আরো একবার শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চে মাতাল করা এক জয় আর্জেন্টিনার। এবার ঐতিহাসিক প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। পিছিয়ে পড়ে ৮৫ মিনিটে এনসো ফার্নান্দেসের গোলে সমতায় ফেরা, এরপর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেসের ম্যাচের মীমাংসা গড়ে দেওয়া হেডার। আরো একবার ইংলিশদের হৃদয় ভেঙে জিতে যায় আর্জেন্টিনা। এবার ফাইনালে তারা।
কোথায় সেই ’৮২-এর ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ম্যারাডোনার কীর্তি কিংবা ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড! দুই দল ২৪ বছর আগে বিশ্বকাপে সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছে কে বলবে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রবল ঝাঁজ গতকাল খেলা শুরুর প্রথম মিনিট থেকেই। অথচ মেসিসহ এই প্রজন্মের আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের কেউই এর আগে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামেননি। কিন্তু এই ম্যাচের আগে এমন একটা আবহ তৈরি হয়েছিল যে খেলোয়াড়রাও তাতে প্রভাবিত হতে বাধ্য। মাঠে তারই প্রতিফলন দেখাচ্ছিল। তীব্র জিঘাংসা নিয়ে যেন একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এদিন আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যেই আর্জেন্টিনা ৪ ফাউল করে, যা বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত যৌথ সর্বোচ্চ। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি হচ্ছিলেন না। ট্যাকটিকস, কৌশল এসব ক্ষেত্রে যেন মার খেয়ে যায়, যুদ্ধংদেহি মনোভাব যেন দুই দলেরই। ইংল্যান্ড প্রবল প্রেসিং করছিল, আর্জেন্টাইনরা যেভাবে পারে তার জবাব দিচ্ছিল। মেসি একবার মাঝমাঠে বল পেয়ে দু্জনকে কাটিয়ে বক্সের সামনে আরো দুজনের করিডরের মধ্যে দিয়ে ঢুকতে গেলে তীব্র ফাউলে উড়ে গিয়ে পড়েন। ’৮৬-এর উত্তেজনাই যেন ফিরেছিল এদিন। গ্যালারিতে এত দিন আর্জেন্টিনার ম্যাচ হলে আকাশি-সাদায় ছেয়ে যেত, গলা চড়ত আলবিসেলেস্তেদের। এদিন ‘মেসি’ ‘মেসি’ মুহূর্তেই যেন ছাপিয়ে যাচ্ছিল ইংলিশদের ‘হে জুড’ সুরে। গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদেরই আধিপত্য। সেমিফাইনালের আবহ এমন না হলে কি চলে! কিন্তু প্রথমার্ধ যে শেষ হলো নিষ্ফলা। সেখানে কেবল ট্যাকল, ফাউল ও উত্তেজনার গল্প।
প্রথমার্ধ শেষে অন টার্গেট শট নেই কারো। আর্জেন্টিনার ফাউল ১২টি, ৭টি ইংল্যান্ডের। ডিফেন্সে ১১টি ট্যাকল আর্জেন্টিনার, সেখানে ইংল্যান্ডের ৮টি। আর্জেন্টিনার ক্লিয়ারেন্স ১০, ইংল্যান্ডের ৭। ম্যাচের আবহ এতেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। দুই দলে দুই হলুদ কার্ডও হয়ে যায়। মেসিকে ফাউল করে কার্ড দেখেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন, বিরতির আগে ওদিকে লিসান্দ্রো মার্তিনেস। দ্বিতীয়ার্ধে মনে হলো মাথা ঠাণ্ডা রেখে খেলার চেষ্টা দুই দলের। কিন্তু এর মধ্যেই হলুদ কার্ড দেখে ফেললেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। আর্জেন্টিনা এদিন ঠিক পজেশন ছাড়তে রাজি ছিল না। ইংলিশদের পায়ে বল রেখেও ডিফেন্স লাইন ওপরে তুলে নিয়ে এসেছিল। দ্বিতীয়ার্ধের তখন মিনিট দশেক। ইংল্যান্ড দ্রুত আক্রমণে উঠলে খেই হারায় সেই আর্জেন্টিনার ডিফেন্স। হ্যারি কেইন ডানদিকে মর্গান রজার্সকে বাড়ালে লিসান্দ্রো মার্তিনেস মাঝখানে সেই বল আটকে দিতে পারতেন; কিন্তু পারেননি। রজার্সের ক্রস এ প্রান্তে কানেক্ট করেন অ্যান্থনি গর্ডন। নাহুয়েল মলিনা ট্র্যাক ব্যাক করে তাঁকে ধরতে পারেননি। ইংল্যান্ড তাই এগিয়ে যায় ১-০-তে। পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনার আর পেছনে পড়ে থাকার কোনো কারণই থাকে না। ইংল্যান্ড বরং নিচে জমাট হয়। গোলের পর পরই জুনিয়ানো ডানদিক দিয়ে বক্সে ঢোকার পর ট্যাকলের শিকার হন, রেফারি ফাউল দেওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাননি।
আর্জেন্টিনা তখন চড়াও হয়েছে ইংল্যান্ডের বক্সে। আক্রমণে বাড়তি সদস্য যোগ করতে পারেদেসকে উঠিয়ে নিকো গনসালেসকে নামান লিওনেল স্কালোনি। নেমেই কাজের কাজটা করে ফেলেছিলেন প্রায় নিকো। মলিনার ক্রসে লাফিয়ে উঠে মাথা ছুঁইয়ে দিয়েছিলেন; কিন্তু জর্ডান পিকফোর্ড ছিলেন সতর্ক। ৭৫ মিনিটে এবার ভাগ্য বাঁচিয়ে দেয় ইংলিশদের। মলিনাকে তুলে নিয়ে গনসালো মনতিয়েলকে নামিয়েছিলেন স্কালোনি। বাঁদিক থেকে সেই মন্তিয়েলের ক্রসেই অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড ফিরে আসে সাইড পোস্টে লেগে। অ্যালিস্টার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সেট পিসে গোল করেছিলেন; কিন্তু এদিন তিনি দুর্ভাগা। আর্জেন্টিনারও সময় ঘনিয়ে আসছিল, চাপ বাড়ছিল মেসিদের ওপর।
রদ্রিগো দি পলের বদলে এদিন জুলিয়ানোকে খেলিয়েছিলেন স্কালোনি শুরু থেকে। দি পল পরে মাঠে আসেন সেই জুলিয়ানোর পরিবর্তে। তবে আর্জেন্টিনার ত্রাতা হন এদিন সেই এনসো ফের্নান্দেস। ৮৬ মিনিটে মেসির কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে তাঁর ঠাণ্ডা মাথার শট পিকফোর্ডের নাগালের বাইরে দিয়ে গিয়ে ঠাঁই নেয় জালে। ২০২২ বিশ্বকাপে এমনই এক গোলে নিজের আবির্ভাব জানান দিয়েছিলেন এই মিডফিল্ডার। সেটি ছিল মেক্সিকোর বিপক্ষে। সৌদি আরবের কাছে হারের পর ঘুরে দাঁড়ানোর ম্যাচে। এদিন আলবিসেলেস্তেদের সমতায় ফিরিয়ে আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আরো একবার মাতাল করেন তিনি আর্জেন্টিনা সমর্থকদের। ৯ মিনিট ‘ইনজুরি টাইম’ যোগ হয় এদিন। তার শুরুতেই ম্যাক অ্যালিস্টার আবার ভাগ্যাহত, তবে আর্জেন্টিনা নয়। তাঁর শট আবার পোস্টে লেগে ফেরার পর সেই মুভ শেষ হতে দেননি মেসি, ডান দিক থেকে তাঁর দূরদর্শী ক্রস। ইন্টার মিলান তারকা লাউতারো মার্তিনেস যেন তৈরিই ছিলেন, ইংলিশ ডিফেন্সের ওপর লাফিয়ে দুর্দান্ত এক হেডে সেই বল পাঠান জালে। ২-১-এ এগিয়ে তাই আরো একটা রুদ্ধশ্বাস জয় নিয়ে মেসির আর্জেন্টিনাই ফাইনালে।




