• ই-পেপার

বিজ্ঞান যেভাবে পুনরুত্থানের উপলব্ধি সহজ করে

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৭৫

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

মহান আল্লাহ বলেন, ‌‘নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, আল্লাহর পথে বাধা দিয়েছে এবং তাদের কাছে হেদায়েতের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পরও রাসুলের বিরোধিতা করেছে, তারা আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। শিগগিরই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দেবেন। হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট কোরো না। (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ৩১-৩২)

শিক্ষা ও বিধান

 

১. সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অবিশ্বাসী হওয়া এবং ভালো কাজে বাধা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কুফরি কাজ।

২. কেউ পাপাচারে লিপ্ত হলে বা কুফরি করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না; বরং আখিরাতে তাদের কোনো কাজের প্রতিদান থাকবে না।

৩. বান্দা কখনো রবের ক্ষতি করতে পারে না। রব সর্বদা অন্যের ক্ষতি থেকে মুক্ত; বরং বান্দা নিজের মন্দ কাজের কারণে নিজের ভালো কাজ বিনষ্ট করে।

৪. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ পালন করা ও তাদের কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা মুমিনের কর্তব্য।

৫. মন্দ কাজ ভালো কাজকে বিলীন করে দেয়। তাই সব ধরনের গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা কাম্য।

  (আত-তাফসিরুল মুনির, খণ্ড-২৭, পৃষ্ঠা : ৪৫৬)

কোরআনে যাদের শয়তানের বন্ধু বলা হয়েছে

মুফতি দিদার হুসাইন

কোরআনে যাদের শয়তানের বন্ধু বলা হয়েছে

শয়তান মানবজাতির চিরশত্রু। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে তার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাকে প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব, তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো। (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৬)

শয়তানের এ শত্রুতা আজকের নয়; মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই তার বিদ্বেষের সূচনা। আল্লাহ তাআলা যখন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদার নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিস অহংকারে সেই আদেশ অমান্য করল।

(সুরা : সাদ, আয়াত : ৭১-৭৪)

এরপর ইবলিস প্রতিজ্ঞা করল, আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতীত।

(সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৮২-৮৩)

এ থেকে স্পষ্ট হয়, শয়তান আল্লাহর বান্দাদের বিভ্রান্ত করার জন্য সর্বদা তৎপর। এর মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কারণে হয়তো শতভাগ তার চক্রান্ত সফল হবে না। কিন্তু বহু মানুষ তাদের কর্ম ও চরিত্রের কারণে শয়তান তাদের বন্ধু, সহচর কিংবা ভাইয়ে পরিণত হবে। নিম্নে এ রকম কিছু মানুষের কথা তুলে ধরা হলো

আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ ব্যক্তিরা : মহান আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি রহমানের জিকির থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি; অতঃপর সে হয় তার সহচর।

(সুরা : জুখরুফ : আয়াত : ৩৬)

আল্লাহর স্মরণই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপত্তা। জিকির শুধু জিহ্বার তাসবিহ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিধানকে সঙ্গী করাই প্রকৃত জিকির। মানুষ যখন এই স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়, আল্লাহর বিধান মানে না, তখন শয়তান তার হৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তার সহচর হয়ে যায়।

যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে

না : যারা ঈমান গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের তাদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা ঈমান আনে না।

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ২৭)

আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, যারা কুফরি করে, তাদের বন্ধু হলো তাগুত (শয়তান বা বাতিল শক্তি)। তারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৫৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে নাযাদের সহচর শয়তান, সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

লোক-দেখানো দাতা : যারা লোক-দেখানোর জন্য সম্পদ খরচ করে শয়তান তাদের সঙ্গী হয়। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আর যারা লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে... (তারা শয়তানের সঙ্গী)। আর শয়তান যার সহচর (সঙ্গী) হয়, সে কতই না নিকৃষ্ট সহচর। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

অপব্যয়কারীরা : ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সম্পদ আল্লাহর আমানত। তাই বাজে খরচ ও অপচয়কে কোরআন শয়তানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।

(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬-২৭)

এখানে শুধু বন্ধু নয়, অপব্যয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে, যা বিষয়টির গুরুতরতা আরো স্পষ্ট করে।

মুনাফিক : মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে কুফরি ও মুসলমানদের ক্ষতি করার চিন্তা যারা লালন করে, তারা মূলত শয়তানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তারা যখন আড়ালে তাদের প্রধান শয়তানদের (কুচক্রী নেতাদের) সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি।

(সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৪)

পাপে অন্ধ ব্যক্তি : যারা পাপের কারণে অন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তাদের জন্য শয়তানকে স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমরা তাদের জন্য কিছু সহচর (শয়তান) নির্ধারিত করে দিয়েছিলাম, যারা তাদের অতীত ও ভবিষ্যেক তাদের সামনে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল...।

(সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ২৫)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্মবিশ্বাস

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্মবিশ্বাস

আরবরা ইসমাঈল (আ.)-কে আবুল আরব এবং নিজেদের ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসারী দাবি করত; কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের সময় তারা ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস ও শিক্ষার ওপর অবিচল ছিল না। মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির আগে আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরা হলো

মূর্তিপূজা

ইসলামপূর্ব যুগে আরব উপদ্বীপে সর্বাধিক প্রচলিত ধর্ম ছিল মূর্তিপূজা। যদিও মক্কায় একদল একেশ্বরবাদী মানুষ ছিল, যারা দ্বিনে হানিফের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিল। আরবের মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত, কিন্তু তাঁর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে পাথর, কাঠ ও ধাতু দিয়ে নির্মিত দেব-দেবীর পূজা করত। আল্লাহর প্রতি তাদের এই বিশ্বাস ছিল ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর ধর্মের অবশিষ্টাংশ এবং আরবের প্রাচীন নগরী যেমন মাদায়িনে সালিহ, আদ ও সামুদের এলাকায় অবতীর্ণ আসমানি ধর্মগুলোর উত্তরাধিকার। কিন্তু পরবর্তীকালে তাওহিদের এই বিশুদ্ধ আকিদা বিকৃত হয়ে যায়। তার জায়গায় মূর্তি ও নানা কুসংস্কারের উপাসনা ছড়িয়ে পড়ে, যা আরব উপদ্বীপের পার্শ্ববর্তী প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেমনআসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয়, আমোরীয় ও আমোরাইটদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

আরবরা তখন লাত, মানাত, উজ্জা, হুবাল, সুওয়া ও ওয়াদ্দ-এর মতো দেব-দেবীর পূজা করত। পাশাপাশি তারা পূর্বপুরুষদের পবিত্র মনে করত, বিভিন্ন প্রাণীর পূজা করত এবং নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র, দাবরান, সুরাইয়া ও শিরা নক্ষত্রমণ্ডলীর উপাসনা করত। তারা জিন, ফেরেশতা ও অগ্নিরও উপাসনা করত। বেশির ভাগই নবুয়ত ও মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত না। তাদের সমাজে গণক, জ্যোতিষী ও জাদুকরদের প্রভাব ছিল প্রবল এবং নানা পৌরাণিক কাহিনি ও কুসংস্কার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।

আরবে মূর্তিপূজার জন্য নির্দিষ্ট উপাসনালয়ও ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল পবিত্র কাবাঘর। মুশরিকরা কাবাঘরের চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে। হজের জন্য আসা বিভিন্ন গোত্র এসব মূর্তির পূজা করত এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোরবানি ও মানত পেশ করত।

ইহুদি ধর্ম

আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মধ্যে অন্যতম ছিল ইহুদি ধর্ম। ইয়াসরিবের কয়েকটি গোত্র, ইয়েমেন ও ইয়ামামার কিছু ব্যক্তি এই ধর্ম অনুসরণ করত। তারা ধর্মীয় সাহিত্য রচনায় হিব্রু ও আরামীয় ভাষা ব্যবহার করলেও দৈনন্দিন জীবনে আরবি ভাষায় কথা বলত। আরব সমাজের প্রভাবে তারা আরবদের অনেক রীতি-নীতি গ্রহণ করেছিল এবং আরবি নামও ব্যবহার করত। তাদের নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, যেখানে তারা তাওরাত, মিশনা ও তালমুদ অধ্যয়ন করত। এসব প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে উপাসনালয়, প্রার্থনার স্থান এবং ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তারা জাদুবিদ্যায় লিপ্ত ছিল, শনিবার কাজ করাকে নিষিদ্ধ মনে করত, আশুরার রোজা পালন করত এবং ইহুদি ধর্মীয় উৎসবগুলো যথাযথভাবে পালন করত।

খ্রিস্ট ধর্ম

আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে বিস্তার লাভ করা আরেকটি ধর্ম ছিল খ্রিস্ট ধর্ম। খ্রিস্টান সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী এবং খ্রিস্টান দেশ থেকে আসা দাসদের মাধ্যমে এই ধর্ম আরব ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যও খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে উৎসাহ দিত। কেননা এর মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেত। শাম ও ইরাক অঞ্চল থেকে দাওমাতুল জান্দাল, আইলা, কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং মক্কা, ইয়াসরিব ও তায়েফের কিছু ব্যক্তি, বিশেষত আহাবিশ গোত্রের লোকজন ও দাসদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আরব উপদ্বীপে খ্রিস্ট ধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল ইয়েমেন, বিশেষ করে নাজরান। এ ছাড়া সীমিত আকারে বাহরাইন, কাতার ও হাজর অঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটে। প্রাচ্যের খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্ম ও জ্ঞানের ভাষা ছিল আরামীয়। তবে ওয়ারাকা ইবন নওফলের ঘটনার মতো কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সে সময় আরবি ভাষায়ও ইনজিল লেখা হতো।

মাজুসি ধর্ম

ইরান থেকে মাজুসি (অগ্নিপূজারি) ধর্মও আরবের কিছু অঞ্চলে পৌঁছেছিল। তারা মূলত অগ্নি উপাসনা করত। প্রতিবেশী হওয়ায় হিরায় এ ধর্মের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। আবার ইয়েমেনে আবিসিনীয়দের বিতাড়িত করতে পারস্যের সামরিক অভিযান পরিচালিত হওয়ার ফলে সেখানে মাজুসি ধর্মের বিস্তার ঘটে। হাদরামাউত ও আরব উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চলের আরো কিছু এলাকায়ও ইরানের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এর সীমিত প্রভাব দেখা যায়।

সাবেয়ি ধর্ম

সাবেয়ি ধর্মের অনুসারীরা মূলত ইরাক ও হাররান অঞ্চলে সীমিত সংখ্যায় বসবাস করত। মক্কা ও তায়েফে সাবা শব্দটি ধর্মত্যাগের অর্থে ব্যবহৃত হতো। মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে সাবিয়ি বলত, কারণ তারা শিরক ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এরাই ছিল ইসলাম আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠী।

 

তথ্যঋণ : নবীয়ে রহমত ও আর-রাহিকুল মাখতুম

স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় মাটির তৈরি বুগশান প্রাসাদ

আবরার আবদুল্লাহ
স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় মাটির তৈরি বুগশান প্রাসাদ

মুকাল্লা শহর থেকে খায়লা গিরিপথ অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সারি সারি খেজুরগাছ, সবুজে মোড়া উপত্যকা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। আর একটু সামনে এগোলেই দৃষ্টি আটকে যাবে এক দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদের দিকে। এর মনোরম অবয়ব, উজ্জ্বল রঙ, বিশাল আকৃতি এবং গর্বিত ঐতিহ্য দর্শককে সহজেই মুগ্ধ করে। তখন প্রাসাদটি কাছ থেকে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। বলছি ইয়েমেনের গৌরব ও স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় বুগশান প্রাসাদের কথা।

বুগশান প্রাসাদ ওয়াদি দুয়ানের বাঁ উপত্যকার অন্যতম বৃহৎ প্রাসাদ। প্রাসাদটি উপত্যকার রিবাত বাআশন এলাকায় অবস্থিত। বুগশান প্রাসাদ শুধু হাদরামাউত নয়, বরং সমগ্র ইয়েমেনে মাটির তৈরি স্থাপত্যশিল্পের এক চমৎকার নিদর্শন। হাদরামাউত বা স্থানীয় মাটির স্থাপত্য নিয়ে নির্মিত প্রায় প্রতিটি প্রামাণ্যচিত্র কিংবা আলোকচিত্রে বুগশান প্রাসাদকে হাদরামি স্থাপত্যকলার এক গর্বিত ও প্রকৃত নমুনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রাসাদের নকশাকার ও নির্মাতা উস্তাদ সালেম ফারাজ বিন সাবাহ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। তবু তাঁর নির্মিত এই প্রাসাদ হাদরামাউত ও ইয়েমেনের প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম সুন্দর, অনন্য ও ব্যতিক্রমী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

বুগশান প্রাসাদটি  বাইত বুগশান (বুগশান বাড়ি) নামেও পরিচিত। ১৪ জুন ১৯৫৬ সালে প্রয়াত আহমদ সাঈদ বুগশান, যিনি সৌদি আরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ বুগশানের পিতা, তিনি এই প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রাসাদটির নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রায় সাত থেকে ১০ বছর সময় লেগেছিল। সে সময়ে বুগশান পরিবারের সঙ্গে সৌদি আরবের আল সৌদ রাজপরিবারের সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

বুগশান প্রাসাদের আয়তন প্রায় ৮০২ বর্গমিটার। এতে দুটি প্রধান প্রবেশ পথ আছে। একটি পুরুষদের জন্য প্রধান প্রবেশদ্বার, অন্যটি নারীদের জন্য নির্ধারিত। এ ছাড়া পেছনের দিকে আরো দুটি প্রধান দরজা আছে। প্রাসাদটি ভূতল ও একটি অতিরিক্ত তলাসহ মোট আট তলাবিশিষ্ট। এর ভেতরে ৩৭টির বেশি কক্ষ আছে এবং প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে পৃথক স্নানাগার আছে। প্রাসাদের ঠিক মধ্যে একটি খোলা জায়গা আছে, যার নাম আশ-শামসাহ। এর আয়তন প্রায় ১২১ বর্গমিটার। এই খোলা অংশের মাঝখানে একটি বাক্য উত্কীর্ণ রয়েছে, হে গৃহ! তোমার মধ্যে যেন কখনো দুঃখ প্রবেশ না করে এবং কালের পরিবর্তন যেন তোমার অধিবাসীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। এতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রবেশ করো।

এই খোলা জায়গাটি দুটি উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে। প্রথমত, প্রাসাদটি যেহেতু অত্যন্ত বড়, তাই এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে সব তলা ও কক্ষে আলো পৌঁছতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি পুরো প্রাসাদে স্বাভাবিক বায়ু চলাচল (বায়ু চলাচল) নিশ্চিত করে। এ ছাড়া প্রাসাদের একটি অন্ধকার করিডরে এমন একটি গোপন দরজা রয়েছে, যা দিয়ে বিপদের সময় গোপনে বের হওয়া যায়।

প্রাসাদের অলংকরণে উল্লেখযোগ্য প্রতীকী নকশা দেখা যায়। প্রথমটি পুরুষদের প্রবেশদ্বারের ওপরে। সেখানে দুটি তরবারি একটির ওপর আরেকটি আড়াআড়িভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের ওপরে একটি খেজুরগাছ রয়েছে। এই নকশা সে সময়ের অভিবাসনের স্মৃতি বহন করে, যখন ওয়াদি দুআনের বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাড়ি জমাতেন। দ্বিতীয়টি হলো প্রাসাদের সর্বোচ্চ তলায় স্থাপিত দুটি সিংহের প্রতিকৃতি। এগুলো সাহস, বীরত্ব, আত্মমর্যাদা এবং গৌরবের প্রতীক হিসেবে নির্মিত হয়েছে।

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বুগশান প্রাসাদে বেশ কিছু আধুনিক সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়। এই সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো পুনর্নির্মাণের জন্য নতুন নির্মাণ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। সিঁড়ি, ছাদের নিচের অংশসহ কয়েকটি স্থানে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। প্রাসাদটি নতুন করে রং করা হলেও আগের ঐতিহ্যবাহী রংই অক্ষুণ্ন রাখা হয়।

প্রাসাদটিতে প্রধান প্রবেশদ্বারসহ প্রায় ২০০টি দরজা আছে। সব দরজাই সিদর (বেরি) গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। প্রতিটি দরজা লোহার অলংকরণে সজ্জিত এবং বাত্রাফি পরিবারের দক্ষ কারিগররা হাতে তৈরি করেছেন। প্রাসাদে মোট ১৯০টি জানালা রয়েছে। জানালাগুলোর নকশা প্রাসাদের রং এবং আশপাশের মাটির তৈরি ঘরগুলোর সঙ্গে সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলোও সিদর কাঠ দিয়ে তৈরি।

তথ্যসূত্র : হাদারামাউত ডটঅর্গ