কিডনি দানে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি
অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ
দেশে কিডনি রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০ সালে দেশে কিডনি রোগের হার ছিল ১৫-১৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ শতাংশে। এর প্রধান কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। গত কয়েক বছরে এ দুই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কিডনি রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে চিকিৎসার জন্য ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে ডায়ালাইসিসের তুলনায় কিডনি প্রতিস্থাপন অনেক বেশি কার্যকর। সাধারণত নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা রোগীরা গড়ে পাঁচ-ছয় বছর বেঁচে থাকেন, কিন্তু সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগীরা ১৫ থেকে ৩০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। তাই কিডনি দান সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত
অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ
বৈশ্বিক উষ্ণতা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বিশুদ্ধ পানির সংকট সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত করছে। বিশেষ করে কিডনি রোগের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত গভীর, এখনই ব্যবস্থা না নিলে যা ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১.৫-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে এবং ২১০০ সালের মধ্যে তা ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি বাড়তে পারে। এতে তাপজনিত অসুস্থতা, পানিবাহিত রোগ, খাদ্যসংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে কিডনি রোগ বহুগুণে বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত গরমে যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন; যেমন—কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক ও রিকশাচালক, তাঁদের পানিশূন্যতা কমাতে পানি খেতে হবে।
কিডনি রোগ প্রতিরোধে জোর দিতে হবে
জোবায়দা বেগম
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আশার কথা হলো, প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে শুধু সচেতনতার মাধ্যমেই এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথাগত ডায়ালাইসিসের বাইরে বর্তমানে ‘সিএপিডি’ নামে এক ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে কম খরচে ঘরে বসেই চিকিৎসা করা সম্ভব, যা থাইল্যান্ড বা হংকংয়ের মতো দেশে বেশ জনপ্রিয়। এই পদ্ধতির সরকারি প্রশিক্ষণ ও প্রসারের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পরিবেশদূষণ এবং তীব্র তাপমাত্রার সঙ্গে কিডনি রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কীটনাশকে বাড়ছে কিডনি রোগের ঝুঁকি
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মতো কিডনি রোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও সার, কীটনাশক, পানিশূন্যতা এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষুুদ্র অণুজীবের কারণে অনেক সময় এই রোগ হচ্ছে। যার সঠিক কারণ প্রায় ১৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অজানা থাকে। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে কীটনাশকের ব্যবহারের কারণে এই ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। অজানা কারণ জানতে এবং কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক সারের ব্যবহার, বন উজাড় রোধ এবং বেশি করে গাছ লাগানো অন্যতম। এ ছাড়া পেইন কিলার (ব্যথানাশক) ও অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধ করা, বিশুদ্ধ খাবার ও পানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিয়মিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন
দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে। এর মধ্যে কিডনি রোগ একটি। কিডনির কোষ একবার নষ্ট হলে তা আর নতুন করে তৈরি হয় না। সাধারণত ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কার্যক্ষমতা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কিডনি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অনেক সময় কোনো উপসর্গ না থাকায় রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন, যা বিপদ আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই রোগটি শনাক্ত করার প্রধান উপায় হলো নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কিডনি রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ অস্বাস্থ্যকর খাবার, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান ও জলবায়ু পরিবর্তন। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করাই কিডনি সুরক্ষার প্রধান উপায়।
দেশপ্রেমিক নেতৃত্বে আসবে স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন
হাসান হাফিজ
দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যগত ভোগান্তিও বেড়েছে। বিশেষ করে খাদ্যদূষণ, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা সামনে আসছে। সৎ রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বেই কেবল স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশে কিডনি রোগের মতো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব প্রকট। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছাতে হবে। মেগাপ্রকল্পের চেয়ে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য যদি ঠিক রাখতে না পারি তাহলে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ কী করে গড়ে তুলব। তাই দেশের প্রতিটি স্কুলে এবং পাড়ায় পাড়ায় বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা হেলথ ক্যাম্প চালু করা উচিত।
প্রয়োজনীয় তথ্য বা নির্দেশিকা প্রদান করতে হবে
রেজওয়ান সালেহীন
সম্প্রতি তীব্র জ্বর হয়ে পানিশূন্যতার কারণে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। কিছুদিন আগে আমি ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মদিনায় ছিলাম। ওই সময় আমার রক্তচাপ কমে যায়, ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যায়। অথচ আমার বাবা একজন ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও শুরুতে আমার কিডনি বিকলের সংকেত টের পাইনি। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যেখানে একজন সচেতন মানুষও বিষয়টি বুঝতে দেরি করেন, সেখানে সাধারণ মানুষ কিভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবে? বাংলাদেশে কিডনি রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। অনেক রোগীই বুঝতে পারেন না, তাঁরা কিভাবে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। সচেতনতা তৈরির বিষয়টি অনেক সময় একঘেয়ে মনে হয়। তাই সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান, তাঁরা যেন বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে উপভোগ্য করে উপস্থাপন করেন।
পাঠ্যক্রমে স্বাস্থ্যসচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
গাজী আশরাফ হোসেন
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেই ক্রিকেটারদের খেলতে হয়। এই প্রচণ্ড গরমে ক্রিকেট খেলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমার খেলোয়াড়ি জীবনে প্রচুর ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের কারণে শরীরের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ১২ বছর ধরে আমি কিডনি রোগে ভুগছি। শুধু খেলোয়াড় নয়, তীব্র গরমে গ্রামীণ এলাকার মানুষও খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। তাঁরা অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। ফলে তাঁদের মধ্যে কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগটি প্রতিরোধে প্রতিটি স্কুলে শিশুদের শুধু ওজন নয়, শরীরের মেদ ও কোমরের মাপও পরীক্ষা করা উচিত।
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে
খোন্দকার মোস্তান হোসেন
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কিডনি রোগী দিন দিন বাড়ছে। আর একবার কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পাশাপাশি এই রোগের চিকিৎসাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ক্যাম্পস’ টাঙ্গাইলের সখীপুরে কৃষক ও শ্রমিকদের কিডনি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করেছে। ওই এলাকার মানুষ এতটাই সচেতন যে, বাংলাদেশের অন্য কোথাও এমন সচেতনতা খুব একটা দেখা যায় না। তাই কিডনি রোগ প্রতিরোধে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং স্কুল পর্যায়ে শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করতে হবে।
শিশুদের স্বাস্থ্যকর জীবনমান নিয়ে ভাবতে হবে
অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগম
ঢাকার উচ্চ বায়ুদূষণ গর্ভবতী মা ও শিশুস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মা যখন দূষিত বাতাস গ্রহণ করেন তখন সিসা, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত পদার্থ রক্ত ও বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে তার লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে। বড়দের তুলনায় শিশুদের অক্সিজেন ও পানির চাহিদা অনেক বেশি। ফলে শিশুরা দ্রুত ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়, যা থেকে পরে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমানে শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে ট্রান্সফ্যাট, অতিরিক্ত লবণ ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল রয়েছে, যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পরিবেশ রক্ষায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি
আলমগীর কবির
দেশে মোট ভূমির অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকা মহানগরের উত্তরে বনভূমির হার প্রায় ১০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ১০.৫ শতাংশ। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে পাঁচ থেকে সাত ফুট পলিথিনের স্তর জমে আছে। এই পরিবেশ বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ঢাকা শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের সঠিক পরিকল্পনা নেই। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, দাবদাহ, খাদ্যে ভেজাল এবং কৃষিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে নানা রোগ বাড়ছে। এর মধ্যে কিডনি রোগের প্রকোপও দ্রুত বাড়ছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন জরুরি।
বিশুদ্ধ পানির অভাবে কিডনি কার্যকারিতা হারাচ্ছে
ড. মোহাম্মদ একরামুল ইসলাম
সারা পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এতে মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকেরই কিডনি কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কিডনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। এর কারণ হলো রক্ত থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। বন উজাড়, শিল্পদূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে পরিবেশ বিপর্যয় এখন আরো তীব্র হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব ভোগ করছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী রেখে যেতে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
বেশির ভাগ শ্রমিক কিডনি রোগ সম্পর্কে অবগত নন
ডা. মোহাম্মদ আলী
কিডনি রোগকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ অনেক মানুষ নিজের অজান্তেই এই রোগে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ছয় হাজার পোশাক কারখানায় ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতন নন। কী কী লক্ষণ দেখা দিলে কিডনি রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়—সে বিষয়ে তাঁদের সাধারণ ধারণাও নেই। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিএমইএ শ্রমিকদের সচেতন করতে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন কারখানায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। এতে কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।



১০ জনে একজন এ রোগে আক্রান্ত
যেখানে সচেতনতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিশেষায়িত চিকিৎসা পর্যন্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমরা মার্চ মাস এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করে আসছি। আমাদের এবারের থিম ‘আর উই রেডি ফর এন্ডোমেট্রিওসিস সার্ভিস’? অর্থাৎ আমরা কি এন্ডোমেট্রিওসিস এর চিকিৎসাসেবার জন্য প্রস্তুত? একই আলোকে আমাদের আজকের আলোচনা ও আমাদের এই গোলটেবিল। এন্ডোমেট্রিওসিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি অনেকটা অবহেলিত। এন্ডোমেট্রিওসিস শুধু একটি গাইনোকোলজিক্যাল রোগ নয়। এটি নারীর জীবনমান, তাঁর কর্মক্ষমতা, মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যর ওপর প্রভাব ফেলে। মাসিকের সময় ব্যথা ছাড়াও পায়খানা-প্রস্রাবের সময়, সহবাসের সময় ব্যথা হতে থাকে। বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। অনেকের মাসিক চলাকালে তলপেটে রক্ত জমা হয়ে চকলেট সিস্ট হতে পারে। তাই এই সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যাদের পরিবারে মা, খালা, ফুফুদের এই সমস্যা ছিল। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি।
গাইনোকোলজিক্যাল সার্জারির মধ্যে এন্ডোমেট্রিওসিস সার্জারি সবচেয়ে কঠিন। অনেক সময় ক্যান্সারের সার্জারির চেয়েও জটিল। ল্যাপারোস্কোপিক ও ল্যাপ্রোটমি—এই দুই পদ্ধতিতে এন্ডোমেট্রিওসিস সার্জারি করা হয়। ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতি আধুনিক হলেও দেশে ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়। সার্জারির সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের (অন্ত্র, মূত্রথলি) ক্ষত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে তরুণ রোগীদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা রক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। বয়স্ক রোগীরা দীর্ঘদিন এই রোগে আক্রান্তের কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের (ইউরেটার বা মূত্রনালি) অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা অস্ত্রোপচারকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। একজন সার্জনকে এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলায় দক্ষ হতে হবে এবং নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে বাংলাদেশে এখনো এন্ডোমেট্রিওসিসের জন্য ল্যাপ্রোটমি গুরুত্বপূর্ণ।
এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয় করতে গড়ে ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত দেরি হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ হলো পিরিয়ডের সময় ব্যথা হওয়াকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করা। অনেক কিশোরী সামাজিক লোকলজ্জা বা স্টিগমার ভয়ে ব্যথার কথা কাউকে জানাতে চায় না, যার ফলে তারা চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করে। এ ছাড়া অনেক সাধারণ চিকিৎসকের এই রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না। উপজেলা পর্যায় থেকে বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী পাঠানোর সঠিক রেফারেল সিস্টেমের অভাবও একটি বড় সমস্যা। রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে এন্ডোমেট্রিওসিসের জটিলতা বাড়তে থাকে (যেমন—স্টেজ ১ বা ২ থেকে স্টেজ ৪-এ পৌঁছানো) এবং ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের ক্ষমতা বা ফার্টিলিটির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মা-বাবা, অভিভাবক এবং স্কুল শিক্ষকদের সচেতনতা জরুরি, যাতে সাধারণ পিরিয়ডের ব্যথা এবং এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথার পার্থক্য বুঝতে পারেন। চিকিৎসককে রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে কাউন্সেলিং করতে হবে।
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি রোগ যা সঠিক সময়ে নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে না পারলে চিকিৎসার জন্য এমনকি ১০ বছরও সময় লেগে যেতে পারে। তাই রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করে চিকিৎসায় নিয়ে আসা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব রোগীর সেবা নিশ্চিত করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল বা চেকলিস্ট তৈরি করতে হবে, যাতে দেশের সব পর্যায়ে একই মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। বড় হাসপাতালগুলোতে রোগী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি সুসংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কাঠামোকে কাজে লাগানো। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তাঁরা রোগীকে প্রাথমিক পরামর্শ ও সেবা দিতে পারেন। রোগীর ইতিহাস নেওয়া, জীবনযাত্রার পরামর্শ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হবে। উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে গাইনি কনসালট্যান্টরা থাকেন, যাঁরা রেফার করা রোগীদের দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেবেন।
এন্ডোমেট্রিওসিসকে একটি আজীবন স্থায়ী ও পুনরাবৃত্তিমূলক রোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা অনেকটা ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বারবার ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে কিশোরীদের মধ্যে এই রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। কারণ সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে এটি ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্ব বা ইনফার্টিলিটির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির জন্য ‘এন্ডোমেট্রিওসিস রেজিস্ট্রি’ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। এটি প্রাথমিকভাবে কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শুরু করে পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। এ ছাড়া একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে রোগীদের রোগ নির্ণয়, মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি। এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে বারবার সার্জারি করা ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এতে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে গাইনোকোলজিক্যাল এন্ডোস্কোপিক সার্জনের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত, বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে এই সংকট আরো তীব্র। সমস্যা সমাধানে সোসাইটি অব ল্যাপারোস্কোপিক সার্জনস এবং গাইনোকোলজিক্যাল এন্ডোস্কোপিক সোসাইটি বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপ পরিচালনা করছে। বর্তমানে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসার জন্য ঢাকা শহরে চলে আসেন। এই চাপ কমাতে জেলা হাসপাতালগুলোতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে কর্মরত ডাক্তারদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে ‘সাব-স্পেশালিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, এতে আরো দক্ষ ‘মাস্টার ট্রেনার’ তৈরি করা সম্ভব হবে এবং সরকারি সহায়তায় সারা দেশে এই চিকিৎসার প্রসার ঘটবে।
বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসায় আর্থিক সমস্যা একটি বড় বাধা, যার বিকল্প হিসেবে চিকিৎসকদের সঠিক কাউন্সেলিং এবং আধুনিক মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইভিএফ প্রোগ্রাম থাকা সত্ত্বেও রোগীর অভাবে তা পর্যাপ্তভাবে কার্যকর হচ্ছে না, তাই খরচ কমানোর চেষ্টা চলছে।
এন্ডোমেট্রিওসিসকে কেবল নারী প্রজনন অঙ্গের রোগ হিসেবে না দেখে এটাকে পদ্ধতিগত রোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গকেও (মূত্রনালি, মলাশয়, কোলন) প্রভাবিত করতে পারে। অনেক সময় ক্যান্সারের চেয়েও বেশি ভয়াবহভাবে অঙ্গগুলো আক্রান্ত হয়। এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসার ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপিক বা মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি এবং রোবটিক সার্জারিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে রোগীর শরীরে ক্ষত কম হয়, ব্যথা কম থাকে এবং জটিলতার ঝুঁকি হ্রাস পায়। এ জন্য একটা সম্মিলিত চিকিৎসক দল থাকা জরুরি। এই দলে গাইনোকোলজিস্টের পাশাপাশি ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন, জেনারেল সার্জন, কলোরেক্টাল সার্জন এবং ইউরোলজিস্টদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) একটি ‘এন্ডোমেট্রিওসিস ক্লিনিক’ প্রতিষ্ঠা এবং বহির্বিভাগ ও আন্ত বিভাগে বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীকেন্দ্রিক সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এন্ডোমেট্রিওসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক রোগ হওয়ায় এর জন্য একটি সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োজন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে একটি বিশেষায়িত এন্ডোমেট্রিওসিস ক্লিনিক স্থাপনের পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে রোগীরা একই ছাদের নিচে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন। রোগীরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সঠিক সেবা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা এই ক্লিনিকের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। বহুমুখী চিকিৎসা পদ্ধতিতে গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসায় শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে মানসিক সহায়তা, পেইন ম্যানেজমেন্ট এবং সাইকোলজিক্যাল সাপোর্টের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে কিশোরী রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের জন্য কাউন্সেলিং সেশন রাখা জরুরি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধার্থে ব্যয়বহুল পরীক্ষাগুলো সহজলভ্য করা এবং এন্ডোমেট্রিওসিস সোসাইটির মাধ্যমে চিকিৎসার একটি নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রোগ নির্ণয়ে দীর্ঘসূত্রতা। এ ছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক আলট্রাসাউন্ড মেশিনের অভাব এবং গাইনোকোলজিস্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। এমআরআই এবং ল্যাপারোস্কোপির মতো উন্নত সুবিধাও অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিকভাবে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম পদ্ধতিতে চিকিৎসার কথা বলা হলেও বাংলাদেশে মূলত সাধারণ গাইনোকোলজিস্টরাই এই চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। পেইন স্পেশালিস্ট, সার্জন, ইউরোলজিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্টদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পরিকল্পনা করার সুযোগ এখানে কম। নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আধুনিক হরমোনাল ওষুধগুলো (যেমন : ডাইনোজেস্ট, জিএনআরএইচ অ্যানালগ) বেশ ব্যয়বহুল এবং সব জায়গায় সহজলভ্য নয়। এর ফলে অনেক রোগী মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে হরমোনাল থেরাপিকে প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে না নিয়ে সরাসরি সার্জারি করার প্রবণতা দেখা যায়।
এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা দুইভাবে হতে পারে। আক্রান্তদের ক্লিনিক্যাল এবং সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে সমন্বিত চিকিৎসা প্রদান করা। এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পর্কে সমাজে জানানোর মাধ্যমে ‘সংকোচবোধ’ কমানো। তাহলে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ে সামাজিক সংকোচ থাকবে না। কারণ রোগ প্রকাশে এবং আলোচনা করতে যত সংকোচবোধ থাকবে চিকিৎসা থেকে তত বেশি দূরে সরে যাব। এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত ও চিকিৎসা পেতে প্রায় ৪-১১ বছর সময় চলে যায়। এর অন্যতম কারণ সামাজিক সংকোচবোধ। এ কারণে আক্রান্তরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করে। ফলে এন্ডোমেট্রিওসিসের তীব্র ব্যথার ফলে নারীরা তাঁদের একাডেমিক ও পেশাগত কাজে পিছিয়ে পড়েন। তীব্র হতাশা ও বিষণ্নতা তৈরি হয়। বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, যৌন অক্ষমতা এবং নিজের শারীরিক গঠন নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটির সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আক্রান্তের তথ্য এখনো অজানা। সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য এবং সেই অনুযায়ী কর্মসূচি বা প্রোগ্রাম ডিজাইন করার জন্য গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোতে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ইন্টারভেনশন নেই। তাই এটিকে জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে একীভূত করা এবং সরকারের সঙ্গে মিলে একটি জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল ও রেফারেল গাইডলাইন তৈরি করা প্রয়োজন। রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম গঠন করা জরুরি, যা বর্তমানে আমাদের দেশে এখনো কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। ইউএনএফপিএ বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ে গবেষণা, স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল তৈরি এবং সরকারি কর্মসূচিতে এটি অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও সার্বিক সহযোগিতা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
স্কুল হেলথ প্রোগ্রামটি বর্তমানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উইংয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ২০টি জেলায় ২৩টি স্কুল হেলথ ক্লিনিক রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষক, মাঠকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের (পিয়ার লিডার) প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগও এখানে রয়েছে। এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটি সাধারণত অবহেলিত হলেও কমিউনিটি পর্যায়ে এর প্রাথমিক ডায়াগনোসিস করা খুব কঠিন নয়। বিশেষ করে স্কুলগামী কিশোরীদের এই বিষয়ে শিক্ষিত করা বেশি কার্যকর, কারণ এই বয়সে শেখানো বিষয়গুলো তাদের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং চিকিৎসকদের এই রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি, যাতে তাঁরা রোগীদের সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে পারেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে সচেতন করা যাবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।
এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত করতে সাধারণত ছয় থেকে ১০ বছর দেরি হয়। একটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) চালিত স্ক্রিনিং টুলের মাধ্যমে রোগীদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ‘ঝুঁকিহীন’ এই দুই ভাগে ভাগ করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো সম্ভব, যা এই দীর্ঘ বিলম্ব কমাতে সাহায্য করবে। এই এআই টুলটি অত্যন্ত নির্ভুল। এর সংবেদনশীলতা ৯৩.০১ শতাংশ, স্পেসিফিসিটি বা নির্ভুলতা ৯৪.৬০ শতাংশ এবং সামগ্রিক একিউরেসি ৯৩.২৫ শতাংশ। এটি রোগীরা নিজে ব্যবহার করতে পারেন অথবা কমিউনিটি হেলথ কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্ক্রিনিং করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বড়দের তুলনায় কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই রোগ শনাক্ত হতে আরো পাঁচ-ছয় বছর বেশি দেরি হয়। স্কুল হেলথ প্রোগ্রামে এই টুলটি যুক্ত করলে কিশোরীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে অনেক দরিদ্র মানুষের পক্ষে ট্রান্সভজাইনাল সোনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসোনোগ্রাফির মতো দামি পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।
প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে একজন এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি এপিডেমিক বা মহামারির মতো উদ্বেগজনক বিষয়। উদ্বেগের বিষয় হলো—বাংলাদেশে দ্রুত রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা। এই তিনটি অভাব বিদ্যমান। তবে রোগটির চিকিৎসায় ২০০০ সাল থেকে বিভিন্ন ওষুধের ব্যবহার হচ্ছে। ‘ডানাজল’ দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে চতুর্থ প্রজন্মের গর্ভনিরোধক এবং ‘রেহানজিল’-এর মতো আধুনিক গোনাডোট্রপিন রিলিজিং এন্টাগনিস্ট বাজারে রয়েছে।
স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা হিসেবে দেখা দিতে পারে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার। মস্তিষ্কের কিছু বিশেষ জায়গা, যেমন—ব্যাসাল গ্যাংলিয়া যদি স্ট্রোক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে ক্ষেত্রে দেহে
অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া হতে পারে। স্ট্রোক ছাড়াও অন্যান্য রোগ থেকেও হতে পারে মস্তিষ্কের ক্ষতি। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার বেড়ে গেলে হঠাৎ করে শুরু হয় অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া। এটি চট করে সব বিশেষজ্ঞ ধরতে পারেন না। ডায়াগনস্টিক ইমেজিং করে যদি দেখা যায়, ব্যাসাল গ্যাংলিয়াতে হাইপার ডেন্স লিশন তৈরি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে হয়তো রেডিওলজিস্ট কমেন্ট করে দেবেন যে এটা হেমারেজ। অথচ মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার বিশেষজ্ঞ সেটিকে হেমারেজ হিসেবে শনাক্ত না করে দ্রুত সুগার টেস্ট করাবেন, তখন ধরা পড়বে এটি হেমারেজ নয় বরং সুগার স্পাইকজনিত স্ট্রাইটোপ্যাথি, যা চিকিৎসাযোগ্য। আবার বেশির ভাগ মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার রোগীর আমরা পারকিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত হিসেবে চিন্তা করি, সেটিও ভুল হতে পারে। হতে পারে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ সেবন করছেন, সেটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এটি। এ ধরনের ভুল ডায়াগনোসিস প্রতিরোধে প্রথমে প্রয়োজন দেশের প্রত্যেক চিকিৎসককে এ বিষয়ে সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, আমরা টেলিমেডিসিন কাজে লাগাতে পারি। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রোগীর নড়াচড়া দেখেও কিছু কিছু মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করা যায়।
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় আমাদের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ রোগীদের কাছে পৌঁছানো। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে রোগীদের উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য তাদের হাসপাতালমুখী করা বাংলাদেশে বেশ কঠিন। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ, যত ধরনের মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার আছে এর প্রতিটিই ডায়াগনোসিস করাতে লাগে—সিটি স্ক্যান অথবা এমআরআই। তাই এসব পরীক্ষা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ, ওষুধ সরবরাহ ও সঠিক মাত্রায় গ্রহণ নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ওষুধ গ্রহণ করতে হয় বেশিরভাগ রোগীর, আজীবনও ওষুধ চালাতে হতে পারে। রোগীদের মধ্যে সারা জীবন ওষুধ সেবনের রুটিন ধরে রাখা এবং সুলভ মূল্যে ওষুধের প্রাপ্তি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চিকিৎসক, নার্স বা টেকনিশিয়ান তথা সামগ্রিক ম্যানপাওয়ার দক্ষ করে তোলা এবং দেশের প্রতিটি অংশে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। পঞ্চম চ্যালেঞ্জ, দেশে অত্যাধুনিক নিউরোসার্জিক্যাল চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করা। সরকারের প্রতি বলতে চাই, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ এবং ডিভাইসের পাশাপাশি শনাক্তকরণের উপকরণ ট্যাক্স ফ্রি করে দিলে সবার নাগালের মধ্যে পৌঁছে যাবে এ রোগের চিকিৎসা। নিনস-এ একটি অত্যাধুনিক ল্যাব তৈরি হচ্ছে। এটির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এরই মধ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। এই ল্যাবটি হবে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের বেশির ভাগই বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ‘এসেনশিয়াল ট্রেমরস’। রোগীরা প্রায়ই বলে থাকে, ‘আমার দাদা/বাবা/ভাই-এর হাত-পা/মাথা কাঁপত।’ দেশে অনেক উইলসন্স ডিজিজ রোগীও আছে, সেটিও বংশগত রোগ। এ ছাড়াও রয়েছে হান্টিংস কোরিয়া, হেরিডিটারি ডিস্টোনিয়া, ফ্যামিলিয়াল পারকিনসন্স ডিজিজ। এসব রোগের কারণ জিনগত ত্রুটি, তাই পুরোপুরি নিরাময় অসম্ভব। ফলে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। জেনেটিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনকে বোঝাতে হবে, জেনেটিক টেস্টের প্রয়োজনীয়তা কী। পরবর্তী প্রজন্মে যাতে রোগগুলো সঞ্চারিত না হয় সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া বা প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করার প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি। উইলসন ডিজিজের চিকিৎসা আগেভাগে শুরু করলে স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে রোগী। এটি দুঃখজনক যে আমরা এখনো জেনেটিক ল্যাব সব জায়গায় তৈরি করতে পারিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছে নিনস। একই মানের চিকিৎসাসেবা অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা-উপজেলার হাসপাতালে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিনসে প্রতি সপ্তাহে বসছে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার ক্লিনিক। চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষনার জন্য রোগীদের তথ্যও সংগ্রহ করার কাজও চলছে।
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সদস্যসচিব হিসেবে আমার বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সংক্রান্ত শিক্ষাদান কার্যক্রম এবং গবেষণা চালিয়ে যাওয়া। নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে চিকিৎসকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে পারি আমরা। দ্বিতীয়ত, প্রাইমারি ফিজিশিয়ানদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব, পাশাপাশি গবেষণার অর্থায়নের জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করব। তিন নম্বরে আছে রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারকে অভিশাপ মনে করে অনেকে, ধরে নেয় এর কোনো চিকিৎসা নেই। এসব বিভ্রান্তি দূর করা আমাদের দায়িত্ব। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে চিকিৎসকদের মাস্টার ক্লাস ও ফেলোশিপের আয়োজন করা। সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের ওষুধ এবং চিকিৎসার সরঞ্জামের অপ্রতুলতা দূর করে সেগুলো সুলভ মূল্যে রোগীদের কাছে পৌঁছানো। জেনেটিক টেস্টিং ফ্যাসিলিটি বা অ্যাডভান্সড ইলেক্ট্রোফিজিওলজি সুবিধা নিনস-এর বাইরে নেই বলা যায়। আশার কথা, নিনস-এ প্রতি মঙ্গলবার বসে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার ক্লিনিক। এখানে প্রতি সপ্তাহে ৬০-৭০ জনকে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। বোটক্স ইনজেকশনও পাচ্ছে ১০-১৫ জন। শিগগিরই হয়তো আমরা ফেলোশিপ প্রোগ্রামেও পাঠাব চিকিৎসকদের।
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার বুঝতে হলে দেহের অঙ্গগুলো কিভাবে নড়ে সেটি জানতে হবে। দুটো প্রক্রিয়া পাশাপাশি কাজ করে—একটি নিউরোনাল সার্কিট, যা মস্তিষ্ক থেকে পেশি পর্যন্ত সংকেত পৌঁছায়, অন্যটি নিউরোকেমিক্যাল মিডিয়েটরস। একটি সিস্টেমেও গণ্ডগোল হলে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার তৈরি হয়। পারকিনসনিজম বা পারকিনসন্স ডিজিজের পাশাপাশি আরো কিছু মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার আমরা হরহামেশা দেখতে পাই, যেমন—ট্রেমর। এসেনশিয়াল ট্রেমর বা কাঁপুনির পেছনে কিছু জেনেটিক বা বংশগত কারণ থাকে। এ ছাড়াও আছে ডিস্টোনিয়া, অর্থাৎ রোগী দেহের ভারসাম্য বা স্থিরতা ধরে রাখতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে স্নায়ুতন্ত্রে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নড়াচড়ার সংকেত তৈরি হওয়া। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ জন এ সমস্যায় ভুগছে। টিক নামেও একটি সমস্যা রয়েছে, যা ছোটদের বেশি হয়। অবচেতনেই অনেকে ঘাড় ঘুরানো বা চোখ পিটপিট করে মজা পায়, একসময় এটি অনিয়ন্ত্রিত টিক-এ পরিণত হয়। কিছু সাইকিয়াট্রিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হতে পারে ড্রাগ ইনডিউসড মুভমেন্ট। রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম, অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়ার সমস্যাও রয়েছে অনেকের।
পারকিনসন্স ডিজিজের মূল লক্ষণের বাইরেও বেশ কয়েকটি উপসর্গ আছে। যেমন—হাঁটাচলায় অসুবিধা, ছোট ছোট কদমে হাঁটা বা ফেস্টিনেশন, হাঁটতে গেলে পা জড়িয়ে যাওয়া, ‘এক্সপ্রেশনলেস ফেস’, অর্থাৎ রোগীর মুখে কোনো অভিব্যক্তি থাকে না, আবার অনেকের মুখ দিয়ে লালা ঝরে। এর মধ্যে আছে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, অর্থাৎ হাইপোটেনশন। কোষ্ঠকাঠিন্য ও সেক্সুয়াল ডিসফাংশনও দেখা দিতে পারে। আমরা দেখেছি কোনো রোগীর হয়তো রাতে প্রচুর পরিমাণ প্রস্রাব হচ্ছে বা রোগী অতিরিক্ত ঘেমে যাচ্ছে। আবার অনেকের ঘাম কমেও যায়। রোগীর অনিদ্রা দেখা দেয়, ক্রাম্পিং পেইন বা পেশিতে টান ধরার ব্যথা হয়। নিউরোসাইকিয়াট্রিক সিম্পটমও হতে পারে, যেমন—রোগী ডিপ্রেসড ও হতাশ হয়ে যায়, কাজকর্মে অনীহা বা অ্যাপাথিও থাকতে পারে। শুরুতে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়। অনেক পারকিনসন্স রোগীর হঠাৎ করে পুরোপুরি নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা নতুন ওষুধ অ্যাপোমরফিন ইনজেকশন দিচ্ছি। তবে মনে রাখা জরুরি, শুধু ওষুধের ওপর ভরসা করলে হবে না। ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি এবং প্রয়োজনে সার্জারিও করতে হতে পারে। ডিবিএস বা ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন সার্জারি প্রয়োজন হলে নিনস-এ করা সম্ভব।
দেশের বেশির ভাগ রোগীর পারকিনসন্স ডিজিজ প্রথম শনাক্ত হয় হাত-পায়ের কাঁপুনি বা ট্রেমর দেখে। ট্রেমর ছাড়াও দ্বিতীয় উপসর্গ হিসেবে চলাফেরার ধীরগতি বা ব্রাডিকাইনেসিয়াও হয়ে থাকে। এটি দেখা দিলে হাঁটার ছন্দের সঙ্গে রোগীর হাত স্বাভাবিক গতিতে দোলে না, হাঁটার গতিও থাকে কম। তৃতীয় উপসর্গ বলা যায় রিজিডিটি বা জড়তা, চলাফেরার সময় রোগী স্বাভাবিকভাবে হাত-পা নাড়াতে পারে না। চতুর্থ যে উপসর্গ দেখা যায়, সেটি হচ্ছে ভারসাম্যহীনতা। রোগী দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পড়ে যায়, হাঁটার সময় তাল হারিয়ে ফেলে। এ চার ধরনের লক্ষণ দেখেই আমরা বুঝে নিই, পারকিনসন্স দেখা দিয়েছে। পারকিনসন্স বা অন্যান্য মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের উপসর্গ বা কারণ সম্পর্কে এখনো খুব কম মানুষই জানে। আর যখন কোনো বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকে, তখনই এটা নিয়ে বিভ্রান্তি শুরু হয়, ছড়াতে শুরু করে নানাবিধ কুসংস্কার। কাঁপুনির কথাই ধরি, অনেকের ভ্রান্ত ধারণা আছে যে এটি স্ট্রোকের লক্ষণ। কালো জাদু, জ্বিনের আছরের মতো কুসংস্কারও দেখা যায়। এ ধরনের রোগ কখনো ভালো হয় না, চিকিৎসা ঠিকমতো হয় না এবং এই রোগ শুধু বয়স্কদের হয়—এমন ভ্রান্ত ধারণাও বেশ প্রচলিত।
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় প্রথম ২০১৭ সালে দেশে দুটি নিউরোসার্জারি করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে আমরা তিন দিনে পর পর পাঁচটা সার্জারি করেছিলাম। এ বছর (২০২৫) করেছি দুটো অপারেশন। সব মিলিয়ে দেশেই আমরা ৯ জন রোগীকে সফলভাবে সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা দিয়েছি। এর মধ্যে সাতটি সার্জারি হয়েছে পারকিনসন্স ডিজিজ রোগীর, আর দুটি অপারেশন হয়েছে ডিস্টোনিয়া রোগীর। ৯ জনের জন্যই করা হয়েছে ডিবিএস (ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন) সার্জারি, অর্থাৎ রোগীর বুকের চামড়ার নিচে একটা পেসমেকার বসিয়েছি এবং সেই পেসমেকার থেকে ইলেকট্রিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে মস্তিষ্কের গভীরে দুটি জায়গায়। ডলার বিনিময়ের হার বাড়ার পর ডিভাইসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এখন দাম ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা। সরকার শুধু ডিভাইসের মূল্যের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়, এর পরও সার্জারিতে রোগীদের মোট খরচ হয় ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা। অনেক রোগীর পক্ষেই সেটি বহন করা সম্ভব হয় না। রোগীদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে আমরা পেসমেকার না বসিয়ে লেইসন সার্জারি করতে পারি। লেজারের মাধমে মস্তিষ্কে এ সার্জারি করা হয়।
মোটা দাগে আমরা দুই ধরনে ভাগ করি মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারকে—নড়াচড়া কমে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া। এর মধ্যে আড়ষ্টতাজনিত সমস্যাগুলোর প্রাদুর্ভাবই বেশি দেখা যায়। আড়ষ্ট মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের মধ্যে পারকিনসন্স সবচেয়ে বেশি দেখি। অতিরিক্ত নড়াচড়ার মধ্যে বেশি দেখা যায় ট্রেমর বা কাঁপুনি। দেহের এক পাশ বেঁকে যেতে পারে, ফলে ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা হয়—এটিকে আমরা বলি ডিস্টোনিয়া। এ ছাড়াও দেখা যায় হাত-পায়ে আচমকা ঝাঁকুনি দেওয়ার রোগ হেমিব্যালিসমাস, নাচের মতো করে ছন্দে ছন্দে অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার রোগ কোরিও-অ্যাথিটোসিস এবং টার্ডিভ ডিসকাইনেশিয়া। উইলসন ডিজিজের প্রাদুর্ভাবও আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে। সারা বিশ্বেই মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের বিষয়ে সচেতনতা এখনো কম, তাই ২০২২ সাল থেকে বিশ্ব মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস পালন শুরু করে আন্তর্জাতিক পারকিনসন্স এবং মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সোসাইটি। দেশে ২০২৩ সাল থেকে আমরা (নিনস) দিবসটি পালন করছি—সচেতনতা শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন সায়েন্টিফিক ও অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে।
সার্জারির মাধ্যমেও এখন মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসা করা যায়। যে রোগীদের মধ্যে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স দেখা যায়, অর্থাৎ ওষুধ গ্রহণের পরও তাদের উপসর্গের উন্নতি নেই, অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট জটিলতা রোগীর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না, এ ধরনের রোগীদের আমরা সার্জারির জন্য বেছে নিই। পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় সার্জারি অত্যন্ত কার্যকর। এমআরআই, সিটি স্ক্যান ইমেজ এবং স্টেরিওট্যাকটিক ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে আমরা রোগীর মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু জায়গা বেছে নিই। মস্তিষ্কের গভীরের সেসব স্থানে সার্জারির মাধ্যমে আমরা ইলেকট্রোড স্থাপন করি। এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় ব্যাটারিচালিত একটি পালস জেনারেটর ডিভাইস। রোগীর বুকের চামড়ার নিচে এটি স্থাপন করা হয়। এটি দেহের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর মাধ্যমে আমরা নিয়ন্ত্রণ করি রোগীর মস্তিষ্কের অ্যাবনরমাল ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি। ডিভাইসটি ব্যবহারে চলাফেরার ধীরগতি ঠিক হয়ে যায় এবং ট্রেমরও কম হয়। এখন নিনস—এই নিউরোসার্জারি ডিপার্টমেন্টের একটি সাবডিভিশন রয়েছে যার নাম ফাংশনাল নিউরোসার্জারি ইউনিট। আমরা এ ধরনের সার্জারি সফলতার সঙ্গে করে যাচ্ছি।
এসিআই-এর প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের মান উন্নত করা। আমরা সব সময় নিনসের পাশে আছি। ২০২৩ সাল থেকে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস ঘিরে নানাবিধ আয়োজন করছি, সামনেও করব। এ বছর ১৩টি জেলায় আমরা প্রোগ্রাম করেছি। এর মধ্যে আছে চিটাগং মেডিক্যাল কলেজ, বিএমইউ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ তথা মিডফোর্ড হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ, সিলেট মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, নিনস, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ, সিলেটে নর্থ ইস্ট মেডিক্যাল কলেজ ও জালালাবাদ রাগিব-রাবেয়া মেডিক্যাল অ্যান্ড হাসপাতাল। একজন প্যালেটিভ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে বলতে চাই, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের সঠিক চিকিৎসা জীবনের মান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করে এমন উপসর্গগুলো অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে রোগী ও চিকিৎসকদের পাশে আমরা থাকতে চাই সব সময়। দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যার জরিপ ও গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা নিনসের সঙ্গে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের প্রয়াস সফল করতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এগিয়ে আসবেন—এটিও আমরা আশা করছি।
এসিআই-এর পক্ষ থেকে আমরা সব সময় চেষ্টা করে থাকি ওষুধের মূল্য যেন নাগালের মধ্যে থাকে। তবে মানের সঙ্গে কখনোই আপস করা হয় না। মান না কমিয়ে যতটা সম্ভব মূল্য কমিয়ে ওষুধ বিক্রি করি আমরা। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি নীতিমালা অনেক বড় বাধা। আপনারা জানেন যে ওষুধ শিল্পে আমাদের পাইকারি বা উৎপাদক মূল্যের ওপর প্রায় ১৬.৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে সরকার ভ্যাট মওকুফ করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধে এমন উচ্চহারের করের বোঝা বহন করা অনেক রোগীর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর। সরকার যদি এই উচ্চহারের ভ্যাট কমানোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আমরা আরো সুলভ মূল্যে ওষুধগুলো সরবরাহ করতে পারব। এর ফলে অসচ্ছল রোগীদের মধ্যে কিছু সময় পর চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে, স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন তাঁরা। মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের জন্য আমরা বিশ্বমানের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ তৈরি করে থাকি, যেমন—লেভেডোপা-কার্বিডোপা। এই ওষুধগুলো যেন প্রতিটি রোগী সুলভে কিনতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা সব সময়ই সচেষ্ট থাকি।
দেশে এখন ৪০০ জনের মতো সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন, কিন্তু সবাই নগরকেন্দ্রিক এবং ঢাকায়ই বেশি। প্রান্তিক পর্যায়ে তেমন কেউ নেই। যদিও এখন শুক্রবার ঢাকার বাইরে গিয়ে সার্ভিস দেওয়ার ট্র্যাডিশন হয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও সেবা পাওয়া যাচ্ছে। 
দেশে বর্তমানে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.২ জন সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নার্স আছেন মাত্র ০.৫ জন। অন্য যেসব সাইকোলজিস্ট আছেন যাঁরা এনজিও ও অন্যান্য জায়গায় কাজ করেন, তাঁরা মাত্র ০.৩ জন। সোশ্যাল ওয়ার্কার নেই বললেই চলে। মোট মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ১.৪ জন। এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ। দেশের জেলা সদর হাসপাতালে কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট নেই। আগামী ১০ বছরেও আমরা উপজেলায় সাইকিয়াট্রিস্ট দিতে পারব কি না সন্দেহ। আমাদের দেশে মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট, মেন্টাল হেলথ পলিসি এবং মেন্টাল হেলথ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান থাকলেও এখনো সুইসাইড প্রিভেনশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নেই। আমরা সেটা করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া অ্যান্টি-স্টিগমা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এখনো ন্যাশনাল পলিসিতে আনতে পারিনি। এই ব্যর্থতা স্বীকার করে আমাদের কাজ করতে হবে। প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অন্তত একজন করে সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। এই ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজকে যদি আমরা দুর্যোগকালীন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে যুক্ত করতে পারি, তাহলে তারা নিজেদের টিম নিয়ে দেশের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত সেবা দিতে পারবেন। এই প্রস্তাব আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে যাচ্ছি।
দুর্ঘটনা বা দুর্যোগ-পরবর্তী আহত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি মাইলস্টোনের ঘটনায় শিক্ষকদের সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম আমরা করেছি। সেখানে দু-একজন শিক্ষককে কান্না করে তাঁদের মানসিক সমস্যার কথা বলতে দেখা গেছে। এসব শিক্ষকের এখনো অনেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে সমস্যাটা যে এতটা গুরুতর, সেটা আমরা জানতাম না। তাঁদের চিকিৎসা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
একটি মেয়েশিশু ছোটবেলা থেকেই অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বড় হয়। তাকে সীমাবদ্ধতা শেখানো হয়, ধৈর্যধারণ করতে শেখানো হয়। আরো শেখানো হয়
বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানে সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডারসংক্রান্ত গবেষণায় হয়। এতে দেখা গেছে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি আহতদের এক-তৃতীয়াংশ গুরুতর মানসিক উদ্বেগ নিয়ে আসেন। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এই হার ছিল ২১.৮ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিপর্যয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পেরে আমরা গর্বিত। কারণ এ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। দুটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। একজন শিক্ষার্থী যিনি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অগ্নিকাণ্ডে অন্যদের উদ্ধার করতে গিয়ে শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরে ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন; আরেকটি ঘটনা সম্প্রতি মিরপুরে কেমিক্যাল বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকাজে অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে বাধা সৃষ্টি হয়, যেখানে আমরা ব্যানারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সেবার তথ্য প্রচারের উদ্যোগ নিই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বিপর্যয় বা জরুরি পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনা-পরবর্তী ২৫৫ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ ঘুমের সমস্যা, ২৯ শতাংশ খিটখিটে মেজাজ, ২৬ শতাংশ ফ্ল্যাশব্যাক, ২৬ শতাংশ ক্ষুধামান্দ্য, ২০ শতাংশ মনোযোগের ঘাটতি, ২০ শতাংশ কাজে অনাগ্রহ
মানসিক চিকিৎসা নিয়ে প্রচার কম। এতে সচেতনতাও বেশিদূর এগোয়নি। আমাদের প্রচার বাড়াতে হবে, মানুষ জানুক, যুক্ত হোক, একসঙ্গে কাজ করুক। আমরা আমাদের আশপাশের সবাইকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করব। যাঁরা সহযোগিতা করছেন তাঁদের শুধু ধন্যবাদ নয়, বরং আরো এনগেজ করতে হবে। যেমন
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ৯২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন না মূলত সামাজিক কলঙ্ক বা স্টিগমার কারণে। অনেকে ভাবেন, একবার মানসিক চিকিৎসা শুরু করলে সারা জীবন এর চিকিৎসা নিতে হবে। এতে বিয়েতে সমস্যা বা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে। ফলে চিকিৎসা না নিয়ে বিষয়টি চেপে রাখেন।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় কোন ধরনের মানসিক সমর্থন প্রয়োজন আমার জানা ছিল না। বিশেষজ্ঞরা যখন কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম শুরু করলেন, তখন আমরা জানতে পারি। বিশেষ করে প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি সহায়ক থেরাপি দেওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। মনে হয়েছে, শিক্ষার্থী যেন ভুলে গেছে ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা। ওরা আগের মতো দৌড়াচ্ছে, খেলছে, ক্লাস করছে।
দেশের অনেক মানুষ জানে না কোনটা মানসিক রোগ। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে। ইনসেপ্টা এসব উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং প্রচার ও সচেতনতা কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত প্রায় ৯৯ শতাংশ ওষুধ এখন বাংলাদেশেই তৈরি হয় এবং ইনসেপ্টা দেশে আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করছে, যেমন লেজার ড্রিল টেকনোলজিতে তৈরি
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ঠিক করা হয় প্রতিপাদ্যকে ঘিরে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল