• ই-পেপার

কোরআনে যাদের শয়তানের বন্ধু বলা হয়েছে

  • মুফতি দিদার হুসাইন

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৭৫

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

মহান আল্লাহ বলেন, ‌‘নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, আল্লাহর পথে বাধা দিয়েছে এবং তাদের কাছে হেদায়েতের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পরও রাসুলের বিরোধিতা করেছে, তারা আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। শিগগিরই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দেবেন। হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট কোরো না। (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ৩১-৩২)

শিক্ষা ও বিধান

 

১. সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অবিশ্বাসী হওয়া এবং ভালো কাজে বাধা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কুফরি কাজ।

২. কেউ পাপাচারে লিপ্ত হলে বা কুফরি করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না; বরং আখিরাতে তাদের কোনো কাজের প্রতিদান থাকবে না।

৩. বান্দা কখনো রবের ক্ষতি করতে পারে না। রব সর্বদা অন্যের ক্ষতি থেকে মুক্ত; বরং বান্দা নিজের মন্দ কাজের কারণে নিজের ভালো কাজ বিনষ্ট করে।

৪. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ পালন করা ও তাদের কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা মুমিনের কর্তব্য।

৫. মন্দ কাজ ভালো কাজকে বিলীন করে দেয়। তাই সব ধরনের গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা কাম্য।

  (আত-তাফসিরুল মুনির, খণ্ড-২৭, পৃষ্ঠা : ৪৫৬)

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্মবিশ্বাস

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্মবিশ্বাস

আরবরা ইসমাঈল (আ.)-কে আবুল আরব এবং নিজেদের ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসারী দাবি করত; কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের সময় তারা ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস ও শিক্ষার ওপর অবিচল ছিল না। মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির আগে আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরা হলো

মূর্তিপূজা

ইসলামপূর্ব যুগে আরব উপদ্বীপে সর্বাধিক প্রচলিত ধর্ম ছিল মূর্তিপূজা। যদিও মক্কায় একদল একেশ্বরবাদী মানুষ ছিল, যারা দ্বিনে হানিফের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিল। আরবের মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত, কিন্তু তাঁর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে পাথর, কাঠ ও ধাতু দিয়ে নির্মিত দেব-দেবীর পূজা করত। আল্লাহর প্রতি তাদের এই বিশ্বাস ছিল ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর ধর্মের অবশিষ্টাংশ এবং আরবের প্রাচীন নগরী যেমন মাদায়িনে সালিহ, আদ ও সামুদের এলাকায় অবতীর্ণ আসমানি ধর্মগুলোর উত্তরাধিকার। কিন্তু পরবর্তীকালে তাওহিদের এই বিশুদ্ধ আকিদা বিকৃত হয়ে যায়। তার জায়গায় মূর্তি ও নানা কুসংস্কারের উপাসনা ছড়িয়ে পড়ে, যা আরব উপদ্বীপের পার্শ্ববর্তী প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেমনআসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয়, আমোরীয় ও আমোরাইটদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

আরবরা তখন লাত, মানাত, উজ্জা, হুবাল, সুওয়া ও ওয়াদ্দ-এর মতো দেব-দেবীর পূজা করত। পাশাপাশি তারা পূর্বপুরুষদের পবিত্র মনে করত, বিভিন্ন প্রাণীর পূজা করত এবং নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র, দাবরান, সুরাইয়া ও শিরা নক্ষত্রমণ্ডলীর উপাসনা করত। তারা জিন, ফেরেশতা ও অগ্নিরও উপাসনা করত। বেশির ভাগই নবুয়ত ও মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত না। তাদের সমাজে গণক, জ্যোতিষী ও জাদুকরদের প্রভাব ছিল প্রবল এবং নানা পৌরাণিক কাহিনি ও কুসংস্কার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।

আরবে মূর্তিপূজার জন্য নির্দিষ্ট উপাসনালয়ও ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল পবিত্র কাবাঘর। মুশরিকরা কাবাঘরের চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে। হজের জন্য আসা বিভিন্ন গোত্র এসব মূর্তির পূজা করত এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোরবানি ও মানত পেশ করত।

ইহুদি ধর্ম

আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মধ্যে অন্যতম ছিল ইহুদি ধর্ম। ইয়াসরিবের কয়েকটি গোত্র, ইয়েমেন ও ইয়ামামার কিছু ব্যক্তি এই ধর্ম অনুসরণ করত। তারা ধর্মীয় সাহিত্য রচনায় হিব্রু ও আরামীয় ভাষা ব্যবহার করলেও দৈনন্দিন জীবনে আরবি ভাষায় কথা বলত। আরব সমাজের প্রভাবে তারা আরবদের অনেক রীতি-নীতি গ্রহণ করেছিল এবং আরবি নামও ব্যবহার করত। তাদের নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, যেখানে তারা তাওরাত, মিশনা ও তালমুদ অধ্যয়ন করত। এসব প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে উপাসনালয়, প্রার্থনার স্থান এবং ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তারা জাদুবিদ্যায় লিপ্ত ছিল, শনিবার কাজ করাকে নিষিদ্ধ মনে করত, আশুরার রোজা পালন করত এবং ইহুদি ধর্মীয় উৎসবগুলো যথাযথভাবে পালন করত।

খ্রিস্ট ধর্ম

আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে বিস্তার লাভ করা আরেকটি ধর্ম ছিল খ্রিস্ট ধর্ম। খ্রিস্টান সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী এবং খ্রিস্টান দেশ থেকে আসা দাসদের মাধ্যমে এই ধর্ম আরব ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যও খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে উৎসাহ দিত। কেননা এর মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেত। শাম ও ইরাক অঞ্চল থেকে দাওমাতুল জান্দাল, আইলা, কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং মক্কা, ইয়াসরিব ও তায়েফের কিছু ব্যক্তি, বিশেষত আহাবিশ গোত্রের লোকজন ও দাসদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আরব উপদ্বীপে খ্রিস্ট ধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল ইয়েমেন, বিশেষ করে নাজরান। এ ছাড়া সীমিত আকারে বাহরাইন, কাতার ও হাজর অঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটে। প্রাচ্যের খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্ম ও জ্ঞানের ভাষা ছিল আরামীয়। তবে ওয়ারাকা ইবন নওফলের ঘটনার মতো কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সে সময় আরবি ভাষায়ও ইনজিল লেখা হতো।

মাজুসি ধর্ম

ইরান থেকে মাজুসি (অগ্নিপূজারি) ধর্মও আরবের কিছু অঞ্চলে পৌঁছেছিল। তারা মূলত অগ্নি উপাসনা করত। প্রতিবেশী হওয়ায় হিরায় এ ধর্মের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। আবার ইয়েমেনে আবিসিনীয়দের বিতাড়িত করতে পারস্যের সামরিক অভিযান পরিচালিত হওয়ার ফলে সেখানে মাজুসি ধর্মের বিস্তার ঘটে। হাদরামাউত ও আরব উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চলের আরো কিছু এলাকায়ও ইরানের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এর সীমিত প্রভাব দেখা যায়।

সাবেয়ি ধর্ম

সাবেয়ি ধর্মের অনুসারীরা মূলত ইরাক ও হাররান অঞ্চলে সীমিত সংখ্যায় বসবাস করত। মক্কা ও তায়েফে সাবা শব্দটি ধর্মত্যাগের অর্থে ব্যবহৃত হতো। মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে সাবিয়ি বলত, কারণ তারা শিরক ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এরাই ছিল ইসলাম আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠী।

 

তথ্যঋণ : নবীয়ে রহমত ও আর-রাহিকুল মাখতুম

স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় মাটির তৈরি বুগশান প্রাসাদ

আবরার আবদুল্লাহ
স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় মাটির তৈরি বুগশান প্রাসাদ

মুকাল্লা শহর থেকে খায়লা গিরিপথ অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সারি সারি খেজুরগাছ, সবুজে মোড়া উপত্যকা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। আর একটু সামনে এগোলেই দৃষ্টি আটকে যাবে এক দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদের দিকে। এর মনোরম অবয়ব, উজ্জ্বল রঙ, বিশাল আকৃতি এবং গর্বিত ঐতিহ্য দর্শককে সহজেই মুগ্ধ করে। তখন প্রাসাদটি কাছ থেকে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। বলছি ইয়েমেনের গৌরব ও স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময় বুগশান প্রাসাদের কথা।

বুগশান প্রাসাদ ওয়াদি দুয়ানের বাঁ উপত্যকার অন্যতম বৃহৎ প্রাসাদ। প্রাসাদটি উপত্যকার রিবাত বাআশন এলাকায় অবস্থিত। বুগশান প্রাসাদ শুধু হাদরামাউত নয়, বরং সমগ্র ইয়েমেনে মাটির তৈরি স্থাপত্যশিল্পের এক চমৎকার নিদর্শন। হাদরামাউত বা স্থানীয় মাটির স্থাপত্য নিয়ে নির্মিত প্রায় প্রতিটি প্রামাণ্যচিত্র কিংবা আলোকচিত্রে বুগশান প্রাসাদকে হাদরামি স্থাপত্যকলার এক গর্বিত ও প্রকৃত নমুনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রাসাদের নকশাকার ও নির্মাতা উস্তাদ সালেম ফারাজ বিন সাবাহ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। তবু তাঁর নির্মিত এই প্রাসাদ হাদরামাউত ও ইয়েমেনের প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম সুন্দর, অনন্য ও ব্যতিক্রমী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

বুগশান প্রাসাদটি  বাইত বুগশান (বুগশান বাড়ি) নামেও পরিচিত। ১৪ জুন ১৯৫৬ সালে প্রয়াত আহমদ সাঈদ বুগশান, যিনি সৌদি আরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ বুগশানের পিতা, তিনি এই প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রাসাদটির নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রায় সাত থেকে ১০ বছর সময় লেগেছিল। সে সময়ে বুগশান পরিবারের সঙ্গে সৌদি আরবের আল সৌদ রাজপরিবারের সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

বুগশান প্রাসাদের আয়তন প্রায় ৮০২ বর্গমিটার। এতে দুটি প্রধান প্রবেশ পথ আছে। একটি পুরুষদের জন্য প্রধান প্রবেশদ্বার, অন্যটি নারীদের জন্য নির্ধারিত। এ ছাড়া পেছনের দিকে আরো দুটি প্রধান দরজা আছে। প্রাসাদটি ভূতল ও একটি অতিরিক্ত তলাসহ মোট আট তলাবিশিষ্ট। এর ভেতরে ৩৭টির বেশি কক্ষ আছে এবং প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে পৃথক স্নানাগার আছে। প্রাসাদের ঠিক মধ্যে একটি খোলা জায়গা আছে, যার নাম আশ-শামসাহ। এর আয়তন প্রায় ১২১ বর্গমিটার। এই খোলা অংশের মাঝখানে একটি বাক্য উত্কীর্ণ রয়েছে, হে গৃহ! তোমার মধ্যে যেন কখনো দুঃখ প্রবেশ না করে এবং কালের পরিবর্তন যেন তোমার অধিবাসীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। এতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রবেশ করো।

এই খোলা জায়গাটি দুটি উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে। প্রথমত, প্রাসাদটি যেহেতু অত্যন্ত বড়, তাই এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে সব তলা ও কক্ষে আলো পৌঁছতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি পুরো প্রাসাদে স্বাভাবিক বায়ু চলাচল (বায়ু চলাচল) নিশ্চিত করে। এ ছাড়া প্রাসাদের একটি অন্ধকার করিডরে এমন একটি গোপন দরজা রয়েছে, যা দিয়ে বিপদের সময় গোপনে বের হওয়া যায়।

প্রাসাদের অলংকরণে উল্লেখযোগ্য প্রতীকী নকশা দেখা যায়। প্রথমটি পুরুষদের প্রবেশদ্বারের ওপরে। সেখানে দুটি তরবারি একটির ওপর আরেকটি আড়াআড়িভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের ওপরে একটি খেজুরগাছ রয়েছে। এই নকশা সে সময়ের অভিবাসনের স্মৃতি বহন করে, যখন ওয়াদি দুআনের বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাড়ি জমাতেন। দ্বিতীয়টি হলো প্রাসাদের সর্বোচ্চ তলায় স্থাপিত দুটি সিংহের প্রতিকৃতি। এগুলো সাহস, বীরত্ব, আত্মমর্যাদা এবং গৌরবের প্রতীক হিসেবে নির্মিত হয়েছে।

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বুগশান প্রাসাদে বেশ কিছু আধুনিক সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়। এই সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো পুনর্নির্মাণের জন্য নতুন নির্মাণ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। সিঁড়ি, ছাদের নিচের অংশসহ কয়েকটি স্থানে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। প্রাসাদটি নতুন করে রং করা হলেও আগের ঐতিহ্যবাহী রংই অক্ষুণ্ন রাখা হয়।

প্রাসাদটিতে প্রধান প্রবেশদ্বারসহ প্রায় ২০০টি দরজা আছে। সব দরজাই সিদর (বেরি) গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। প্রতিটি দরজা লোহার অলংকরণে সজ্জিত এবং বাত্রাফি পরিবারের দক্ষ কারিগররা হাতে তৈরি করেছেন। প্রাসাদে মোট ১৯০টি জানালা রয়েছে। জানালাগুলোর নকশা প্রাসাদের রং এবং আশপাশের মাটির তৈরি ঘরগুলোর সঙ্গে সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলোও সিদর কাঠ দিয়ে তৈরি।

তথ্যসূত্র : হাদারামাউত ডটঅর্গ

 

বিজ্ঞান যেভাবে পুনরুত্থানের উপলব্ধি সহজ করে

প্রফেসর ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
বিজ্ঞান যেভাবে পুনরুত্থানের উপলব্ধি সহজ করে

আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, নবুয়ত ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের মতোই মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়ার বিশ্বাস প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। কোরআনে পুনরুত্থানকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টির নিখুঁত পরিকল্পনা এবং মানবজীবনের জবাবদিহির অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কিছু দিক কোরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত সৃষ্টির সূক্ষ্মতা এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিকে আরো গভীর করে।

পুনরুত্থান : মানুষের পুনরুত্থান (বাআস বা হাশর) হলো মৃত্যুর পর পরকালে হিসাব-নিকাশের জন্য আবার জীবিত হওয়া। এটি ইসলামের মূল বিশ্বাসের অন্যতম স্তম্ভ এবং পরকালের প্রথম ধাপ। এরপর হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদান। আসলে পরকালের বিশ্বাসই মানবজীবনের গতি পাল্টে দেয়। যেকোনো গর্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে বিরত রাখে। এ বিশ্বাসের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানরা অন্য জাতির মোকাবেলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হয়। পুনরুত্থান বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, মানুষ আমার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায় এবং বলে, অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে; যখন তা পচেগলে যাবে? বলো (হে রাসুল), তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৭৮-৭৯)

যেভাবে পুনরুত্থান : কিয়ামতের প্রথম ফুৎকারের পর পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর দ্বিতীয় ফুৎকারের আগে আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে এক বিশেষ বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের ক্ষুদ্র হাড় (টেইলবোন) সেই পানি শোষণ করবে এবং বৃষ্টির পানিতে যেভাবে শাক-সবজি বা ঘাস গজিয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবে প্রত্যেক মানুষের পূর্ণাঙ্গ শরীর এই হাড়টিকে কেন্দ্র করে আবার মাটির নিচ থেকে নিখুঁতভাবে তৈরি হয়ে উঠবে। ইসরাফিল (আ.) যখন দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁ দেবেন, তখন মহাবিশ্বের পূর্বের সব মৃত জীব ও মানুষ একযোগে জীবিত হয়ে উঠবে। মানুষ তাদের কবর বা যেখানেই তাদের অবশিষ্টাংশ থাকুক না কেন, সেখান থেকে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসবে।  আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, দুইবার ফুৎকারের মাঝে ৪০ হবে। সাহাবিরা বললেন, হে আবু হুরায়রা! ৪০ দিন? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ মাস? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ বছর? তিনি বললেন, অস্বীকার করলাম (অর্থাৎ আমারও জানা নেই)। অতঃপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, এতে তারা উদগত হবে যেমন সবজি উদগত হয়। অতঃপর তিনি বললেন, তখন একটি হাড় ব্যতীত মানুষের গোটা শরীর পচে যাবে। আর সে হাড়টি হলো মেরুদণ্ডের (সর্বনিম্ন ভাগের এবং নিতম্বের ওপরের) হাড়। কিয়ামতের দিন এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ৭১৪৬)

প্রথম সৃষ্টির মতোই পুনরুত্থান : উল্লিখিত আল্লাহর বাণী তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন আর রাসুল (সা.)-এর বানী এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে’—আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসবের সত্যতা দেখা যায়। মায়ের গর্ভে মানবশিশু সৃষ্টির প্রাথমিক ধাপে (গর্ভধারণের প্রায় ১৪-১৫তম দিনে) ভ্রূণে একটি রেখা বা বিন্দুর আবির্ভাব ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Primitive Streak। এর থেকেই মানবদেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্নায়ুতন্ত্র, মাংসপেশি ও হাড় তৈরি হওয়া শুরু হয়। শিশুর পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণের পর এই আদি রেখাটি সংকুচিত হয়ে মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে অবস্থান নেয়, যাকে Coccyx বা টেইলবোন বলা হয়। হাদিসে এই বিশেষ হাড়টিকে আজবুয-জানাব বলা হয়েছে। গবেষকরা এই আদি রেখা বা টেইলবোনের কোষ নিয়ে অনেক পরীক্ষা করেছেন। এটি চরম অবস্থায়ও টিকে থাকে। তারা এই কোষগুলোকে তীব্র এসিডে ফুটিয়েছেন, শক্তিশালী তেজস্ক্রিয়া দিয়েছেন এবং অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়েছেন। দেখা গেছে, প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞের পরও এই কোষগুলোর মূল গঠন বা ডিএনএ পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। মাটির নিচে হাজার বছর থাকলেও ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক বিক্রিয়া এই অংশটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। আধুনিক জিন প্রকৌশল (Genetic Engineering) ও স্টেম সেল থেরাপির যুগে বিজ্ঞানীরা জানেন যে কোনো প্রাণীর একটিমাত্র জীবন্ত কোষ বা ডিএনএ-এর সঠিক তথ্য-উপাত্ত (Blue-print) থাকলে তা থেকে হুবহু সেই প্রাণীকে আবার ক্লোন বা তৈরি করা সম্ভব। এই টেইলবোনটি হলো মানুষের দেহের সেই সুরক্ষিত ডিএনএ চিপ বা ব্লু-প্রিন্ট, যা মাটির নিচে সুরক্ষিত থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদেশে বিশেষ বৃষ্টির পানি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষুদ্র হাড়ের কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ পুনর্গঠিত হবে।

কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না : ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ হলো মানুষের হাতের আঙুলের অগ্রভাগে অবস্থিত সূক্ষ্ম উঁচু-নিচু রেখার অনন্য বিন্যাস। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর কোনো দুই ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পূর্ণরূপে এক নয়। এমনকি অভিন্ন যমজ সন্তানেরও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভিন্ন হয়। ভ্রূণের গর্ভাবস্থার প্রায় ১০১৬ সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর গঠন শুরু হয় এবং ১৭২৪ সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী রূপ লাভ করে। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আঙুলের ছাপের মৌলিক নকশা অপরিবর্তিত থাকে; শুধু দেহের বৃদ্ধি অনুযায়ী এর আকার বড় হয়। আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকরণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অপরাধ তদন্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্মার্টফোন আনলক এবং ব্যাংকিং নিরাপত্তায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (Automated Fingerprint Identification System@AFIS) এবং উন্নত বায়োমেট্রিক অ্যালগরিদম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ আঙুলের ছাপের সঙ্গে তুলনা করে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম। পুনরুত্থানের সময় মহান আল্লাহ হাত-পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ যা জোড়, নখ, সূক্ষ্ম উপশিরা এবং পাতলা হাড় (চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম রেখা) ইত্যাদির মতো সূক্ষ্ম জিনিসগুলোকেও ঠিক ঠিকভাবে জুড়ে দেবেন। বড় বড় অংশকে জোড়া দেওয়া তাঁর জন্য মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না; বরং যার যার শরীর তার অংশগুলোই মিলে প্রথম সৃষ্টির মতো পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ বলেন, মানুষ কি মনে করে যে আমরা কখনোই তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই। আমি ওর আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম। (সুরা : ক্বিয়ামাহ, আয়াত : ৩-৪)

পরিশেষে বলা যায়, পুনরুত্থান এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যার ওপর ইসলামের আখিরাত বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহ, যিনি প্রথমবার মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তাদের কর্মের ন্যায়সংগত বিচার করবেন। আধুনিক বিজ্ঞান মানবদেহের সৃষ্টি, ভ্রূণের বিকাশ, জিনগত তথ্যের সংরক্ষণ, ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনের সূক্ষ্ম গঠন সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির অসাধারণ নিদর্শন তুলে ধরেছে। এসব বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ পুনরুত্থানের বিষয়টি উপলব্ধির সহায়ক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়