kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

কালের সাক্ষী কিসরার রাজপ্রাসাদ

মুহাম্মদ জিয়াউল হক   

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কালের সাক্ষী কিসরার রাজপ্রাসাদ

পারস্যের রাজপ্রাসাদ কাখে কিসরার ধ্বংসাবশেষ, ইরাক

ইরাকের একটি ছোট শহর ‘মাদায়েন’। তিলোত্তমা নগরী মাদায়েন, যা দূর অতীতে পারস্যের রাজধানী ছিল। প্রতাপশালী পারস্যসম্রাট কিসরা এই শহরেই বাস করত। পারস্যবাসী অর্থাৎ ইরানিদের বাদশাহর উপাধি ছিল ‘কিসরা’।

বিজ্ঞাপন

ফারসি নাম খসরুর অপভ্রংশ তথা আরবি ভাষায় গৃহীত ভিন্ন ভাষার শব্দ। রাসুল (সা.)-এর যুগে যে কিসরা ছিল তার নাম খসরু পারভেজ বিন হরমুজ বিন নওশিরওয়া। সে প্রথম খসরুর (নওশিরওয়া) নাতি এবং ‘সাসানি’ সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাট। তাকে বলা হতো দ্বিতীয় খসরু। তার শাসনকাল ছিল ৫৮৯ হতে ৬২৮ সাল পর্যন্ত। ৩৯ বছর তিনি ক্ষমতার মসনদে বসে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

পারস্যের রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষকে ‘কাখে কিসরা’ও বলা হয়। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে ৪০ কি.মি. দক্ষিণে অবস্থিত। সে যুগে এই প্রাচীনতম শহর—মাদায়েনের প্রাকৃতিক আবহাওয়া, পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থান ছিল খুবই উপযোগী। দজলা নদী তখন শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। দজলার পূর্ব-পশ্চিম উভয় তীরে জনপদ ছিল। তবে শুধু পূর্ব অংশকে মাদায়েন বলা হতো। শহরের প্রাণকেন্দ্র ছিল পূর্বতীরে। এখন অবশ্য নদী শহর থেকে বেশ দূরে। সুরক্ষিত মাদায়েনের এ দুর্গকে মনে করা হতো অপরাজেয়। কেননা দুর্গের কাছ দিয়ে প্রবাহিত হতো দজলা নদী (টাইগ্রিস) যা অতিক্রম করা ছিল বহিঃশত্রুদের জন্য দুষ্কর ব্যাপার। ইতিহাসে কথিত আছে, নবী (সা.)-এর  জন্মের সময় এ রাজপ্রাসাদের সুউচ্চ চৌদ্দটি সৌধচূড়া ধসে পড়ে। বিশ্বখ্যাত হাদিসবিশারদ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দা (রহ.) এসংক্রান্ত হাদিস সহিহ নয় বলে উল্লেখ করেছেন। (আল-মাছনু ফি মারিফাতিল হাদিসিল মাওজু : পৃষ্ঠা ১৮)

পুরো প্রাসাদের দেয়ালজুড়ে বিরাট ফাটল সৃষ্টি হয়। এত মজবুত দেয়ালে ফাটল—মহান আল্লাহর কুদরত ছাড়া আর কিছু নয়। প্রাচীন পারসিক যাজকদের উপাসনাগারগুলোতে যুগ যুগ ধরে প্রজ্বলিত হয়ে আসা অগ্নিকুণ্ডগুলো নির্বাপিত হয়ে যায়। সরব গির্জাগুলো নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। প্রাসাদের চারপাশে জ্বালিয়ে রাখা মশাল দূর থেকে দেখা যেত। আগুনের এই ‘লেলিহান শিখা’র পাশে এসে পারসিকরা পূঁজা-আর্চনা করত। দজলা (টাইগ্রিস) নদের ওপার (পশ্চিম) থেকে অগ্নিকুণ্ডের এ দৃশ্য দেখে, ‘মুসলমানরা বলত, আল্লাহ তায়ালা খন্দক যুদ্ধের সময় এই রাজপ্রাসাদ জয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন।

জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, ‘খন্দক যুদ্ধের সময় আমরা পরিখা খনন করছিলাম। এমন সময় একটি দুর্ভেদ্য পাথরখণ্ড সামনে পড়ে, কুঠারাঘাত যার ওপর কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারছিল না।   সাহাবায়ে কেরাম নবীজি (সা.)-এর দরবারে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, একটি পাথর খননকাজে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি নিজেই আসছি। ’ ক্ষুধার তাড়নায় পেটে তখন পাথর বাঁধা ছিল। রাসুল (সা.) কুঠার হাতে নিয়ে সেই পাথরে আঘাত করতেই বালুর ঢিবির মতো গুঁড়া গুঁড়া হয়ে গেল। তিনি একে একে তিনবার কুঠার চালান, দ্বিতীয়বার কুঠাল চালানোর সময় রাসুল (সা.)-এর পবিত্র জবানে এই কবিতা আবৃত্তি করেন, (অর্থ) ‘আল্লাহর কসম! আমি এখান থেকেই মাদায়েন এবং তার শুভ্র প্রাসাদ দেখতে পাচ্ছি। ’

উমর (রা.)-এর শাসনকালে মহানবী (সা.)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়। কাদিসিয়ার যুদ্ধ শেষে, সেনাপতি সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর কয়েকজন দূত ধুলি উড়িয়ে মদিনায় এলো। তারা এসেছে বিজয়ের সংবাদ নিয়ে। রাজধানী মাদান পতনের সংবাদ খলিফাতুল মুসলিমিন উমর (রা.)-এর কাছে দিল। তাদের পেছনে পেছনে এলো যুদ্ধলব্ধ প্রচুর সম্পদ। তাতে মুক্তাখচিত কিসরার মুকুট। মুকুটটি এত ভারী ছিল, যা কিসরার মাথার ওপর লোহার শিকল দিয়ে ঝোলানো থাকত, এর নিচে সে বসত। মহামূল্যবান মিহি স্বর্ণের সুতায় তৈরি তার রাজকীয় পোশাক। অপূর্ব দুর্লভ পাথরে সজ্জিত তার আচকান। আরো কত কী! এত সম্পদ দেখে বিস্ময়ে উপস্থিত সবার চক্ষু ছানাবড়া। উমর (রা.) গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, নিশ্চয়ই যারা এ সম্পদ বাইতুলমালে জমা করেছে তারা বিশ্বস্ত।

সেই আড়ম্বরপূর্ণ কিসরার রাজপ্রাসাদের কিছুই এখন নেই ধ্বংসস্তূপ ছাড়া। শুধু একটি সুউচ্চ প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী এবং শিক্ষার উপকরণ হয়ে। বিশাল এই ভগ্নপ্রাচীর, এটা যেন ইতিহাসের জীবন্ত স্কিন। প্রাচীরটির উচ্চতা ৩০মি. দৈর্ঘ ৪০ মি.। প্রতিটি দেয়াল প্রায় ৩০ ফিট চওড়া। প্রাসাদের যে সিংহাসনটিতে বসে কিসরা দেন-দরবার করত, সেটা ছিল ১০০ ফিট উচুঁ, এর বাম পাশে দরবার হল থেকে বের হওয়ার আলিশান দরজা ছিল। সে যুগে এমন অভিনব উঁচু প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা ভাবতে অবাক লাগে! দীর্ঘ ৯০ বছর সময় লেগেছে এর নির্মাণকাজ সমাপ্ত হতে। প্রাচীর-গাত্রের ফাটল সম্পর্কে বলা হয়, সেটা গম্বুজ ধসে পড়ার সময়ের সৃষ্টি। বিভিন্ন সময় বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ফাটল সংস্কারের চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। প্রাসাদের প্রবেশদ্বারের ঝুলন্ত পর্দায় স্বর্ণের কারুকাজের পরিমাণই ছিল দশ লাখ ভরি! তাহলে রাজপ্রাসাদে সম্পদের পরিমাণ ছিল কত? এই যে বিশাল ভগ্নপ্রাচীর। পরবর্তী মুসলিম শাসকরা কিসরার এই রাজপ্রাসাদকে একটি শিক্ষণীয় স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছিল। খলিফা মানসুর একবার এটিকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন। তখন তাঁকে তাঁর জনৈক ইরানি উপদেষ্টা এ পরামর্শ দিলেন, আপনি যদি এই প্রাসাদটি এভাবেই রেখে দেন তাহলে যারাই তা দেখতে আসবে, তাদের  প্রত্যেকের মনে এই অনুভূতি জেগে উঠবে যে নিশ্চয়ই মুসলমানদের সঙ্গে আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য আছে। অন্যথায় আরবের উপকরণশূন্য মরুচারীদের পক্ষে দজলা নদী পার হয়ে এ ধরনের রাজপ্রাসাদ জয় করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। খলিফা মানসুর পরামর্শ শুনলেন কিন্তু মানলেন না। লোক ভাড়া করে প্রসাদটি ভাঙার কাজ শুরু করলেন। কিছু অংশ ভাঙার পর তিনি উপলব্ধি করলেন, এটিকে ভাঙতে গেলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাবে। খলিফা মানসুর অনেক চিন্তা-ভাবনা করার পর অবশেষে কাজ বন্ধ করে দিলেন। ভগ্নপ্রাচীরটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাজা-বাদশাহদের জন্য এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার অনেক কিছু আছে।

 

লেখক : খতিব, মদিনা জামে মসজিদ, রায়পুরা, নরসিংদী।

 

 



সাতদিনের সেরা