• ই-পেপার

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্মবিশ্বাস

  • মো. আবদুল মজিদ মোল্লা

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৭৫

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

মহান আল্লাহ বলেন, ‌‘নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, আল্লাহর পথে বাধা দিয়েছে এবং তাদের কাছে হেদায়েতের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পরও রাসুলের বিরোধিতা করেছে, তারা আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। শিগগিরই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দেবেন। হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট কোরো না। (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ৩১-৩২)

শিক্ষা ও বিধান

 

১. সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অবিশ্বাসী হওয়া এবং ভালো কাজে বাধা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কুফরি কাজ।

২. কেউ পাপাচারে লিপ্ত হলে বা কুফরি করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না; বরং আখিরাতে তাদের কোনো কাজের প্রতিদান থাকবে না।

৩. বান্দা কখনো রবের ক্ষতি করতে পারে না। রব সর্বদা অন্যের ক্ষতি থেকে মুক্ত; বরং বান্দা নিজের মন্দ কাজের কারণে নিজের ভালো কাজ বিনষ্ট করে।

৪. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ পালন করা ও তাদের কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা মুমিনের কর্তব্য।

৫. মন্দ কাজ ভালো কাজকে বিলীন করে দেয়। তাই সব ধরনের গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা কাম্য।

  (আত-তাফসিরুল মুনির, খণ্ড-২৭, পৃষ্ঠা : ৪৫৬)

কোরআনে যাদের শয়তানের বন্ধু বলা হয়েছে

মুফতি দিদার হুসাইন

কোরআনে যাদের শয়তানের বন্ধু বলা হয়েছে

শয়তান মানবজাতির চিরশত্রু। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে তার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাকে প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব, তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো। (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৬)

শয়তানের এ শত্রুতা আজকের নয়; মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই তার বিদ্বেষের সূচনা। আল্লাহ তাআলা যখন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদার নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিস অহংকারে সেই আদেশ অমান্য করল।

(সুরা : সাদ, আয়াত : ৭১-৭৪)

এরপর ইবলিস প্রতিজ্ঞা করল, আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতীত।

(সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৮২-৮৩)

এ থেকে স্পষ্ট হয়, শয়তান আল্লাহর বান্দাদের বিভ্রান্ত করার জন্য সর্বদা তৎপর। এর মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কারণে হয়তো শতভাগ তার চক্রান্ত সফল হবে না। কিন্তু বহু মানুষ তাদের কর্ম ও চরিত্রের কারণে শয়তান তাদের বন্ধু, সহচর কিংবা ভাইয়ে পরিণত হবে। নিম্নে এ রকম কিছু মানুষের কথা তুলে ধরা হলো

আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ ব্যক্তিরা : মহান আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি রহমানের জিকির থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি; অতঃপর সে হয় তার সহচর।

(সুরা : জুখরুফ : আয়াত : ৩৬)

আল্লাহর স্মরণই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপত্তা। জিকির শুধু জিহ্বার তাসবিহ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিধানকে সঙ্গী করাই প্রকৃত জিকির। মানুষ যখন এই স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়, আল্লাহর বিধান মানে না, তখন শয়তান তার হৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তার সহচর হয়ে যায়।

যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে

না : যারা ঈমান গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের তাদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা ঈমান আনে না।

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ২৭)

আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, যারা কুফরি করে, তাদের বন্ধু হলো তাগুত (শয়তান বা বাতিল শক্তি)। তারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৫৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে নাযাদের সহচর শয়তান, সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

লোক-দেখানো দাতা : যারা লোক-দেখানোর জন্য সম্পদ খরচ করে শয়তান তাদের সঙ্গী হয়। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আর যারা লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে... (তারা শয়তানের সঙ্গী)। আর শয়তান যার সহচর (সঙ্গী) হয়, সে কতই না নিকৃষ্ট সহচর। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

অপব্যয়কারীরা : ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সম্পদ আল্লাহর আমানত। তাই বাজে খরচ ও অপচয়কে কোরআন শয়তানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।

(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬-২৭)

এখানে শুধু বন্ধু নয়, অপব্যয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে, যা বিষয়টির গুরুতরতা আরো স্পষ্ট করে।

মুনাফিক : মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে কুফরি ও মুসলমানদের ক্ষতি করার চিন্তা যারা লালন করে, তারা মূলত শয়তানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তারা যখন আড়ালে তাদের প্রধান শয়তানদের (কুচক্রী নেতাদের) সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি।

(সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৪)

পাপে অন্ধ ব্যক্তি : যারা পাপের কারণে অন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তাদের জন্য শয়তানকে স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমরা তাদের জন্য কিছু সহচর (শয়তান) নির্ধারিত করে দিয়েছিলাম, যারা তাদের অতীত ও ভবিষ্যেক তাদের সামনে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল...।

(সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ২৫)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।

স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় মাটির তৈরি বুগশান প্রাসাদ

আবরার আবদুল্লাহ
স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় মাটির তৈরি বুগশান প্রাসাদ

মুকাল্লা শহর থেকে খায়লা গিরিপথ অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সারি সারি খেজুরগাছ, সবুজে মোড়া উপত্যকা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। আর একটু সামনে এগোলেই দৃষ্টি আটকে যাবে এক দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদের দিকে। এর মনোরম অবয়ব, উজ্জ্বল রঙ, বিশাল আকৃতি এবং গর্বিত ঐতিহ্য দর্শককে সহজেই মুগ্ধ করে। তখন প্রাসাদটি কাছ থেকে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। বলছি ইয়েমেনের গৌরব ও স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় বুগশান প্রাসাদের কথা।

বুগশান প্রাসাদ ওয়াদি দুয়ানের বাঁ উপত্যকার অন্যতম বৃহৎ প্রাসাদ। প্রাসাদটি উপত্যকার রিবাত বাআশন এলাকায় অবস্থিত। বুগশান প্রাসাদ শুধু হাদরামাউত নয়, বরং সমগ্র ইয়েমেনে মাটির তৈরি স্থাপত্যশিল্পের এক চমৎকার নিদর্শন। হাদরামাউত বা স্থানীয় মাটির স্থাপত্য নিয়ে নির্মিত প্রায় প্রতিটি প্রামাণ্যচিত্র কিংবা আলোকচিত্রে বুগশান প্রাসাদকে হাদরামি স্থাপত্যকলার এক গর্বিত ও প্রকৃত নমুনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রাসাদের নকশাকার ও নির্মাতা উস্তাদ সালেম ফারাজ বিন সাবাহ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। তবু তাঁর নির্মিত এই প্রাসাদ হাদরামাউত ও ইয়েমেনের প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম সুন্দর, অনন্য ও ব্যতিক্রমী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

বুগশান প্রাসাদটি  বাইত বুগশান (বুগশান বাড়ি) নামেও পরিচিত। ১৪ জুন ১৯৫৬ সালে প্রয়াত আহমদ সাঈদ বুগশান, যিনি সৌদি আরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ বুগশানের পিতা, তিনি এই প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রাসাদটির নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রায় সাত থেকে ১০ বছর সময় লেগেছিল। সে সময়ে বুগশান পরিবারের সঙ্গে সৌদি আরবের আল সৌদ রাজপরিবারের সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

বুগশান প্রাসাদের আয়তন প্রায় ৮০২ বর্গমিটার। এতে দুটি প্রধান প্রবেশ পথ আছে। একটি পুরুষদের জন্য প্রধান প্রবেশদ্বার, অন্যটি নারীদের জন্য নির্ধারিত। এ ছাড়া পেছনের দিকে আরো দুটি প্রধান দরজা আছে। প্রাসাদটি ভূতল ও একটি অতিরিক্ত তলাসহ মোট আট তলাবিশিষ্ট। এর ভেতরে ৩৭টির বেশি কক্ষ আছে এবং প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে পৃথক স্নানাগার আছে। প্রাসাদের ঠিক মধ্যে একটি খোলা জায়গা আছে, যার নাম আশ-শামসাহ। এর আয়তন প্রায় ১২১ বর্গমিটার। এই খোলা অংশের মাঝখানে একটি বাক্য উত্কীর্ণ রয়েছে, হে গৃহ! তোমার মধ্যে যেন কখনো দুঃখ প্রবেশ না করে এবং কালের পরিবর্তন যেন তোমার অধিবাসীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। এতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রবেশ করো।

এই খোলা জায়গাটি দুটি উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে। প্রথমত, প্রাসাদটি যেহেতু অত্যন্ত বড়, তাই এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে সব তলা ও কক্ষে আলো পৌঁছতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি পুরো প্রাসাদে স্বাভাবিক বায়ু চলাচল (বায়ু চলাচল) নিশ্চিত করে। এ ছাড়া প্রাসাদের একটি অন্ধকার করিডরে এমন একটি গোপন দরজা রয়েছে, যা দিয়ে বিপদের সময় গোপনে বের হওয়া যায়।

প্রাসাদের অলংকরণে উল্লেখযোগ্য প্রতীকী নকশা দেখা যায়। প্রথমটি পুরুষদের প্রবেশদ্বারের ওপরে। সেখানে দুটি তরবারি একটির ওপর আরেকটি আড়াআড়িভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের ওপরে একটি খেজুরগাছ রয়েছে। এই নকশা সে সময়ের অভিবাসনের স্মৃতি বহন করে, যখন ওয়াদি দুআনের বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাড়ি জমাতেন। দ্বিতীয়টি হলো প্রাসাদের সর্বোচ্চ তলায় স্থাপিত দুটি সিংহের প্রতিকৃতি। এগুলো সাহস, বীরত্ব, আত্মমর্যাদা এবং গৌরবের প্রতীক হিসেবে নির্মিত হয়েছে।

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বুগশান প্রাসাদে বেশ কিছু আধুনিক সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়। এই সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো পুনর্নির্মাণের জন্য নতুন নির্মাণ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। সিঁড়ি, ছাদের নিচের অংশসহ কয়েকটি স্থানে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। প্রাসাদটি নতুন করে রং করা হলেও আগের ঐতিহ্যবাহী রংই অক্ষুণ্ন রাখা হয়।

প্রাসাদটিতে প্রধান প্রবেশদ্বারসহ প্রায় ২০০টি দরজা আছে। সব দরজাই সিদর (বেরি) গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। প্রতিটি দরজা লোহার অলংকরণে সজ্জিত এবং বাত্রাফি পরিবারের দক্ষ কারিগররা হাতে তৈরি করেছেন। প্রাসাদে মোট ১৯০টি জানালা রয়েছে। জানালাগুলোর নকশা প্রাসাদের রং এবং আশপাশের মাটির তৈরি ঘরগুলোর সঙ্গে সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলোও সিদর কাঠ দিয়ে তৈরি।

তথ্যসূত্র : হাদারামাউত ডটঅর্গ

 

বিজ্ঞান যেভাবে পুনরুত্থানের উপলব্ধি সহজ করে

প্রফেসর ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
বিজ্ঞান যেভাবে পুনরুত্থানের উপলব্ধি সহজ করে

আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, নবুয়ত ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের মতোই মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়ার বিশ্বাস প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। কোরআনে পুনরুত্থানকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টির নিখুঁত পরিকল্পনা এবং মানবজীবনের জবাবদিহির অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কিছু দিক কোরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত সৃষ্টির সূক্ষ্মতা এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিকে আরো গভীর করে।

পুনরুত্থান : মানুষের পুনরুত্থান (বাআস বা হাশর) হলো মৃত্যুর পর পরকালে হিসাব-নিকাশের জন্য আবার জীবিত হওয়া। এটি ইসলামের মূল বিশ্বাসের অন্যতম স্তম্ভ এবং পরকালের প্রথম ধাপ। এরপর হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদান। আসলে পরকালের বিশ্বাসই মানবজীবনের গতি পাল্টে দেয়। যেকোনো গর্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে বিরত রাখে। এ বিশ্বাসের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানরা অন্য জাতির মোকাবেলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হয়। পুনরুত্থান বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, মানুষ আমার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায় এবং বলে, অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে; যখন তা পচেগলে যাবে? বলো (হে রাসুল), তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৭৮-৭৯)

যেভাবে পুনরুত্থান : কিয়ামতের প্রথম ফুৎকারের পর পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর দ্বিতীয় ফুৎকারের আগে আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে এক বিশেষ বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের ক্ষুদ্র হাড় (টেইলবোন) সেই পানি শোষণ করবে এবং বৃষ্টির পানিতে যেভাবে শাক-সবজি বা ঘাস গজিয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবে প্রত্যেক মানুষের পূর্ণাঙ্গ শরীর এই হাড়টিকে কেন্দ্র করে আবার মাটির নিচ থেকে নিখুঁতভাবে তৈরি হয়ে উঠবে। ইসরাফিল (আ.) যখন দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁ দেবেন, তখন মহাবিশ্বের পূর্বের সব মৃত জীব ও মানুষ একযোগে জীবিত হয়ে উঠবে। মানুষ তাদের কবর বা যেখানেই তাদের অবশিষ্টাংশ থাকুক না কেন, সেখান থেকে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসবে।  আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, দুইবার ফুৎকারের মাঝে ৪০ হবে। সাহাবিরা বললেন, হে আবু হুরায়রা! ৪০ দিন? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ মাস? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ বছর? তিনি বললেন, অস্বীকার করলাম (অর্থাৎ আমারও জানা নেই)। অতঃপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, এতে তারা উদগত হবে যেমন সবজি উদগত হয়। অতঃপর তিনি বললেন, তখন একটি হাড় ব্যতীত মানুষের গোটা শরীর পচে যাবে। আর সে হাড়টি হলো মেরুদণ্ডের (সর্বনিম্ন ভাগের এবং নিতম্বের ওপরের) হাড়। কিয়ামতের দিন এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ৭১৪৬)

প্রথম সৃষ্টির মতোই পুনরুত্থান : উল্লিখিত আল্লাহর বাণী তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন আর রাসুল (সা.)-এর বানী এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে’—আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসবের সত্যতা দেখা যায়। মায়ের গর্ভে মানবশিশু সৃষ্টির প্রাথমিক ধাপে (গর্ভধারণের প্রায় ১৪-১৫তম দিনে) ভ্রূণে একটি রেখা বা বিন্দুর আবির্ভাব ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Primitive Streak। এর থেকেই মানবদেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্নায়ুতন্ত্র, মাংসপেশি ও হাড় তৈরি হওয়া শুরু হয়। শিশুর পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণের পর এই আদি রেখাটি সংকুচিত হয়ে মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে অবস্থান নেয়, যাকে Coccyx বা টেইলবোন বলা হয়। হাদিসে এই বিশেষ হাড়টিকে আজবুয-জানাব বলা হয়েছে। গবেষকরা এই আদি রেখা বা টেইলবোনের কোষ নিয়ে অনেক পরীক্ষা করেছেন। এটি চরম অবস্থায়ও টিকে থাকে। তারা এই কোষগুলোকে তীব্র এসিডে ফুটিয়েছেন, শক্তিশালী তেজস্ক্রিয়া দিয়েছেন এবং অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়েছেন। দেখা গেছে, প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞের পরও এই কোষগুলোর মূল গঠন বা ডিএনএ পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। মাটির নিচে হাজার বছর থাকলেও ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক বিক্রিয়া এই অংশটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। আধুনিক জিন প্রকৌশল (Genetic Engineering) ও স্টেম সেল থেরাপির যুগে বিজ্ঞানীরা জানেন যে কোনো প্রাণীর একটিমাত্র জীবন্ত কোষ বা ডিএনএ-এর সঠিক তথ্য-উপাত্ত (Blue-print) থাকলে তা থেকে হুবহু সেই প্রাণীকে আবার ক্লোন বা তৈরি করা সম্ভব। এই টেইলবোনটি হলো মানুষের দেহের সেই সুরক্ষিত ডিএনএ চিপ বা ব্লু-প্রিন্ট, যা মাটির নিচে সুরক্ষিত থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদেশে বিশেষ বৃষ্টির পানি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষুদ্র হাড়ের কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ পুনর্গঠিত হবে।

কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না : ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ হলো মানুষের হাতের আঙুলের অগ্রভাগে অবস্থিত সূক্ষ্ম উঁচু-নিচু রেখার অনন্য বিন্যাস। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর কোনো দুই ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পূর্ণরূপে এক নয়। এমনকি অভিন্ন যমজ সন্তানেরও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভিন্ন হয়। ভ্রূণের গর্ভাবস্থার প্রায় ১০১৬ সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর গঠন শুরু হয় এবং ১৭২৪ সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী রূপ লাভ করে। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আঙুলের ছাপের মৌলিক নকশা অপরিবর্তিত থাকে; শুধু দেহের বৃদ্ধি অনুযায়ী এর আকার বড় হয়। আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকরণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অপরাধ তদন্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্মার্টফোন আনলক এবং ব্যাংকিং নিরাপত্তায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (Automated Fingerprint Identification System@AFIS) এবং উন্নত বায়োমেট্রিক অ্যালগরিদম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ আঙুলের ছাপের সঙ্গে তুলনা করে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম। পুনরুত্থানের সময় মহান আল্লাহ হাত-পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ যা জোড়, নখ, সূক্ষ্ম উপশিরা এবং পাতলা হাড় (চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম রেখা) ইত্যাদির মতো সূক্ষ্ম জিনিসগুলোকেও ঠিক ঠিকভাবে জুড়ে দেবেন। বড় বড় অংশকে জোড়া দেওয়া তাঁর জন্য মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না; বরং যার যার শরীর তার অংশগুলোই মিলে প্রথম সৃষ্টির মতো পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ বলেন, মানুষ কি মনে করে যে আমরা কখনোই তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই। আমি ওর আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম। (সুরা : ক্বিয়ামাহ, আয়াত : ৩-৪)

পরিশেষে বলা যায়, পুনরুত্থান এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যার ওপর ইসলামের আখিরাত বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহ, যিনি প্রথমবার মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তাদের কর্মের ন্যায়সংগত বিচার করবেন। আধুনিক বিজ্ঞান মানবদেহের সৃষ্টি, ভ্রূণের বিকাশ, জিনগত তথ্যের সংরক্ষণ, ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনের সূক্ষ্ম গঠন সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির অসাধারণ নিদর্শন তুলে ধরেছে। এসব বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ পুনরুত্থানের বিষয়টি উপলব্ধির সহায়ক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়