করোনা মহামারিতে এশিয়ায় প্রায় সব শিল্প খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লকডাউন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় লোকসানের দায় টানতে হয়েছে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তাদের। এরপর শুরু হওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের আকাশচুম্বি দামে ব্যবসা-বাণিজ্যে টিকে থাকা আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেও দারুণ সফলতা দেখিয়েছেন এশিয়ার ২০ নারী উদ্যোক্তা। ফোর্বস ম্যাগাজিন ‘এশিয়া’স পাওয়ার বিজনেস উইমেন ২০২২’ হিসেবে যাঁদের তালিকা প্রকাশ করেছে। তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন গাজাল আলাগ : নিজের সন্তানের জন্য নিরাপদ পণ্য খুঁজতে গিয়ে কম্পানি গড়ে তোলেন গাজাল আলাগ। তাঁর কম্পানি হোনাসা কনজিউমার। ভারতীয় এ কম্পানির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান উদ্ভাবনী কর্মকর্তা তিনি। বর্তমানে এ কম্পানিতে নতুন বিনিয়োগে মূলধন বেড়ে হয়েছে ১.২ বিলিয়ন ডলার। স্বামী ভরুনের সঙ্গে মিলে ২০১৬ সালে তিনি এ কম্পানি গড়ে তুলে ছিলেন। আলাগ বলেন, ‘আমাদের শিশুপুত্রের স্কিনে একটু সমস্যা ছিল, সে জন্য আমি তার গায়ে ব্যবহার করার জন্য রাসায়নিকমুক্ত পণ্য খুুঁজছিলাম। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। এ অবস্থায় নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিলাম ‘বিষমুক্ত’ বেবি কেয়ার পণ্য তৈরি করব। ফলে আমরা শুরুতেই বেবি ওয়াশ, বেবি শ্যাম্পুসহ সাতটি পণ্য নিয়ে আমাদের কম্পানি শুরু করি। পরবর্তী সময়ে কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার আরো অনেক পণ্য বাজারে আনি।’ করোনা মহামারির মধ্যেও ব্যবসায় সফল হয় কম্পানিটি। ৩১ মার্চ ২০২২ সালে কম্পানির রাজস্ব প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ১০ বিলিয়ন রুপি (১২১ মিলিয়ন ডলার)। আলাগ বলেন, ‘আমাদের পণ্যে আমরা তিনটি শব্দ ব্যবহার করি। তা হচ্ছে ‘সৎ, প্রাকৃতিক ও নিরাপদ’। ক্রিস্টি কার : বাবস অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ক্রিস্টি কার। তিনি হংকংভিত্তিক ক্যাথি প্যাসিফিকের সাবেক মার্কেটিং নির্বাহী। ২০০৬ সালে বেবি ফর্মুলা তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সন্তানের ফুড এলার্জি থাকায় তাকে বুকের দুধ ছাড়িয়ে পুষ্টিকর অন্য কোনো খাবার দিতে পারছিলেন না। এ অবস্থায় নিজের সন্তানের জন্যই ছাগলের দুধের ফর্মুলা তৈরি করেন। আর এ ফর্মুুলাই এখন অস্ট্রেলিয়ায় শিশু খাবার হিসেবে বিক্রিতে শীর্ষে। কম্পানিটির পণ্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রেও বিক্রি হচ্ছে। জুনে শেষ হওয়া সবশেষ বছরে কম্পানির রাজস্ব বেড়ে হয়েছে রেকর্ড ৮৯ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (৫৭ মিলিয়ন ডলার)। কম্পানিটির পণ্য কতটা সমাদৃত, তার উদাহরণ পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের এক টুইট বার্তা থেকে। গত মে মাসে এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি অনেক সুসংবাদ পাচ্ছি। বাবস অস্ট্রেলিয়ার তৈরি ২৭.৫ মিলিয়ন বোতল নিরাপদ শিশু ফর্মুলা যুক্তরাষ্ট্রে আসছে।’ ক্রিস্টি কার জানান, ব্যবসায় সফলতায় তাঁর কম্পানি দ্রুতই এক বিলিয়ন ডলারের কম্পানি হবে। চোই সু-ইয়ন : দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট কম্পানি নাভের’স-এর সিইও চোই সু-ইয়ন। এই কম্পানিটির অগ্রযাত্রায় তিনি দারুণ নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে কম্পানির বৈশ্বিক ব্যবসা দেখতেন চোই, যা এশিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী সার্চ ইঞ্জিন এ কম্পানির, যা দেশটির ৩০ মিলিয়ন বা প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করে। এ ছাড়া সফটব্যাংকের সঙ্গে এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাসেজিং অ্যাপ চালায় কম্পানিটি। চোই এর নেতৃত্বেই নাভের গত অক্টোবরে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মার্কেটপ্লেস পোসমার্ক ক্রয় করে। আগামী পাঁচ বছরে কম্পানির রাজস্ব দ্বিগুণ (১২ বিলিয়ন ডলার) করার লক্ষ্য ঠিক করেছেন চোই। আকিকো আমানো : ফায়ারওয়ার্ক বা আতশবাজি তৈরির কম্পানি সোকে হানাবি কাজিয়ার পরিচালক আকিকো আমানো। জাপানে তিনিই প্রথম নারী, যিনি আতশবাজি কম্পানি গড়ে তোলেন। তাঁর উদ্ভাবনীয় দক্ষতা এ কম্পানির অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জুলি কোটস : নির্মাণ কম্পানি সিএসআরের সিইও এবং এমডি জুলি কোটস। তিনি কম্পানির নেতৃত্বে আসেন ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে। যখন বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে করোনার এ সময়ে কম্পানিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেন। লজিস্টিকস সহায়তা ও ব্যবসা রূপান্তরে তিনি অন্যান্য কম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলেন। এভাবে সরবরাহব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে সক্ষম হন। এ কম্পানি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প সরবরাহ করে। ২০২২ সালের মার্চে কম্পানির নেট মুনাফা বেড়েছে ২২ শতাংশ। সূত্র : ফোর্বস ম্যাগাজিন