একচেটিয়া বাজারব্যবস্থাই অবৈধ পণ্য বিস্তার করছে
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
সরকার একটি সামাজিক সুরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে কাজ করছে, যার মাধ্যমে ভোক্তাকে একটি কল্যাণমূলক পরিসরে আনা হবে। এতে নাগরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বা ‘চয়েস’ করার ক্ষমতা তৈরি হবে, যা অবৈধ পণ্যের বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে বাজারে মোনোপলি বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে সাধারণ মানুষ বাজার নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত বাজার কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততক্ষণ তা প্রকৃত অর্থে মুক্ত বাজার নয়। কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো মানুষকে এমন অবস্থানে নেওয়া, যেখানে তারা বিকল্প বেছে নিতে সক্ষম হবে এবং নাগরিক হিসেবে বৈধ-অবৈধকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে।

ভেজাল রোধে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই
মো. ফিরোজ উদ্দীন
ভেজাল ও অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সব সংশ্লিষ্ট পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে এবং শক্তিশালী নীতি, কার্যকর প্রয়োগ ও সচেতনতার মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যেমন—বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং ক্যাব— এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে জনবল ঘাটতি রয়েছে, যা দ্রুত পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত প্রণোদনা প্রদান এবং এসব সংস্থাকে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলা। শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সব সংস্থার সমন্বয়ে শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি
শেখ শাবাব আহমেদ
সিগারেট, ফার্মাসিউটিক্যাল ও কনজিউমার—প্রায় সব খাতেই তাদের ব্যাবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবৈধ ও নকল পণ্যের একই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের ব্যাবসায়িক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে মোট বাজারের প্রায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অবৈধ বাজার গড়ে ওঠে। সে হিসেবে বাংলাদেশে এই অবৈধ বাজারের আকার আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আদায় সম্ভব হলেও তা পুরোপুরি অর্জন করা যাচ্ছে না। অবৈধ পণ্য দমনে প্রধান সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ। তাই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি, যাতে ব্যবসায়ীরা একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই সমস্যার সমাধান পেতে পারেন।
বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াই বড় সমস্যা
মো. জাহাঙ্গীর হোসেন
মানুষের ভোগ ও চাহিদা এত বেড়ে গেছে যে তারা যা পাচ্ছে, যেভাবেই পাচ্ছে, তা গ্রহণ করছে। মানুষের এই অতৃপ্ত ভোগপ্রবণতাই বাজারে নানা অনিয়মকে উসকে দিচ্ছে। সমস্যাটির পরিসর ভোক্তার আচরণ থেকে শুরু করে করপোরেট সংস্কৃতি এবং সরকারি প্রশাসন পর্যন্ত বিস্তৃত। একদিকে ভোক্তাদের অযাচিত চাহিদা, অন্যদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে বাজারে ভেজাল ও নকল পণ্যের বিস্তার ঘটছে। দেশে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াই বড় সমস্যা। ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’সহ বিভিন্ন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
নকল পণ্যের বিস্তারের অন্যতম কারণ হলো পণ্যের উচ্চমূল্য
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব
নকল ও ভেজাল পণ্যের সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের শুধু উপরিভাগে নয়; বরং সমস্যার গভীরে গিয়ে কারণগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বাজারে নকল পণ্যের বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো পণ্যের উচ্চমূল্য। যখন ব্র্যান্ডের পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন ভোক্তারা বাধ্য হয়ে সস্তা বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই সুযোগটি কাজে লাগায় অসাধু ব্যবসায়ী চক্র, যারা অবিকল নকল প্যাকেট তৈরি করে বাজারজাত করে। গ্রামাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার ছোট দোকানগুলোতে কম্পানিগুলো সরাসরি পণ্য সরবরাহ করতে না পারায়, সেখানে পাইকারি বাজারের মাধ্যমে নকল পণ্য প্রবেশ করে। অনেক ক্ষেত্রে দোকানদাররা না বুঝেই এসব পণ্য বিক্রি করেন। কারণ এতে তাঁদের লাভের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে।
ভেজাল পণ্যের কারণে সমাজের প্রতিটি স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
মো. আশরাফুল ইসলাম (বিপিএম)
ভেজাল পণ্যের সমস্যাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী প্রায় সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি স্তরে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। একজন ব্যক্তি যখন ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রি করেন, তখন হয়তো তিনি মনে করেন এতে তার ব্যক্তিগত লাভ হচ্ছে। কিন্তু একই ব্যক্তি যখন তার পরিবারের জন্য ওষুধ কিনতে যান, তখন তিনিও ভেজাল ওষুধের শিকার হন। এর ফলে অসুস্থতা বাড়ে, ভুল চিকিৎসা হয় এবং শেষ পর্যন্ত উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য হন। এতে অনেক সময় মানুষ তার সম্পদ বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যায়। অর্থাৎ ভেজাল পণ্যের এই চক্র সমাজের প্রতিটি স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই সমস্যা একটি সংক্রামক ব্যাধির মতো সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভেজাল ও নকলের দাপটে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন
মো. সাইফুল ইসলাম
দেশে ভেজাল ও অবৈধ পণ্যের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজস্ব পরিচয়ে অবৈধভাবে পণ্য উৎপাদন করত, বর্তমানে বড় ও নামি কম্পানির পণ্যের অবিকল নকল তৈরি করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এসব নকল পণ্য অনেক সময় এত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয় যে সহজে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নকল পণ্যের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
বিএসটিআইয়ের সার্ভিল্যান্স, অভিযান ও মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং করা সব সময় সম্ভব হয় না। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও আরো জনবল প্রয়োজন।
তথ্যের অভাবে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না
মো. মাসুম আরেফিন
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মূলত ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করলেও অনেক সময় ব্যবসায়ীরাও ভোক্তা হিসেবে আমাদের কাছে অভিযোগ করেন। বিশেষ করে নকল পণ্য, ব্র্যান্ড জালিয়াতি এবং চোরাচালানের মাধ্যমে বাজারজাতকরণের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নকল ও ভেজাল পণ্য শনাক্তকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠ পর্যায়ে তাত্ক্ষণিকভাবে এসব নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য ল্যাব পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কিন্তু অধিদপ্তরের নিজস্ব কোনো ল্যাব না থাকায় বিএসটিআইসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তাই ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান থাকবে নকল পণ্য প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেন, আমরা আরো কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারব।
অবৈধ পণ্য রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন
কামরুজ্জামান কামাল
বাংলাদেশে বর্তমানে তিন ধরনের অবৈধ কার্যক্রম চলছে, আইনবহির্ভূত উৎপাদন, আমদানি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার বা ম্যানিপুলেশন এবং গ্রে চ্যানেলের মাধ্যমে পণ্য প্রবেশ ও বিপণন। অনেক ক্ষেত্রে পেটেন্ট ও ডিজাইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে নকল বা লোকালাইক পণ্য তৈরি হচ্ছে, যা জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নাম বা নকশার অনুকরণে বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব পণ্য সাধারণত নিম্নমানের হওয়ায় ভোক্তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিও হচ্ছে। অনেক পণ্য রয়েছে, যেগুলো বাধ্যতামূলক হলেও বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের ওপর কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। সব মিলিয়ে অবৈধ পণ্য উৎপাদন, আমদানি ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বহুল ব্যবহৃত ওষুধ দ্রুত নকল হচ্ছে, শনাক্ত করাও প্রায় অসম্ভব
জাহিদ রহমান
নাগরিক আলোচনায় প্রায়ই প্রান্তিক জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়, অথচ নকল পণ্যের সবচেয়ে বড় শিকার তারাই। কয়েক বছর আগে একটি দুর্গম চর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া পরিচিত ব্র্যান্ডের চিপসও নকল, প্যাকেট দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই, কিন্তু স্বাদ ভিন্ন। স্থানীয়রা এটিকেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছে, যা প্রমাণ করে নকল পণ্যের বিস্তার শুধু শহরে নয়, গ্রামাঞ্চলেও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ওষুধের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বাজারে প্রচলিত ও বহুল ব্যবহৃত ওষুধগুলো খুব দ্রুত নকল হয়ে যাচ্ছে। নকল ওষুধ এমনভাবে তৈরি হচ্ছে যে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ইনসুলিনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইনজেকশনেও নকলের ঘটনা ঘটছে এবং এসব নকল পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে কেরানীগঞ্জ ও মিটফোর্ডকেন্দ্রিক একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে।
আমদানিতে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ে বাড়ছে রাজস্ব ফাঁকি
আনোয়ারুল আমিন
আমদানি পর্যায়ে পণ্যের ডকুমেন্টেশন ঘাটতি, আন্ডার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ট্রেডিং কম্পানির মাধ্যমে আমদানীকৃত পণ্যে এই অনিয়ম বেশি দেখা যায়। তাই প্রথমেই আমদানি পর্যায়ে কঠোর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস ছাড়াও একাধিক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা থাকলেও তা তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত বিলম্বিত হয়। এতে যেমন ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি বাড়ে, তেমনি রাজস্ব ফাঁকি ও নন-কমপ্লায়েন্সের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
নকলের বিস্তার রোধে তরুণদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি
আহসান হাবিব
ঢাকা শহরের পেরি-আরবান এলাকাগুলো, যেমন—দিয়াবাড়ি, পূর্বাচল বা নারায়ণগঞ্জ-এলাকার দোকানগুলোতে গেলে দেখা যায়, অধিকাংশ খাদ্যপণ্যই স্বীকৃত বা মানসম্মত ব্র্যান্ডের নয়; বরং অনেক পণ্য স্থানীয়ভাবে প্যাকেটজাত, যেগুলোর কোনো মাননিয়ন্ত্রণ বা ল্যাব টেস্টিং নেই। এসব পণ্য বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সমাধান হিসেবে কেবল সরকারি নজরদারির ওপর নির্ভর না করে বটম-আপ পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে ভেজাল ও নিরাপদ পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়। পাশাপাশি তরুণদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে তরুণদের শক্তিশালী ভূমিকা দেখা গেছে।
নকল ওষুধ বিস্তারের অন্যতম কারণ হলো দাম
সাইফুল ইসলাম
ঔষধ শিল্প সমিতির সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করি এবং তাদের সুনাম ও মানদণ্ড যাচাই করেই সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানিয়ে আসছি—বাংলাদেশে বিশেষ করে গ্রাম ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ভেজাল ও নকল ওষুধের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। দেশে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ভেজাল ওষুধ বাজারে রয়েছে। নকল ওষুধ বিস্তারের অন্যতম কারণ হলো দাম। স্বীকৃত কম্পানির ওষুধের তুলনায় নকল ওষুধ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে পাওয়া যায়। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে সেগুলো কিনে থাকে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ফার্মেসির কোনো শক্তিশালী ডেটা বেইস বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।
সংকট মোকাবেলায় সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে
হাসান হাফিজ
অবৈধ পণ্যের সংকট মোকাবেলায় সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমান সরকার একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ এককভাবে সরকারের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য বেসরকারি খাতসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিকনির্দেশনা ও সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব মতামত সরকার বিবেচনায় নিলে একটি কার্যকর পথরেখা তৈরি হবে।
সব খাতেই ভেজাল ও নকলের বিস্তার রয়েছে
হায়দার আলী
খাদ্য, ওষুধ, কসমেটিকসসহ প্রায় সব খাতে ভেজালের সমস্যা ব্যাপক। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কার্যকর পরিবর্তন আনতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় কালের কণ্ঠে এমন প্রতিবেদন করতে চায়, যা সারা দেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংশ্লিষ্ট খাতের পেশাজীবী ও গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। সেই লক্ষ্যেই ‘অবৈধ পণ্যের দৌরাত্ম্য : ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস, করণীয় কী?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
ওষুধ, খাদ্যপণ্য, কসমেটিকস কিংবা সিগারেট, যেখানেই অবৈধ ও ভেজাল পণ্যের উপস্থিতি রয়েছে, সেসব বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে চাই আমরা।
রাজস্ব ফাঁকি ও নকল পণ্যে আটকে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির গতি
ফারুক মেহেদী
সামগ্রিকভাবে নকল পণ্যের কারণে প্রায় তিন হাজার ১৭০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব নকল পণ্য বৈধ পণ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এবং সঠিক হিসাবের আওতায় আসছে না। ওষুধ খাত একটি সম্ভাবনাময় ও জীবনরক্ষাকারী খাত হলেও সেখানে ভেজাল ও রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে আটকে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির গতি। খাদ্য, ওষুধ, কসমেটিকস ও সিগারেট—সব মিলিয়ে যদি চারটি প্রধান খাত বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অথচ এর বাইরে আরো অনেক খাতে অনিয়ম বিদ্যমান। চোরাচালানের মাধ্যমে আনা বা নকল পণ্য কম দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে, ফলে শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার কারণে এসব পণ্য প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
ভেজাল-অবৈধ পণ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
মাসুদ রুমী
যেকোনো পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সরাসরি জড়িত থাকলেও বাজারে ভেজাল ও অবৈধ পণ্যের অবাধ বিস্তার দেশীয় উদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। বিশেষ করে অননুমোদিত ‘গ্রে মার্কেটের’ অনিয়ন্ত্রিত প্রসারে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো হারিয়ে যাচ্ছে; যেমন ডিজিটাল ডিভাইস খাতে বৈধ বাজারের ৮ শতাংশ প্রদ্ধির বিপরীতে গ্রে মার্কেটের ২০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। দুর্বল তদারকি ও নামমাত্র জরিমানার কারণে অসাধু চক্র বারবার বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠছে। শুধু বাজার তদারকি নয়, বরং উৎপাদন ও আমদানি পর্যায় থেকে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘টাস্কফোর্স’ গঠন এবং ভেজাল, কপি পণ্যের বিক্রেতার লাইসেন্স বাতিলসহ অপরাধীদের কঠোর শাস্তির বিধান ও এর প্রয়োগ জরুরি।




দেশে কিডনি রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০ সালে দেশে কিডনি রোগের হার ছিল ১৫-১৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ শতাংশে। এর প্রধান কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। গত কয়েক বছরে এ দুই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কিডনি রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে চিকিৎসার জন্য ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে ডায়ালাইসিসের তুলনায় কিডনি প্রতিস্থাপন অনেক বেশি কার্যকর। সাধারণত নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা রোগীরা গড়ে পাঁচ-ছয় বছর বেঁচে থাকেন, কিন্তু সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগীরা ১৫ থেকে ৩০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। তাই কিডনি দান সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বৈশ্বিক উষ্ণতা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বিশুদ্ধ পানির সংকট সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত করছে। বিশেষ করে কিডনি রোগের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত গভীর, এখনই ব্যবস্থা না নিলে যা ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১.৫-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে এবং ২১০০ সালের মধ্যে তা ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি বাড়তে পারে। এতে তাপজনিত অসুস্থতা, পানিবাহিত রোগ, খাদ্যসংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে কিডনি রোগ বহুগুণে বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত গরমে যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন; যেমন—কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক ও রিকশাচালক, তাঁদের পানিশূন্যতা কমাতে পানি খেতে হবে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আশার কথা হলো, প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে শুধু সচেতনতার মাধ্যমেই এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথাগত ডায়ালাইসিসের বাইরে বর্তমানে ‘সিএপিডি’ নামে এক ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে কম খরচে ঘরে বসেই চিকিৎসা করা সম্ভব, যা থাইল্যান্ড বা হংকংয়ের মতো দেশে বেশ জনপ্রিয়। এই পদ্ধতির সরকারি প্রশিক্ষণ ও প্রসারের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পরিবেশদূষণ এবং তীব্র তাপমাত্রার সঙ্গে কিডনি রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মতো কিডনি রোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও সার, কীটনাশক, পানিশূন্যতা এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষুুদ্র অণুজীবের কারণে অনেক সময় এই রোগ হচ্ছে। যার সঠিক কারণ প্রায় ১৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অজানা থাকে। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে কীটনাশকের ব্যবহারের কারণে এই ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। অজানা কারণ জানতে এবং কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক সারের ব্যবহার, বন উজাড় রোধ এবং বেশি করে গাছ লাগানো অন্যতম। এ ছাড়া পেইন কিলার (ব্যথানাশক) ও অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধ করা, বিশুদ্ধ খাবার ও পানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে। এর মধ্যে কিডনি রোগ একটি। কিডনির কোষ একবার নষ্ট হলে তা আর নতুন করে তৈরি হয় না। সাধারণত ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কার্যক্ষমতা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কিডনি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অনেক সময় কোনো উপসর্গ না থাকায় রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন, যা বিপদ আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই রোগটি শনাক্ত করার প্রধান উপায় হলো নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কিডনি রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ অস্বাস্থ্যকর খাবার, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান ও জলবায়ু পরিবর্তন। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করাই কিডনি সুরক্ষার প্রধান উপায়।
দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যগত ভোগান্তিও বেড়েছে। বিশেষ করে খাদ্যদূষণ, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা সামনে আসছে। সৎ রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বেই কেবল স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশে কিডনি রোগের মতো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব প্রকট। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছাতে হবে। মেগাপ্রকল্পের চেয়ে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য যদি ঠিক রাখতে না পারি তাহলে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ কী করে গড়ে তুলব। তাই দেশের প্রতিটি স্কুলে এবং পাড়ায় পাড়ায় বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা হেলথ ক্যাম্প চালু করা উচিত।
সম্প্রতি তীব্র জ্বর হয়ে পানিশূন্যতার কারণে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। কিছুদিন আগে আমি ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মদিনায় ছিলাম। ওই সময় আমার রক্তচাপ কমে যায়, ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যায়। অথচ আমার বাবা একজন ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও শুরুতে আমার কিডনি বিকলের সংকেত টের পাইনি। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যেখানে একজন সচেতন মানুষও বিষয়টি বুঝতে দেরি করেন, সেখানে সাধারণ মানুষ কিভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবে? বাংলাদেশে কিডনি রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। অনেক রোগীই বুঝতে পারেন না, তাঁরা কিভাবে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। সচেতনতা তৈরির বিষয়টি অনেক সময় একঘেয়ে মনে হয়। তাই সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান, তাঁরা যেন বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে উপভোগ্য করে উপস্থাপন করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেই ক্রিকেটারদের খেলতে হয়। এই প্রচণ্ড গরমে ক্রিকেট খেলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমার খেলোয়াড়ি জীবনে প্রচুর ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের কারণে শরীরের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ১২ বছর ধরে আমি কিডনি রোগে ভুগছি। শুধু খেলোয়াড় নয়, তীব্র গরমে গ্রামীণ এলাকার মানুষও খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। তাঁরা অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। ফলে তাঁদের মধ্যে কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগটি প্রতিরোধে প্রতিটি স্কুলে শিশুদের শুধু ওজন নয়, শরীরের মেদ ও কোমরের মাপও পরীক্ষা করা উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কিডনি রোগী দিন দিন বাড়ছে। আর একবার কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পাশাপাশি এই রোগের চিকিৎসাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ক্যাম্পস’ টাঙ্গাইলের সখীপুরে কৃষক ও শ্রমিকদের কিডনি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করেছে। ওই এলাকার মানুষ এতটাই সচেতন যে, বাংলাদেশের অন্য কোথাও এমন সচেতনতা খুব একটা দেখা যায় না। তাই কিডনি রোগ প্রতিরোধে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং স্কুল পর্যায়ে শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করতে হবে।
ঢাকার উচ্চ বায়ুদূষণ গর্ভবতী মা ও শিশুস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মা যখন দূষিত বাতাস গ্রহণ করেন তখন সিসা, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত পদার্থ রক্ত ও বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে তার লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে। বড়দের তুলনায় শিশুদের অক্সিজেন ও পানির চাহিদা অনেক বেশি। ফলে শিশুরা দ্রুত ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়, যা থেকে পরে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমানে শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে ট্রান্সফ্যাট, অতিরিক্ত লবণ ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল রয়েছে, যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
দেশে মোট ভূমির অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকা মহানগরের উত্তরে বনভূমির হার প্রায় ১০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ১০.৫ শতাংশ। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে পাঁচ থেকে সাত ফুট পলিথিনের স্তর জমে আছে। এই পরিবেশ বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ঢাকা শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের সঠিক পরিকল্পনা নেই। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, দাবদাহ, খাদ্যে ভেজাল এবং কৃষিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে নানা রোগ বাড়ছে। এর মধ্যে কিডনি রোগের প্রকোপও দ্রুত বাড়ছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন জরুরি।
সারা পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এতে মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকেরই কিডনি কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কিডনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। এর কারণ হলো রক্ত থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। বন উজাড়, শিল্পদূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে পরিবেশ বিপর্যয় এখন আরো তীব্র হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব ভোগ করছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী রেখে যেতে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
কিডনি রোগকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ অনেক মানুষ নিজের অজান্তেই এই রোগে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ছয় হাজার পোশাক কারখানায় ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতন নন। কী কী লক্ষণ দেখা দিলে কিডনি রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়—সে বিষয়ে তাঁদের সাধারণ ধারণাও নেই। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিএমইএ শ্রমিকদের সচেতন করতে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন কারখানায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। এতে কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
১০ জনে একজন এ রোগে আক্রান্ত
যেখানে সচেতনতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিশেষায়িত চিকিৎসা পর্যন্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমরা মার্চ মাস এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করে আসছি। আমাদের এবারের থিম ‘আর উই রেডি ফর এন্ডোমেট্রিওসিস সার্ভিস’? অর্থাৎ আমরা কি এন্ডোমেট্রিওসিস এর চিকিৎসাসেবার জন্য প্রস্তুত? একই আলোকে আমাদের আজকের আলোচনা ও আমাদের এই গোলটেবিল। এন্ডোমেট্রিওসিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি অনেকটা অবহেলিত। এন্ডোমেট্রিওসিস শুধু একটি গাইনোকোলজিক্যাল রোগ নয়। এটি নারীর জীবনমান, তাঁর কর্মক্ষমতা, মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যর ওপর প্রভাব ফেলে। মাসিকের সময় ব্যথা ছাড়াও পায়খানা-প্রস্রাবের সময়, সহবাসের সময় ব্যথা হতে থাকে। বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। অনেকের মাসিক চলাকালে তলপেটে রক্ত জমা হয়ে চকলেট সিস্ট হতে পারে। তাই এই সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যাদের পরিবারে মা, খালা, ফুফুদের এই সমস্যা ছিল। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি।
গাইনোকোলজিক্যাল সার্জারির মধ্যে এন্ডোমেট্রিওসিস সার্জারি সবচেয়ে কঠিন। অনেক সময় ক্যান্সারের সার্জারির চেয়েও জটিল। ল্যাপারোস্কোপিক ও ল্যাপ্রোটমি—এই দুই পদ্ধতিতে এন্ডোমেট্রিওসিস সার্জারি করা হয়। ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতি আধুনিক হলেও দেশে ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়। সার্জারির সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের (অন্ত্র, মূত্রথলি) ক্ষত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে তরুণ রোগীদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা রক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। বয়স্ক রোগীরা দীর্ঘদিন এই রোগে আক্রান্তের কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের (ইউরেটার বা মূত্রনালি) অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা অস্ত্রোপচারকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। একজন সার্জনকে এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলায় দক্ষ হতে হবে এবং নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে বাংলাদেশে এখনো এন্ডোমেট্রিওসিসের জন্য ল্যাপ্রোটমি গুরুত্বপূর্ণ।
এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয় করতে গড়ে ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত দেরি হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ হলো পিরিয়ডের সময় ব্যথা হওয়াকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করা। অনেক কিশোরী সামাজিক লোকলজ্জা বা স্টিগমার ভয়ে ব্যথার কথা কাউকে জানাতে চায় না, যার ফলে তারা চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করে। এ ছাড়া অনেক সাধারণ চিকিৎসকের এই রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না। উপজেলা পর্যায় থেকে বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী পাঠানোর সঠিক রেফারেল সিস্টেমের অভাবও একটি বড় সমস্যা। রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে এন্ডোমেট্রিওসিসের জটিলতা বাড়তে থাকে (যেমন—স্টেজ ১ বা ২ থেকে স্টেজ ৪-এ পৌঁছানো) এবং ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের ক্ষমতা বা ফার্টিলিটির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মা-বাবা, অভিভাবক এবং স্কুল শিক্ষকদের সচেতনতা জরুরি, যাতে সাধারণ পিরিয়ডের ব্যথা এবং এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথার পার্থক্য বুঝতে পারেন। চিকিৎসককে রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে কাউন্সেলিং করতে হবে।
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি রোগ যা সঠিক সময়ে নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে না পারলে চিকিৎসার জন্য এমনকি ১০ বছরও সময় লেগে যেতে পারে। তাই রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করে চিকিৎসায় নিয়ে আসা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব রোগীর সেবা নিশ্চিত করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল বা চেকলিস্ট তৈরি করতে হবে, যাতে দেশের সব পর্যায়ে একই মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। বড় হাসপাতালগুলোতে রোগী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি সুসংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কাঠামোকে কাজে লাগানো। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তাঁরা রোগীকে প্রাথমিক পরামর্শ ও সেবা দিতে পারেন। রোগীর ইতিহাস নেওয়া, জীবনযাত্রার পরামর্শ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হবে। উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে গাইনি কনসালট্যান্টরা থাকেন, যাঁরা রেফার করা রোগীদের দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেবেন।
এন্ডোমেট্রিওসিসকে একটি আজীবন স্থায়ী ও পুনরাবৃত্তিমূলক রোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা অনেকটা ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বারবার ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে কিশোরীদের মধ্যে এই রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। কারণ সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে এটি ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্ব বা ইনফার্টিলিটির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির জন্য ‘এন্ডোমেট্রিওসিস রেজিস্ট্রি’ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। এটি প্রাথমিকভাবে কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শুরু করে পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। এ ছাড়া একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে রোগীদের রোগ নির্ণয়, মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি। এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে বারবার সার্জারি করা ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এতে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে গাইনোকোলজিক্যাল এন্ডোস্কোপিক সার্জনের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত, বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে এই সংকট আরো তীব্র। সমস্যা সমাধানে সোসাইটি অব ল্যাপারোস্কোপিক সার্জনস এবং গাইনোকোলজিক্যাল এন্ডোস্কোপিক সোসাইটি বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপ পরিচালনা করছে। বর্তমানে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসার জন্য ঢাকা শহরে চলে আসেন। এই চাপ কমাতে জেলা হাসপাতালগুলোতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে কর্মরত ডাক্তারদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে ‘সাব-স্পেশালিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, এতে আরো দক্ষ ‘মাস্টার ট্রেনার’ তৈরি করা সম্ভব হবে এবং সরকারি সহায়তায় সারা দেশে এই চিকিৎসার প্রসার ঘটবে।
বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসায় আর্থিক সমস্যা একটি বড় বাধা, যার বিকল্প হিসেবে চিকিৎসকদের সঠিক কাউন্সেলিং এবং আধুনিক মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইভিএফ প্রোগ্রাম থাকা সত্ত্বেও রোগীর অভাবে তা পর্যাপ্তভাবে কার্যকর হচ্ছে না, তাই খরচ কমানোর চেষ্টা চলছে।
এন্ডোমেট্রিওসিসকে কেবল নারী প্রজনন অঙ্গের রোগ হিসেবে না দেখে এটাকে পদ্ধতিগত রোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গকেও (মূত্রনালি, মলাশয়, কোলন) প্রভাবিত করতে পারে। অনেক সময় ক্যান্সারের চেয়েও বেশি ভয়াবহভাবে অঙ্গগুলো আক্রান্ত হয়। এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসার ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপিক বা মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি এবং রোবটিক সার্জারিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে রোগীর শরীরে ক্ষত কম হয়, ব্যথা কম থাকে এবং জটিলতার ঝুঁকি হ্রাস পায়। এ জন্য একটা সম্মিলিত চিকিৎসক দল থাকা জরুরি। এই দলে গাইনোকোলজিস্টের পাশাপাশি ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন, জেনারেল সার্জন, কলোরেক্টাল সার্জন এবং ইউরোলজিস্টদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) একটি ‘এন্ডোমেট্রিওসিস ক্লিনিক’ প্রতিষ্ঠা এবং বহির্বিভাগ ও আন্ত বিভাগে বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীকেন্দ্রিক সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এন্ডোমেট্রিওসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক রোগ হওয়ায় এর জন্য একটি সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োজন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে একটি বিশেষায়িত এন্ডোমেট্রিওসিস ক্লিনিক স্থাপনের পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে রোগীরা একই ছাদের নিচে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন। রোগীরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সঠিক সেবা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা এই ক্লিনিকের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। বহুমুখী চিকিৎসা পদ্ধতিতে গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসায় শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে মানসিক সহায়তা, পেইন ম্যানেজমেন্ট এবং সাইকোলজিক্যাল সাপোর্টের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে কিশোরী রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের জন্য কাউন্সেলিং সেশন রাখা জরুরি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধার্থে ব্যয়বহুল পরীক্ষাগুলো সহজলভ্য করা এবং এন্ডোমেট্রিওসিস সোসাইটির মাধ্যমে চিকিৎসার একটি নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রোগ নির্ণয়ে দীর্ঘসূত্রতা। এ ছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক আলট্রাসাউন্ড মেশিনের অভাব এবং গাইনোকোলজিস্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। এমআরআই এবং ল্যাপারোস্কোপির মতো উন্নত সুবিধাও অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিকভাবে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম পদ্ধতিতে চিকিৎসার কথা বলা হলেও বাংলাদেশে মূলত সাধারণ গাইনোকোলজিস্টরাই এই চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। পেইন স্পেশালিস্ট, সার্জন, ইউরোলজিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্টদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পরিকল্পনা করার সুযোগ এখানে কম। নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আধুনিক হরমোনাল ওষুধগুলো (যেমন : ডাইনোজেস্ট, জিএনআরএইচ অ্যানালগ) বেশ ব্যয়বহুল এবং সব জায়গায় সহজলভ্য নয়। এর ফলে অনেক রোগী মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে হরমোনাল থেরাপিকে প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে না নিয়ে সরাসরি সার্জারি করার প্রবণতা দেখা যায়।
এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা দুইভাবে হতে পারে। আক্রান্তদের ক্লিনিক্যাল এবং সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে সমন্বিত চিকিৎসা প্রদান করা। এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পর্কে সমাজে জানানোর মাধ্যমে ‘সংকোচবোধ’ কমানো। তাহলে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ে সামাজিক সংকোচ থাকবে না। কারণ রোগ প্রকাশে এবং আলোচনা করতে যত সংকোচবোধ থাকবে চিকিৎসা থেকে তত বেশি দূরে সরে যাব। এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত ও চিকিৎসা পেতে প্রায় ৪-১১ বছর সময় চলে যায়। এর অন্যতম কারণ সামাজিক সংকোচবোধ। এ কারণে আক্রান্তরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করে। ফলে এন্ডোমেট্রিওসিসের তীব্র ব্যথার ফলে নারীরা তাঁদের একাডেমিক ও পেশাগত কাজে পিছিয়ে পড়েন। তীব্র হতাশা ও বিষণ্নতা তৈরি হয়। বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, যৌন অক্ষমতা এবং নিজের শারীরিক গঠন নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটির সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আক্রান্তের তথ্য এখনো অজানা। সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য এবং সেই অনুযায়ী কর্মসূচি বা প্রোগ্রাম ডিজাইন করার জন্য গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোতে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ইন্টারভেনশন নেই। তাই এটিকে জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে একীভূত করা এবং সরকারের সঙ্গে মিলে একটি জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল ও রেফারেল গাইডলাইন তৈরি করা প্রয়োজন। রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম গঠন করা জরুরি, যা বর্তমানে আমাদের দেশে এখনো কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। ইউএনএফপিএ বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ে গবেষণা, স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল তৈরি এবং সরকারি কর্মসূচিতে এটি অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও সার্বিক সহযোগিতা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
স্কুল হেলথ প্রোগ্রামটি বর্তমানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উইংয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ২০টি জেলায় ২৩টি স্কুল হেলথ ক্লিনিক রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষক, মাঠকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের (পিয়ার লিডার) প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগও এখানে রয়েছে। এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটি সাধারণত অবহেলিত হলেও কমিউনিটি পর্যায়ে এর প্রাথমিক ডায়াগনোসিস করা খুব কঠিন নয়। বিশেষ করে স্কুলগামী কিশোরীদের এই বিষয়ে শিক্ষিত করা বেশি কার্যকর, কারণ এই বয়সে শেখানো বিষয়গুলো তাদের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং চিকিৎসকদের এই রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি, যাতে তাঁরা রোগীদের সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে পারেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে সচেতন করা যাবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।
এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত করতে সাধারণত ছয় থেকে ১০ বছর দেরি হয়। একটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) চালিত স্ক্রিনিং টুলের মাধ্যমে রোগীদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ‘ঝুঁকিহীন’ এই দুই ভাগে ভাগ করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো সম্ভব, যা এই দীর্ঘ বিলম্ব কমাতে সাহায্য করবে। এই এআই টুলটি অত্যন্ত নির্ভুল। এর সংবেদনশীলতা ৯৩.০১ শতাংশ, স্পেসিফিসিটি বা নির্ভুলতা ৯৪.৬০ শতাংশ এবং সামগ্রিক একিউরেসি ৯৩.২৫ শতাংশ। এটি রোগীরা নিজে ব্যবহার করতে পারেন অথবা কমিউনিটি হেলথ কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্ক্রিনিং করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বড়দের তুলনায় কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই রোগ শনাক্ত হতে আরো পাঁচ-ছয় বছর বেশি দেরি হয়। স্কুল হেলথ প্রোগ্রামে এই টুলটি যুক্ত করলে কিশোরীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে অনেক দরিদ্র মানুষের পক্ষে ট্রান্সভজাইনাল সোনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসোনোগ্রাফির মতো দামি পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।
প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে একজন এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি এপিডেমিক বা মহামারির মতো উদ্বেগজনক বিষয়। উদ্বেগের বিষয় হলো—বাংলাদেশে দ্রুত রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা। এই তিনটি অভাব বিদ্যমান। তবে রোগটির চিকিৎসায় ২০০০ সাল থেকে বিভিন্ন ওষুধের ব্যবহার হচ্ছে। ‘ডানাজল’ দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে চতুর্থ প্রজন্মের গর্ভনিরোধক এবং ‘রেহানজিল’-এর মতো আধুনিক গোনাডোট্রপিন রিলিজিং এন্টাগনিস্ট বাজারে রয়েছে।
দেশে এখন ৪০০ জনের মতো সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন, কিন্তু সবাই নগরকেন্দ্রিক এবং ঢাকায়ই বেশি। প্রান্তিক পর্যায়ে তেমন কেউ নেই। যদিও এখন শুক্রবার ঢাকার বাইরে গিয়ে সার্ভিস দেওয়ার ট্র্যাডিশন হয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও সেবা পাওয়া যাচ্ছে। 
দেশে বর্তমানে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.২ জন সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নার্স আছেন মাত্র ০.৫ জন। অন্য যেসব সাইকোলজিস্ট আছেন যাঁরা এনজিও ও অন্যান্য জায়গায় কাজ করেন, তাঁরা মাত্র ০.৩ জন। সোশ্যাল ওয়ার্কার নেই বললেই চলে। মোট মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ১.৪ জন। এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ। দেশের জেলা সদর হাসপাতালে কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট নেই। আগামী ১০ বছরেও আমরা উপজেলায় সাইকিয়াট্রিস্ট দিতে পারব কি না সন্দেহ। আমাদের দেশে মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট, মেন্টাল হেলথ পলিসি এবং মেন্টাল হেলথ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান থাকলেও এখনো সুইসাইড প্রিভেনশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নেই। আমরা সেটা করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া অ্যান্টি-স্টিগমা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এখনো ন্যাশনাল পলিসিতে আনতে পারিনি। এই ব্যর্থতা স্বীকার করে আমাদের কাজ করতে হবে। প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অন্তত একজন করে সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। এই ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজকে যদি আমরা দুর্যোগকালীন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে যুক্ত করতে পারি, তাহলে তারা নিজেদের টিম নিয়ে দেশের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত সেবা দিতে পারবেন। এই প্রস্তাব আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে যাচ্ছি।
দুর্ঘটনা বা দুর্যোগ-পরবর্তী আহত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি মাইলস্টোনের ঘটনায় শিক্ষকদের সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম আমরা করেছি। সেখানে দু-একজন শিক্ষককে কান্না করে তাঁদের মানসিক সমস্যার কথা বলতে দেখা গেছে। এসব শিক্ষকের এখনো অনেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে সমস্যাটা যে এতটা গুরুতর, সেটা আমরা জানতাম না। তাঁদের চিকিৎসা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
একটি মেয়েশিশু ছোটবেলা থেকেই অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বড় হয়। তাকে সীমাবদ্ধতা শেখানো হয়, ধৈর্যধারণ করতে শেখানো হয়। আরো শেখানো হয়
বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানে সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডারসংক্রান্ত গবেষণায় হয়। এতে দেখা গেছে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি আহতদের এক-তৃতীয়াংশ গুরুতর মানসিক উদ্বেগ নিয়ে আসেন। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এই হার ছিল ২১.৮ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিপর্যয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পেরে আমরা গর্বিত। কারণ এ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। দুটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। একজন শিক্ষার্থী যিনি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অগ্নিকাণ্ডে অন্যদের উদ্ধার করতে গিয়ে শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরে ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন; আরেকটি ঘটনা সম্প্রতি মিরপুরে কেমিক্যাল বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকাজে অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে বাধা সৃষ্টি হয়, যেখানে আমরা ব্যানারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সেবার তথ্য প্রচারের উদ্যোগ নিই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বিপর্যয় বা জরুরি পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনা-পরবর্তী ২৫৫ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ ঘুমের সমস্যা, ২৯ শতাংশ খিটখিটে মেজাজ, ২৬ শতাংশ ফ্ল্যাশব্যাক, ২৬ শতাংশ ক্ষুধামান্দ্য, ২০ শতাংশ মনোযোগের ঘাটতি, ২০ শতাংশ কাজে অনাগ্রহ
মানসিক চিকিৎসা নিয়ে প্রচার কম। এতে সচেতনতাও বেশিদূর এগোয়নি। আমাদের প্রচার বাড়াতে হবে, মানুষ জানুক, যুক্ত হোক, একসঙ্গে কাজ করুক। আমরা আমাদের আশপাশের সবাইকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করব। যাঁরা সহযোগিতা করছেন তাঁদের শুধু ধন্যবাদ নয়, বরং আরো এনগেজ করতে হবে। যেমন
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ৯২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন না মূলত সামাজিক কলঙ্ক বা স্টিগমার কারণে। অনেকে ভাবেন, একবার মানসিক চিকিৎসা শুরু করলে সারা জীবন এর চিকিৎসা নিতে হবে। এতে বিয়েতে সমস্যা বা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে। ফলে চিকিৎসা না নিয়ে বিষয়টি চেপে রাখেন।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় কোন ধরনের মানসিক সমর্থন প্রয়োজন আমার জানা ছিল না। বিশেষজ্ঞরা যখন কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম শুরু করলেন, তখন আমরা জানতে পারি। বিশেষ করে প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি সহায়ক থেরাপি দেওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। মনে হয়েছে, শিক্ষার্থী যেন ভুলে গেছে ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা। ওরা আগের মতো দৌড়াচ্ছে, খেলছে, ক্লাস করছে।
দেশের অনেক মানুষ জানে না কোনটা মানসিক রোগ। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে। ইনসেপ্টা এসব উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং প্রচার ও সচেতনতা কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত প্রায় ৯৯ শতাংশ ওষুধ এখন বাংলাদেশেই তৈরি হয় এবং ইনসেপ্টা দেশে আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করছে, যেমন লেজার ড্রিল টেকনোলজিতে তৈরি
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ঠিক করা হয় প্রতিপাদ্যকে ঘিরে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল