kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চোখ আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি

রুকন ইনআম   

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চোখ আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি

চক্ষু, চোখ, লোচন, নয়ন, নেত্র, অক্ষি, আঁখি। আরবিতে বলে আইনুন। আরবি আইনুনের ১০০ অর্থ আছে। আবার চোখের আরবিও অসংখ্য।

হিন্দিতে আঁখ ও নাইন বেশি ব্যবহার হয়। ইংরেজরা বলে আই। ফারসিতে বলে চশমো। আবার উর্দুুতে চশমা মানে ঝরনা। বাংলায় চশমা চোখের গ্লাসকে বলা হয়। ভাষার কারিকুরি অদ্ভুত, আবার মজাদারও। জাপানি ভাষায় চোখকে মে বলে। চায়নিজরা চোখকে বলে ইয়েনজিং। ফরাসি ভাষায় চোখকে লই বলে।

জার্মানরা কী বলে জানেন? ডাস আউগা। ইতালিয়ানরা বলে লোকিউ।

 

চোখের কাজ কী?

মানবদেহের পরিচালনা করে মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কে তথ্য সরবরাহ করে অনেক সেন্টার। এর মধ্যে চোখ অন্যতম। চোখ দেখে, বহুদূর পর্যন্ত অবজারভ করে মস্তিষ্কের কাছে তথ্য পৌঁছায়। চারপাশের দৃশ্যাবলি চোখের সহায়তায় মস্তিষ্কে দৃশ্যকরণ করে তথ্য পাঠায়। মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চোখের বিশাল ভূমিকা রয়েছে।

ডিএইসএলআরের সক্ষমতা কত ফিক্সেল? আমাদের চোখের পরিষ্কার সক্ষমতা ৫৭৬ মেগাপিক্সেল। উন্নত ক্যামেরা আঁধার রাতের ছবি ক্লিয়ার করতে পারে না। আপনি কিন্তু অন্ধকারে পরিষ্কার না হলেও বোধগম্য চিত্র দেখতে পারেন। এটাই সুপারপাওয়ার চোখের কারিশমা।

চোখের আরেক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, চোখে ঘুম নামে। ঘুমের মাধ্যমে আমরা ক্লান্তি কাটিয়ে সজীবতায় ফিরি।

জান্নাতে ঘুম থাকবে না। চোখ বড় করার কিছু নেই। জান্নাতে শ্রান্তি-ক্লেশ থাকবে না। ঘুমের দরকার নেই। তবু আপনার ঘুমের খায়েশ হলে, আয়েশ করে ঘুমাতে পারবেন।

চোখে যথাযথ ঘুম না হলে শরীর অস্বাভাবিক হয়। চেহারা, শরীর ও মন তছনছ হয়ে যায়। চোখের কোণে কালি জমে। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়।

চোখের আরেক বৈশিষ্ট্য, চোখ কাঁদে। আমাদের মন বিষণ্ন ও বিধ্বস্ত হলে চোখে অশ্রু নামে।

যদি চোখের অশ্রু ব্যবস্থাপনা না থাকত, মানুষ দুঃখে মরে যেত। কিছু কিছু কষ্টের প্রশমন অশ্রু ছাড়া সম্ভবপর নয়।

চোখের জলজ ব্যবহার আমাদের মনকে হালকা করে। আল্লাহর কাছে পাপবোধের অশ্রু বেশি মূল্যবান।

তওবার সময় গড়িয়ে পড়া অশ্রুধারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির পরিপুষ্ট কমল।

এক প্রিয় মানুষের ভাবনা, যে চোখ কাঁদে না, তা কম সুন্দর। আসলেই অশ্রু চোখ ধুয়ে দিলে বর্ষা ধোয়া সবুজাভ পত্রের মতো লাগে নেত্রপল্লব।

চোখ মানবদেহের অন্যতম সুন্দর অঙ্গ। পৃথিবীর সব সাহিত্যে চোখের বিপুলকায় বর্ণনার ছড়াছড়ি।

চোখের তারা, ভ্রু, পাপড়ি, পাতার সৌন্দর্য ও রূপ বিশ্লেষণ করতে করতে সাহিত্যিকরা ক্লান্ত। তবু চোখের সুষমাময় ব্যাখ্যা শেষ হয় না।

খ্যাত গীতি। বলা হয় মুখের কথার চেয়ে চোখের কথা গভীরতর।

চোখের সৌন্দর্যের সঙ্গে চোখের ভাষা আছে। এ ভাষা বেশ সমৃদ্ধ। মুখের ভাষার চেয়ে শক্তিশালী। কিছুটা জটিলও বটে।

চোখের চাহনি, ইশারা ও ওঠা-নামায় ব্যাপক অর্থ থাকে।

মুখের ভাষা সুসংগঠিত। চোখের ভাষা বৃষ্টির মতো এলোমেলো। চোখের ভাষা বুঝতে ও বোঝাতে মানুষ হরদম ভুল করে। চোখ নিমিষেই সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে। কোরআন বলছে, ‘...তারা যেন তাদের তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে আছড়িয়ে ফেলবে...।’ (সুরা : ক্বলাম, আয়াত : ৫১)

ফারসিতে প্রবাদ আছে, শাইখের সুনেত্রে শিষ্যের পাথেয় হয়ে যায়।

চোখের ভাষা এত ব্যাপক, অভিধান তা সংকুলান করতে পারে না।

চোখের কারকুন জানা নারীর কৌশলজালে কত পুরুষ বিলীন হয়েছে জানা নেই। পুরুষও কম যান না।

আই কন্টাক্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গোয়েন্দারা মুখের ভাষার চেয়ে চোখের কথা বেশি লক্ষ করেন।

মুখে মিথ্যা বলা সহজ, চোখের ভাষায় মিথ্যার মিশ্রণ কঠিন। কারো ভাষার সঠিকতা বুঝতে চাইলে চোখে চোখ রাখুন।

মানুষ চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলতে পারে না। অথবা কম পারে।

রাসুল (সা.) চোখে চোখ রেখে সজীব ও সহজ করে কথা বলতেন। এটা সুন্নত।

চোখের মাঝ দিয়ে আমরা আল্লাহকে চিনি, বুঝি ও ভাবি।

চোখ মহান আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি। কোরআনের ইঙ্গিত দেখুন : ‘আমি (আল্লাহ) কি তার জন্য সৃষ্টি করিনি দুই চোখ?’ (সুরা : বালাদ, আয়াত : ৮)

চোখের মাধ্যমে সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখার কথা যেমন কোরআন মজিদ বলেছে, তেমনি চোখকে নাজায়েজ ও ক্ষতিকর বিষয় থেকে সরিয়ে রাখার কথাও কোরআন বলেছে।

মানুষ একসময় ভাবত, চোখের বিকিরণ বস্তুতে গেলে বস্তু দৃশ্যমান হয়।

মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনু হাইশাম এসে এই ভ্রান্তি দূর করেন। তিনি চশমার উদ্ভাবক। আমাদের চোখে বস্তুর আলো এসে পড়লে আমরা তা দেখি। তাহলে অন্ধত্ব কী? বস্তুর আলো গ্রহণ করার অক্ষমতা। এ জন্য আকাশপটে তারা যখন দেখি তা মিনিমাম পাঁচ মিনিট আগের তারা। কারণ কমপক্ষে পাঁচ মিনিট লাগে তারার আলো চোখের তারায় এসে পড়তে। বহু তারার আলো আজও পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়নি। নীহারিকাপুঞ্জ বহু সুদূরে অবস্থিত।

চোখের ভাষার ব্যবহারে সমঝদার হওয়া উচিত। চোখে সংযম রাখা ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য। চোখের অপব্যবহার মানুষের ভেতর-বাইর নষ্ট করে দিতে পারে। কিছু কিছু চোখ গোলাপের মতো পবিত্র, লাজুকলতার মতো সলাজ। কিছু চোখ বেহায়া ও বীতশ্রদ্ধ।

চেহারার সৌন্দর্যের এক আজব কারিগর চোখ। ডাগর চোখে ভ্রমর ভ্রু হলে দেখতে ভালো লাগে।

চোখ সুন্দর মানুষের কান্না পর্যন্ত সুন্দর। তারা হাসলে চোখের চৌপাড় হেসে কুটিকুটি হয়।

চোখ মানুষকে বোঝার বিশেষ শাখা। কারো চোখের দিকে গভীরভাবে তাকালে তার অবস্থা বোঝা যায়।

মাতা-পিতা চোখের দিকে তাকিয়ে সন্তানের সুখ-দুঃখ বুঝে ফেলেন।

আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) চোখে সুরমা দিতেন। এটা সুন্নত। ভ্রু কাটাকাটি অপছন্দনীয় কাজ। পৃথিবীর সৃষ্টির সুন্দরতম মানুষ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর চোখও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ।

কিছু চোখ আল্লাহকে চেনার জন্য দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। আল্লাহর নিখুঁত সৃষ্টি অবলোকন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এমন চোখ সম্পর্কে কোরআন বলছে, ‘যিনি স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। তুমি আবার তাকিয়ে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি?

অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফেরাও, সে দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ৩-৪)

যে চোখ আল্লাহকে চেনে না, সে হতভাগা চোখ। যে চোখ আল্লাহকে মানে না, সে অভিশপ্ত চোখ।

যে চোখ ওহির জ্ঞান বঞ্চিত, সে চোখ অবাঞ্ছিত। যে চোখে মানুষের জন্য অশ্রু নেই, মানবতার জন্য শিশির নেই, সেটি মরু চোখ। এমন চোখ থেকে আল্লাহর পানাহ চাই।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা