কোরআন মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ এবং সর্বশেষ নাজিল হওয়া আসমানি কিতাব। কোরআন ও তার মর্যাদা রক্ষা করা মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। মহানবী (সা.)-এর সময় থেকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে কোরআন সংরক্ষিত হয়ে আসছে। আধুনিক যুগে কোরআন সংরক্ষণের একটি মাধ্যম জাদুঘর। পবিত্র কোরআন সংরক্ষণের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বিশেষায়িত জাদুঘর, যার মধ্যে পাঁচটি বিখ্যাত জাদুঘরের বিবরণ তুলে ধরা হলো।
১. বাইত আল কোরআন : বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত বিশেষায়িত এই জাদুঘর ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত। এর সংগ্রহে ১০ হাজারের বেশি কোরআনের অনুলিপি রয়েছে, যার মধ্যে আছে খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে তৈরি কোরআনের অনুলিপি। ধারণা করা হয়, এটাই কোরআনের সবচেয়ে প্রাচীন কপি। আরো আছে, হিজরি প্রথম শতকের (৭০০ খ্রি.) একাধিক অনুলিপি, জার্মানি থেকে মুদ্রিত প্রথম কোরআন (১৬৯৪ খ্রি.), সুইজারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত কোরআনের প্রথম লাতিন অনুবাদ (৯৫৫ খ্রি.), কোরআনের ক্ষুদ্রতম অনুলিপি ইত্যাদি। জাদুঘর হলেও এখানে আছে ৫০ হাজার বইয়ে সমৃদ্ধ একটি বড় পাঠাগার, সুপরিসর মসজিদ ও সভাকক্ষ।
২. হলি কোরআন এক্সিবিশন : সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত এই জাদুঘরটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আধুনিক কোরআন প্রদর্শনী কেন্দ্র, যা মসজিদে নববী কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত। এই জাদুঘরে হিজরি প্রথম শতক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একাধিক কোরআনের অনুলিপি প্রদর্শন করা হয়েছে। বিশেষত ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কোরআন মুদ্রণের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে হাফেজ উসমান কর্তৃক প্রস্তুতকৃত কোরআনের অনুলিপি আছে, যা হরিণের চামড়ায় লেখা হয়েছে। এ ছাড়া আছে প্রায় ২০০ বছর আগে গোলাম মহিউদ্দিন প্রস্তুতকৃত কোরআনের বৃহৎ অনুলিপি। এটা এত ভারী যে চারটি উটের পিঠে করে তা আফগানিস্তান থেকে মদিনায় আনা হয়েছিল। পাণ্ডুলিপিটি দেড় মিটার লম্বা এবং এক মিটার চওড়া। এর ওজন ১৫৪ কেজি। এর প্রতিটি পৃষ্ঠার নিচে ফারসি ভাষায় কোরআনের অনুবাদ আছে।
৩. হলি কোরআন মিউজিয়াম : সংযুক্ত আরব আমিরাতের সারজায় অবস্থিত এই জাদুঘরকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আইকনিক কোরআন জাদুঘর মনে করা হয়। এখানে কোরআনের সাড়ে চৌদ্দ শ বছরের ইতিহাস জীবন্ত করে তোলা হয়েছে; যেমন—এখানে প্রথম কোরআন নাজিলের স্থান হিসেবে হেরা গুহার মডেল তৈরি করা হয়েছে। প্রথম যুগে পশুর হাড়, গাছের বাকল ও চামড়ায় কিভাবে আয়াত লেখা হতো তা দৃশ্যমান করা হয়েছে। পাশাপাশি কোরআন সংরক্ষণের ইতিহাস লিখিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে কোরআনের ৬০টি প্রাচীন অনুলিপি আছে, যা হিজরি শতক অনুসারে ১৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এখানে আছে খেজুরপাতায় লেখা কোরআনের বিরল অনুলিপি।
৪. ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব হলি কোরআন : ইরানের রাজধানী তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাদুঘরটি কোরআন বিষয়ক সর্ববৃহৎ জাদুঘর এবং এর অবস্থান ভূস্তর থেকে ১৪ মিটার গভীরে। জাদুঘরটির আয়তন ১০ হাজার বর্গমিটার। এখানে শুধু কোরআনের প্রাচীন অনুলিপি ও ইতিহাসই তুলে ধরা হয়নি, কোরআনিক শিল্পকলার বিমূর্ত চিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে। এই জাদুঘরে চতুর্থ হিজরি শতক থেকে কাজার আমলের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কালের কোরআনের একাধিক অনুলিপি আছে। পাশাপাশি কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য শিল্পকলা, যেমন—সোনালি প্রলেপ, বাঁধাই, ক্যালিগ্রাফি ইত্যাদির বিকাশপ্রক্রিয়াও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৫. মালাক্কা আল কোরআন মিউজিয়াম : এটি মালয়েশিয়ার মালাক্কা শহরে অবস্থিত কোরআন বিষয়ক বিশেষায়িত জাদুঘর, যা রেস্তু ফাউন্ডেশন ও মালাক্কা রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে। ১০ জানুয়ারি ২০০৮ জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি মালাক্কার কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অবস্থিত। এই জাদুঘরে ১২টি প্রধান হল আছে, যাতে কোরআনের বিভিন্ন সংগ্রহ প্রদর্শন করা হয়। জাদুঘরের সংগ্রহশালায় আছে কোরআনের একাধিক প্রাচীন অনুলিপি ও কোরআন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও নিদর্শন। এ ছাড়া জাদুঘরে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট এবং ইন্দোচীন ও মালয়বিশ্বে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্যঋণ : আরব নিউজ, মাদায়েন প্রজেক্ট, ভিজিট সারজা, ভিজিট ইরান ও উইকিপিডিয়া