বিয়ে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত এবং একটি পবিত্র চুক্তি। এই চুক্তির অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো দেনমোহর। কিন্তু আজ অনেকের কাছে দেনমোহর যেন শুধু বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে দেনমোহর কোনো সামাজিক প্রথা নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত স্ত্রীর অবিচ্ছেদ্য আর্থিক অধিকার এবং স্বামীর ওপর আরোপিত একটি অপরিহার্য দায়িত্ব।
দুঃখজনকভাবে বর্তমানে একদিকে অস্বাভাবিক অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়, অথচ তা পরিশোধের বাস্তব উদ্যোগ থাকে না; অন্যদিকে বিয়ের পর স্ত্রীকে নানাভাবে চাপ দিয়ে দেনমোহর মাফ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। উভয়টিই কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষার পরিপন্থী।
দেনমোহরের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য
আরবি ‘মাহর’ বা ‘সাদুকাত’ বলতে সেই নির্ধারিত সম্পদকে বোঝায়, যা বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর ওপর স্ত্রীর প্রাপ্য হয়ে যায়। এটি কোনো মূল্য বা সামাজিক প্রথা নয়; বরং স্ত্রীর সম্মান, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নারীদের তাদের মহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪)
অন্যত্র বলেন, ‘তোমরা তাদের নির্ধারিত মহর অবশ্যই প্রদান করবে।’
(সুরা : নিসা, আয়াত : ২৪)
এ দুটি আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, দেনমোহর কোনো দয়া বা উপহার নয়; এটি আল্লাহ প্রদত্ত ফরজ অধিকার।
দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর অপরিহার্য দায়িত্ব
দেনমোহর নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং যথাসময়ে তা পরিশোধ করাও ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম।’
(মুসলিম, হাদিস : ১৫৬৪)
অতিরিক্ত দেনমোহর নির্ধারণের কুফল
বর্তমানে অনেক পরিবার অস্বাভাবিক পরিমাণ দেনমোহর নির্ধারণকেই সামাজিক মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক মনে করে। অথচ বাস্তবে তা পরিশোধের ইচ্ছা বা সামর্থ্য থাকে না। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘নারীদের দেনমোহর বাড়াবাড়ি করে নির্ধারণ কোরো না। যদি এতে বিশেষ মর্যাদা থাকত, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-ই এ বিষয়ে সবার অগ্রগামী হতেন। অথচ তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের কারো দেনমোহর বারো উকিয়া (প্রায় ১,৪২৮ গ্রাম রুপা)-এর বেশি নির্ধারণ করেননি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১১১৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হলো যে বিয়ের ব্যয় ও দায়ভার সবচেয়ে সহজ।’
(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৪৫২৯)
অতএব, দেনমোহর এমন হওয়া উচিত যা সম্মানজনক, বাস্তবসম্মত ও সহজে পরিশোধযোগ্য।
স্ত্রীকে দেনমোহর মাফ করতে বাধ্য করা অনৈতিক
দেনমোহর সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ। এতে স্বামী বা অন্য কারো মালিকানা নেই। বিয়ের পর আবেগ, পারিবারিক চাপ বা ভয় দেখিয়ে অথবা মৃতশয্যায় স্ত্রী থেকে দেনমোহর মাফ করিয়ে নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। কোরআন স্পষ্ট করেছে, স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া দেনমোহরের কোনো অংশ গ্রহণ বৈধ নয়। ফকিহরাও একমত যে জবরদস্তি, সামাজিক চাপ বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া মাফ গ্রহণযোগ্য নয়। যদি স্ত্রী কোনো কারণে বাধ্য হয়ে মৌখিকভাবে মাফ করেও দেয় তার পরও তা তার হক হিসাবে বহাল থাকবে।
এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেনমোহরের কোনো অংশ তোমাদের ছেড়ে দেয়, তবে তা সানন্দে ভোগ করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা উল্লেখ করেছেন, স্ত্রীর পূর্ণ সন্তুষ্টি ও স্বাধীন সম্মতি ছাড়া স্বামীর জন্য দেনমোহরের কোনো অংশ গ্রহণ করা বৈধ নয়। (আহকামুল কুরআন ২/৭৩; তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/১৯৪)
আর তা না দিয়ে যদি মানুষ মারা যায়, এটা তার জন্য পরকালীন শাস্তির কারণ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দেনমোহর আদায়ের ইচ্ছা ছাড়া কোনো নারীকে বিয়ে করে এবং তা পরিশোধ না করেই মারা যায়, কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর সামনে অপরাধী হিসেবে উপস্থিত হবে।
(আল-মু’জামুল আওসাত, হাদিস : ১৮৫১)
মহান আল্লাহ সবাইকে দেনমোহর আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হওয়ার তাওফিক দান করুন।