সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামকে সাধারণত ছবি ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হলেও, বিবিসির সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধান উদ্বেগজনক একটি চিত্র সামনে এনেছে।
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভারতে ইনস্টাগ্রামে অর্থের বিনিময়ে শিশু যৌন নির্যাতনের ভিডিও বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছিল। এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের টেলিগ্রামের বিভিন্ন চ্যানেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, যেখানে মাত্র ৯৯ ভারতীয় রুপিতে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪০ টাকা) ওই ভিডিও কেনার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল।
শুক্রবার (৩ জুলাই) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেয়।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস জানায়, বিষয়টি যাচাই করতে তারা ভারতে একটি পরীক্ষামূলক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। শুরুতে অ্যাকাউন্টটিতে সাধারণ কিছু কনটেন্ট অনুসরণ করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই ফিডে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বিজ্ঞাপন আসতে শুরু করে। পরে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি ও ভিডিও বিক্রির বিজ্ঞাপনও দেখা যায়।
অনুসন্ধানে প্রায় ৩০টি ভিন্ন বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা হয়। একই সঙ্গে প্রায় ২০টি প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফিসংক্রান্ত বিজ্ঞাপনও ওই অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত হয়। বিজ্ঞাপনগুলোতে ‘রেপ ভিডিও’ ও ‘চাইল্ড ভিডিও’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছিল এবং সেখান থেকে ব্যবহারকারীদের টেলিগ্রামের চ্যানেলে পাঠানো হচ্ছিল।
বিবিসি একটি বিজ্ঞাপন ইনস্টাগ্রামে রিপোর্ট করলে ২৪ ঘণ্টা পর প্ল্যাটফর্মটি জানায়, সেটি তাদের কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘন করেনি। পরে বিবিসি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য চাইলে ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা কয়েকটি বিজ্ঞাপন সরিয়ে দেয়, সংশ্লিষ্ট কিছু অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনকারী আরো কিছু লিংক ব্লক করে।
মেটা এক বিবৃতিতে জানায়, শিশুদের যৌন শোষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ এবং এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে তারা নিয়মিত এসব কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণ করছে। তবে কোনো প্রযুক্তিই শতভাগ নির্ভুল নয় বলেও স্বীকার করেছে তারা।
টেলিগ্রামও জানায়, ২০২৬ সালে শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত ২ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি গ্রুপ ও চ্যানেল সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা যায়, অভিযোগের পর একটি চ্যানেল বন্ধ হলেও অন্য একটি চ্যানেলে একই ধরনের ভিডিও বিক্রির কার্যক্রম চলতে থাকে।
ভারতের সাবেক সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মদন লোকুর বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এ ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে দায় এড়াতে পারে না এবং এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
মেটার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রায়ান বোল্যান্ডও বিবিসিকে বলেন, ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে অ্যালগরিদম অনেক সময় আরো আকর্ষণীয় বা চরম ধরনের কনটেন্ট দেখানোর চেষ্টা করে। যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এর ফলে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১৯ লাখ শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত অনলাইন অভিযোগ ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের অপরাধ দমনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় জরুরি।




