মিশা সওদাগর, রেজা হেদায়িতি (ইরান), আদেম আরসলান (ইরান) প্রমুখ প্রযোজনা : মুনসুন ফিল্মস ও ফরাবি সিনেমা ফাউন্ডেশন (ইরান) ওয়ানম্যান শো এই ছবি নিয়ে লেখার আগে একটা ছোট ভূমিকা আছে। অনন্ত জলিল আমাকে দ্বিগুণ সম্মানী দিয়ে চুক্তিবদ্ধ করেছিলেন ২০১৮ সালে, পাণ্ডুলিপিটা আমি লিখে শেষ করি ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। প্রায় তিন শ ছবির চিত্রনাট্য করেছি আমি, একনাগাড়ে এত দীর্ঘকাল ধরে কোনো ছবির কাজ করিনি। দিনের পর দিন তাঁর অফিসে, বাসার জিমনেসিয়ামে অনন্ত, আমি, একজন ইসলামী পণ্ডিত আর অনন্তর একজন ব্যবসায়ী বন্ধু সুমন ফারুক বসে গল্পটা ঠিক করেছিলাম। গল্পের মূল বিষয় ইসলামে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। ইসলাম কখনোই টেররিজম সমর্থন করে না। তখনই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ছবির খবর এসেছিল। হঠাৎ একদিন ইরান দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে জানালেন, এই ছবির সঙ্গে তাঁরা থাকতে চান। আমি অনন্তকে বললাম। তিনি রাজি হলেন। পরে অনন্ত ইরান সফর করে এলেন, আমাকেও নিতে চেয়েছিলেন। ব্যস্ততার কারণে যেতে পারিনি। ইরান থেকে পরিচালক মুরতেজা অতাশজমজম এলেন। ফার্সি ছাড়া উনি ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা কিছুই জানেন না। অনন্তর বাসায় ল্যাপটপের সঙ্গে বড় পর্দা লাগিয়ে স্ক্রিপ্টের কাজ করলাম। পুলিশ, র্যাব বা সেনাবাহিনী নিয়ে কোনো দৃশ্য লিখতে বসলেই অনন্ত বড় কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ঠিকঠাক করে নিতেন। আমরা যা লিখতাম সেটা ইরানে যেত, সেখানে ইরানি ভাষায় অনুবাদ করে অতাশজমজমকে শোনানো হতো। বছরব্যাপী অনন্ত তাঁর মতো করে চিত্রনাট্য করিয়ে নেন। পাণ্ডুলিপি ফাইনাল হওয়ার পরও তিনি নিজেই কারেকশন করেন নিজের মতো করে। সুতরাং কেউ যদি বলেন, ছটকু ভাই এটা কি আপনার স্ক্রিপ্ট? আমি বলি, না এটা অনন্তর স্ক্রিপ্ট। তিনি এই ছবি নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন এবং সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। ছবির সফলতা, ব্যর্থতা সবই তাঁর প্রাপ্য। ‘দিন—দ্য ডে’ থ্রিলার অ্যাকশন ছবি। তুরস্কে ভয়ংকর বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে এক সাংবাদিককে উদ্ধার করে অনন্ত, গল্পের শুরু এখানে। সাংবাদিকের কাছ থেকে জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল মাফিয়া গ্রুপের অন্যতম আর্মস ডিলার মাজেদির কিছু রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে সে বিপদে পড়েছিল। সাংবাদিক কৃতজ্ঞচিত্তে অনন্তর পরিচয় জানতে চায় এবং তখন জানা যায় অনন্ত বাংলাদেশের একজন তুখোড় পুলিশ অফিসার। ইন্টারপোল হেডকোয়ার্টার থেকে রেড অ্যালার্ট নোটিশের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুলিশের কাছে ইনফরমেশন এসেছে যে তুর্কিতে চাকরিরত বাংলাদেশি কিছু পরিবার কিডন্যাপ হয়েছে। একদল মাফিয়া তাদের ধরে আফগানিস্তান নিয়ে জিম্মি করে, তাদের সন্তানদের পেট কেটে তার মধ্যে ভরে ড্রাগস সাপ্লাই করে। তাদের রক্ষা করে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ পুলিশ দায়িত্ব দেয় অনন্তকে। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে রেখে দেশের কাজে অজানা বিপদসংকুল পথে পাড়ি দেয় সে। তুরস্ক ইন্টাপোলের কর্মকর্তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের এক কর্মকর্তাকে নিয়ে আফগানিস্তান যায় অনন্ত। মিশন শেষে দেশে ফিরে আসে সে। ছবির পুরোটাই চেজিং অ্যাকশন থ্রিলে ভরপুর। ‘দিন—দা ডে’কে এককথায় বলা যায় ওয়ানম্যান শো। বাংলাদেশ, ইরান, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের নয়নাভিরাম লোকেশনে হয়েছে শুটিং। বাংলাদেশের কোনো ছবিতে দর্শক আগে এমন সুন্দর লোকেশন দেখেনি। ইমরানের সুরে ইমরান ও আনিসার গাওয়া স্নেহাশীষ ঘোষের লেখা গান ‘তোকে রাখবো আদরে, তুই যে আমার প্রিয়তমা’ ও তারেক আনন্দের লেখা ইমরানের সুরে ও কণ্ঠে ‘তার বর্ষার চোখে ঝরতে দেব না বৃষ্টি’র দৃশ্যায়ন চোখজুড়ানো। আরমানের ফাইট তো চোখ-ধাঁধানো। লোকেশনের মতো দৃশ্যায়নও ভালো। শব্দ গ্রহণের তো তুলনা হয় না। ভারতের ‘বাহুবলী’ ছবির কাজ যে স্টুডিওতে হয়েছে, সেই অন্নপূর্ণা স্টুডিওতে ‘দিন—দা ডে’র সাউন্ড রেকর্ডিং, এডিটিং নিখুঁতভাবে করা হয়েছে। সহযোগী পরিচালক জামাল, এডিটর একরামুল হক, ফাইট ডিরেক্টর আরমান, ডান্স ডিরেক্টর হাবিব রহমান সুচারুভাবে কাজ করেছেন। অভিনয়ে দিনে দিনে উন্নতি করেছেন অনন্ত। টাকার জন্য তিনি সিনেমা করেন না, ভালোবাসার জন্যই করেন। ছবিতে সব কিছুই আছে, নেই শুধু আবেগ। নেই হাসি-কান্না, নেই গল্পের ধারাবাহিকতা। তাই পৃথিবীর সব জায়গায় যদি এই ছবি হিটও হয়, বাংলাদেশে সে রকম ব্যবসা করবে কি না সন্দেহ আছে। পাণ্ডুলিপি লেখার সময় অনন্ত বলতেন, ‘আমি আমেরিকান ছবি বানাব, সংলাপ কম অ্যাকশন বেশি।’ কিন্তু বাংলাদেশি দর্শক এই ধরনের ছবি পছন্দ করবে কি না সেটা আরো কিছুদিন গেলে বোঝা যাবে। এখন পর্যন্ত ছবির সেল রিপোর্ট ভালো। আর এই ভালোর সব ক্রেডিট অনন্ত জলিলের। পরাণ পরিচালনা : রায়হান রাফি গল্প ও চিত্রনাট্য : শাহজাহান সৌরভ অভিনয় : বিদ্যা সিনহা মিম, শরীফুল রাজ, ইয়াশ রোহান, শহীদুজ্জামান সেলিম, রোজী সেলিম প্রমুখ প্রযোজনা : লাইভ টেকনোলজিস পরাণ দেখে পরাণ ভরেছে ছবিটা দেখে এককথায় বলতে হয়, পরাণটা ভরে গেছে। এই ধরনের ছবি নিয়মিত নির্মিত হতে থাকলে চলচ্চিত্রের পুনর্জাগরণ হবেই হবে। মাস্তান রোমানের ভয়ে কলেজছাত্রী অনন্যার লেখাপড়া শিকেয় ওঠে। বারবার ফেল করতে থাকে সে। বাড়িতে বাবার বকা শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে সে। অনন্যা শেষে চালাকির আশ্রয় নেয়। মাস্তান রোমানকে ভালোবাসার কথা বলে তাকে দিয়ে কলেজের ভালো ছাত্রকে ভয় দেখিয়ে লেখাপড়ার নোট নেয়, শিক্ষককে ভয় দেখিয়ে ভালো নম্বর পেয়ে পাস করে। কিন্তু অনন্যা এরই মধ্যে কলেজের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র সিফাতের প্রেমে পড়ে যায়। সিফাত অনন্যাকে এড়িয়ে চলে। অনন্যা সিফাতকে কিছুতেই বশ করতে না পেরে মাস্তান রোমানের সহযোগিতা নেয়। রোমান ভয় দেখিয়ে সিফাতকে বাধ্য করে অনন্যাকে প্রাইভেট পড়াতে। সিফাতকে কাছে পেয়ে অনন্যা তার প্রেমে আরো মশগুল হয়ে ওঠে। দুই নৌকায় চড়ার মতো করে অনন্যা রোমানের সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে, আর সিফাতকে কাছে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। এদিকে রোমানকে দুর্বল করার জন্য দলের পদ ছাড়তে বাধ্য করে অনন্যা, এমনকি নেশাও ছাড়িয়ে দেয়। এতে রোমানের সঙ্গে তার ‘গডফাদার’ এলাকার প্রভাবশালী নেত্রীর বিরোধ হয়। নেত্রী তার প্রভাব খাটিয়ে পুলিশকে দিয়ে রোমানকে গ্রেপ্তার করায়। এই সুযোগে অনন্যা জোর খাটিয়ে সিফাতকে বিয়ে করে। জেলে বসেই রোমান জানতে পারে তার ভালোবাসার অনন্যা তাকে ছেড়ে সিফাতকে বিয়ে করে সংসার করছে। জেল থেকে পালিয়ে অনন্যাকে নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে চায় সে। বাধা দেয় সিফাত। ক্ষিপ্ত হয়ে রোমান কুপিয়ে হত্যা করে সিফাতকে এবং আত্মগোপন চলে যায়। বন্ধু তোজো রোমানকে দেশত্যাগে সহযোগিতা করবে বলে ডেকে এনে গুলি করে হত্যা করে। এই হলো গল্প। গল্পটা শুরু হয় পুলিশ রিমান্ডে। অনন্যাকে একের পর এক জেরা করে পুলিশ। একেবারে শেষে পুলিশ অফিসার অনন্যাকে সারপ্রাইজ দেয়। তোজোকে গ্রেপ্তার করে অনন্যার মুখোমুখি করায়, তখন জানা যায় অনন্যাই তোজোকে দিয়ে রোমানকে খুন করিয়েছে! এই ছবির গল্পের গতিময়তা খুবই চমৎকার। শেষের দুই-এক জায়গা ছাড়া কোথাও গল্প থেমে থাকেনি, টুইস্টের পর টুইস্ট এবং ব্যতিক্রমী ঘটনাপ্রবাহ ছবিটিকে সিনেমাটিক করে তুলেছে। প্রথম শট থেকেই মনে হচ্ছে একটা সিনেমা দেখতে বসলাম। সিনেমার নামকরা শিল্পীদের ভিড় এখানে কমই। বেশির ভাগই টিভি ও মঞ্চ নাটকের শিল্পী। সবাই সাবলীল অভিনয় করেছেন। একমাত্র রোজী সেলিমের চরিত্রটা মনে হয়েছে রোপণ করা, আর সব চরিত্র মনে হয়েছে আমাদের আশপাশ থেকে তুলে আনা চরিত্র। মধ্যবিত্ত পরিবারের যে ছবি তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে, মনে হবে যেন আমার, আপনার পরিবারের চিত্র। ঘরের ভেতর শোবার ঘরে, খাবার টেবিল, ছাদে কবুতর, ছোট বারান্দায়, চিলেকোঠায়, জানালার পাশে চিত্রায়িত দৃশ্যগুলো খুবই আপন মনে হয়েছে। মনে হয়েছে আমাদেরই কারো না কারো বাসা। আবার ঘরের বাইরের দৃশ্যগুলো চিত্রায়ণ করা হয়েছে আমাদেরই চেনা পরিবেশে। কোথাও মনে হয়নি এটা একটা উদ্ভট লোকেশন। মহল্লার রাস্তা, স্টেশন, ট্রেনের বগি, বাড়ির রোয়াক, বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা মারার জায়গা কোনোটাই অলৌকিক কিছু মনে হয়নি। একেবারেই বাংলাদেশের গল্পের ছবি। এমনকি যেসব ফাইট সংযোজন করা হয়েছে, তারও একটা পরিমিতিবোধ লক্ষ করা গেছে। একটি সত্যি ঘটনার আলোকে গল্প সাজিয়েছেন রায়হান রাফি ও শাহজাহান সৌরভ। পরিচালক রায়হান রাফি নিজে চিত্রনাট্য করেছেন। চিত্রগ্রহণ করেছেন মিছিল সাহা। নায়কের বুকে নায়িকা এসে পড়ল আর শুরু হয়ে গেল গান—সেই ধরনের গান নেই ছবিতে। সব গানই গল্পের পরিবেশ অনুযায়ী। তবে এখনকার গান দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু হলের বাইরে এলে মনে থাকে না। গান, চিত্রগ্রহণ, এডিটিং ও সাউন্ড চমৎকার। যেভাবে চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছে, একজন লেখক হিসেবে বাহবা না দিয়ে পারছি না। সংলাপও তুলে এনেছেন একেবারে আমাদের কথার মধ্যে থেকে। মাঝে মাঝে কিছু স্ল্যাং ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোও এসেছে চরিত্রানুযায়ী। স্কুলের মাস্টার যে ভাষায় কথা বলবে, তেমন ভাষায় তো ফুটপাতের মাস্তান কথা বলবে না। ‘পরাণ’ প্রমাণ করেছে তারকা শিল্পী দিয়ে ছবির প্রতিযোগিতা হয় না। প্রতিযোগিতা হয় ছবির মেকিং দিয়ে। ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ হচ্ছেন পরিচালক। তিনি মাটি দিয়ে বদনাও বানাতে পারেন, পুতুলও গড়তে পারেন, লক্ষ্মী বানাতে পারেন। যত বড় তারকা শিল্পীই হোক, কোটি কোটি টাকা খরচ করা হোক না কেন—পরিচালনা ভালো না হলে সুফল আসে না। যত দামি মসলা আপনি ব্যবহার করেন না কেন, বাবুর্চি ভালো রাঁধতে না পারলে তা কোনো খাবার বস্তু হয় না। সেসব বিচার করতে গেলে ‘পরাণ’ সব দিক দিয়েই সেরা। সাইকো গল্প ও পরিচালনা : অনন্য মামুন অভিনয় : পূজা চেরি, জিয়াউল রোশান, শহীদুজ্জামান সেলিম, রোজী সেলিম প্রমুখ প্রযোজনা : শাপলা মাল্টিমিডিয়া নামের সার্থকতা খুঁজে পাইনি একটা প্রবাদ আছে, ‘মক্কার মানুষ হজ পায় না।’ সেটার প্রমাণ পেলাম ছবিটি দেখতে গিয়ে। অনেক সফল ছবির গল্পকার অনন্য মামুন নিজের ছবি বানাতে গিয়ে গল্প খুঁজে পায়নি! মেয়ের আবিষ্কার ইনসুলিনের একটা ফর্মুলা নিতে বাবা মেয়েকে বিরাট গ্যাং দিয়ে কিডন্যাপ করানোর আজগুবি গল্প দিয়ে এখনো ছবি হতে পারে তা ‘সাইকো’ না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না। একটা অপহরণের গল্প, অথচ পর্দায় কোনো টেনশন নেই! কোনো ধরনের বিনোদন ছাড়াই সিনেমা যে হয় ‘সাইকো’ না দেখলে সেটাও বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন হয়ে যেত। অনন্য মামুন আমার প্রিয় ছোট ভাই। একসঙ্গে অনেক হিট ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য করেছি। দারুণ সব গল্পের আইডিয়া তার মাথায় ঘুরপাক খায়, কিন্তু সে যে এই গল্পের ঘোরে পড়ে যাবে আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। গল্পটা এ রকম, নাচের একটা প্রগ্রাম থেকে পূজা চেরিকে দিনদুপুরে সবার সামনে দিয়ে কিডন্যাপ করে মুখোশ পরা নায়ক রোশান। মুখোশধারী যেহেতু ছবির হিরো, সেহেতু কিডন্যাপারদের মতো নিষ্ঠুর ব্যবহার না করে পূজাকে খাইয়ে-দাইয়ে প্রেম করে, গান করে পালতে থাকে। সুযোগ পেয়ে পূজা বাইরে বেরিয়ে যায়। রোশান পরে তাকে আবার বুঝিয়ে এনে আটকে রাখে। এদিকে বাবা ও মা মেয়েকে পাওয়ার জন্য থানায় গিয়ে পুলিশ অফিসারকে কয়েকবার টাইম বেঁধে দিয়ে শাসিয়ে আসে। এদিকে কিডন্যাপার রোশান নিজেই পূজাকে বাসায় দিয়ে আসে, পরে জানা যায় রোশান নিজেই পুলিশ অফিসার। আরো জানা যায়, এই মেয়ের অপহরণটা তারই বাবার কাজ। পূজা ও তার বন্ধুরা একটা ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিল এবং তার পেটেন্ট নিতে এত সব কর্মকাণ্ড। শেষে উচ্চমার্গের ড্রামার নামে নর্তন-কুর্দন করে একটা ফাইট দিয়ে ছবির পরিসমাপ্তি। এমন কোনো দৃশ্য নেই যাতে দর্শক এন্টারটেইনড হবে বা প্রাণ খুলে হাসবে বা দুঃখে কাঁদবে। তবে শেষের ক্লাইমেক্স দৃশ্যে শহীদুজ্জামান সেলিমের হঠাৎ নেচে উঠে সংলাপ বলাতে লোকের কিছু হাসি পেয়েছিল। ক্লাইমেক্সের দৃশ্যে দর্শক টেনশন নিয়ে বসে না থেকে এভাবে হাসলে ছবির কপালে কান্না অবধারিত। চলচ্চিত্রের দুর্দিনে অনন্য মামুনই একমাত্র ব্যক্তি যে চলচ্চিত্রকে বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে ধরে রেখেছে। কিন্তু তার ছবির কোয়ালিটি এই রকম হলে তো দর্শক সিনেমা হলে আসাই বন্ধ করে দেবে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হচ্ছে এই ছবির নাম। ‘সাইকো’ নামের সার্থকতা খুঁজেই পাওয়া গেল না। সাইকো এমন এক ব্যক্তি, যে মানসিক সমস্যায় জর্জরিত। অথচ ছবিতে তার কোনো ছাপই নেই। মামুনের ছবি আগেও দেখেছি, সেগুলোর তুলনায় এটা এমন কেন হলো—সেই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সোমবার ১১টা ৪০ মিনিটে যমুনা ব্লকবাস্টারে আমি একা ছবিটি দেখা শুরু করেছি এবং শোর মাঝামাঝি সময় আরো দুজন হলে ঢুকেছিল। তবে ছবি দেখতে নয়, তারা এসেছে গল্প করতে। অনেক সাহস আর একটা ডেমকেয়ার ভাবনা—এমন ছবি নিয়ে ঈদে কেউ প্রতিযোগিতায় নামতে পারে না। ছবির নায়ক রোশানের লম্বা-চওড়া ফিগার দেখে আমি অভিভূত। শিল্পীসংকটের এই সময়ে রোশানই আশীর্বাদ। পূজা চেরি পরীক্ষিত শিল্পী, তবে এই গল্পে তার করার কিছু ছিল না। ফারহান খান রিওর ন্যাচারাল অভিনয় ভালো লেগেছে। শহীদুজ্জামান সেলিমকে মনে হয়েছে, আমাদের সিনেমার খল অভিনয়ের ধারাকে বিদ্রুপ করে গেছেন। সংলাপ বলতে হয় তাই বলে গেছেন রোজী সেলিম ও সুব্রত। তবে চিত্রগ্রহণ, সংগীত ও গানের কথা খুব ভালো। গীতিকাররা গান লিখেছেন সুন্দর আর সুরকার সুন্দর সুর করেছেন। ভুলভ্রান্তি শুধরে নিয়ে ভবিষ্যতে আরো ভালো ছবি দর্শকদের উপহার দেবে, অনন্য মামুনের কাছ থেকে এটা আমার আশা। তার সেই সক্ষমতা আছে।