বিদায়ি বছরে মূল্যস্ফীতির চাপে অনেকটাই পিষ্ট ছিল বিশ্ব অর্থনীতি। এমন মূল্যস্ফীতি কয়েক দশকে দেখেনি ভোক্তারা। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি, পরিবহন, আবসনসহ প্রায় সব খাতের সেবা ও পণ্যের দাম বেড়েছে। এই সংকটের পেছনে মোটাদাগে দুটি কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। তা হচ্ছে করোনা মহামারি ও যুদ্ধ। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় ২০২৩ সালে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে, কমবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মন্দার আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতি। সিএনএন বিজনেসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, এ বছর বৈশ্বিক মন্দা আসবে কি না তা নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কী সিদ্ধান্ত নেয়, দ্বিতীয়ত করোনায় নতুন করে সংক্রমিত হওয়ায় চীনের পরিস্থিতি এবং জ্বালানির মূল্য। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে হবে মাত্র ২.৭ শতাংশ, যেখানে ২০২২ সালে প্রবৃদ্ধি হবে ৩.২ শতাংশ। এর পাশাপাশি বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী সুদহার বৃদ্ধির ফলে এ বছর মূল্যস্ফীতি কমে হবে ৪.৭ শতাংশ। ওইসিডির প্রত্যাশা এ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ২.২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জার্মানি ও অন্যান্য বড় ইউরো জোনের অর্থনীতি সামনে মন্দার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। ব্রিটেনের অর্থনীতি এরই মধ্যে সংকুচিত হয়ে আসছে। গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন হামলার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি চরম আকারে বাড়তে থাকে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইউক্রেনের বন্দর অবরোধ করে রাশিয়া খাদ্যপণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে হু হু করে বাড়তে থাকে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উন্নত দেশগুলো কম সুদের হার থেকে বেরিয়ে আসে এবং আগ্রাসীভাবে নীতি সুদহার বাড়াতে থাকে। তাতেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। উপরন্তু বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফেডারেল রিজার্ভের পাশাপাশি সুদহার বাড়াতে থাকে ইসিবি, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খরা, অতিবৃষ্টি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যে ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে ব্যাহত হয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ। ২০২৩ সালেও এসব কারণে খাদ্য ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। যদিও সরবরাহ ঘাটতি ও পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকরা আবাদ বাড়াতে উৎসাহী হচ্ছেন। কিন্তু গম ও চালের মতো আবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের যে পরিমাণ মজুদ প্রয়োজন, উৎপাদন বাড়লেও তা পূরণ হবে না, বিশেষ করে ২০২৩ সালের প্রথম ভাগে। অথচ লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু এলাকায় এখনো খাদ্যশস্য ও ভোজ্য তেল উৎপাদনে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন কৃষকরা। সিডনিভিত্তিক কৃষি প্রতিষ্ঠান আইকন কমোডিটিজের পরামর্শক সেবাবিষয়ক পরিচালক ওয়েল হুই বলেন, ‘বর্তমানে খাদ্যপণ্যের যে চাহিদা তা পূরণে বিশ্বে রেকর্ড শস্য উৎপাদন করতে হবে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে বর্তমানের চেয়ে আরো ভালো উৎপাদন প্রয়োজন। কিন্তু আমরা বৈশ্বিক খাদ্যশস্য ও তেলবীজ উৎপাদনের যে পূর্বাভাস দেখছি, তাতে এটি সম্ভব মনে হচ্ছে না।’ তাঁর মতে, পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, গম, ভুট্টা ও পাম তেলের যে রেকর্ড উৎপাদন হয়েছিল, এবার তা হবে না। ফলে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকবে না। এতে ২০২৩ সালে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সাল ছিল একটি অনিশ্চয়তার বছর। এ বছর অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে। খাদ্য ও ঋণ সংকট আরো প্রকট হবে। সব কিছু ছাড়িয়ে এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিদ্যমান পরিস্থিতি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। আইএমএফের হিসাবে, স্বল্প আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ দেশ ঋণ পরিশোধের ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের বেশ কিছু দেশ যদি ঋণ দেউলিয়া হয় তবে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হবে, যা ২০২৩ সাল নিয়ে লাল সংকেত দিচ্ছে। সূত্র : রয়টার্স, এএফপি, বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন