kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

টিনিটাস : কানের এক অসুখের নাম

ডা. আলমগীর মো. সোয়েব   

১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টিনিটাস : কানের এক অসুখের নাম

মডেল : খাজা শাহাবুদ্দিন আলী আহমেদ, ছবি : কাকলী প্রধান

ফ্যান বন্ধ করলে বা বদ্ধ ঘরে থাকলে মাথা ঝিমঝিম করা শুরু করে। কানে একপ্রকার শব্দ হয়, যেন ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। কোনো বাহ্যিক শব্দ ছাড়া কানের ভেতর এ রকম বেজে যাওয়াকে টিনিটাস বলে। লাতিন শব্দ ‘টিনিয়ার’ থেকে এটির উৎপত্তি, যার অর্থ ঘণ্টার শব্দ।

বিজ্ঞাপন

এটি কানের অসুখ অথবা অন্য কোনো রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। এই রোগে রোগী কানের ভেতর শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ, শিস দেওয়ার শব্দ, কেটলিতে পানি বাষ্প হওয়ার শব্দ, হিসহিস শব্দ, রেলগাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ, টিভির ঝিরিঝিরি শব্দ ইত্যাদি অনুভূতি হতে পারে।

প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ১-২ শতাংশ মানুষ এটির কারণে দুর্বিষহ জীবন যাপন করে। এটি এক কানে অথবা উভয় কানে হতে পারে। পুরুষের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব মানুষের। টিনিটাস যাদের আছে, তাদের মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষের মধ্যেই কানের শ্রবণশক্তি কম পাওয়া যায় (বিভিন্ন মাত্রার)। শতকরা ১০ ভাগ টিনিটাস রোগীদের শুনানি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক পাওয়া যায়। তবে যেকোনো বয়সের পুরুষ, নারী বা শিশুদেরও কানে এটি হতে পারে।

 

টিনিটাসের প্রকারভেদ

টিনিটাস সাধারণত ভুক্তভোগী নিজেই শুনতে পায়, অন্য মানুষ শুনতে পায় না, যেটিকে ইংরেজিতে বলা হয় সাবজেক্টিভ টিনিটাস। এটিই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়।

 

কারণ

টিনিটাসের বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে :

♦ শ্রবণশক্তি হারানো (বিশেষ করে বার্ধক্যজনিত কারণে ও অন্য কোনো কারণে কানের হেয়ারসেল ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রবণশক্তি কমতে থাকে)।

♦ শব্দদূষণ : গাড়ির উচ্চশব্দের হাইড্রোলিক হর্ন, জেনারেটর ও শিল্প-কারখানার ভারী যন্ত্রাংশের শব্দ, লাইভ কনসার্ট, যত্রতত্র মাইকের ব্যবহার, অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেন ইত্যাদি কারণে অন্তঃকর্ণের ক্ষতি হয়। এর ফলে শ্রবণশক্তি কমার পাশাপাশি টিনিটাসে আক্রান্ত হচ্ছি।

♦ কান সংক্রমণ বা ইনফেকশন : কানে পানি বা তরল জমা, ময়লা, কানের ওয়াক্স, ছত্রাক বা অন্যান্য কারণে কানের ছিদ্র বা ইয়ার ক্যানেল বন্ধ হয়ে গেলে।

♦ মধ্যকর্ণে পানি বা ফ্লুইড জমা হলে (নাক ও মধ্যকর্ণের সংযোগকারী ইউস্টেশিয়ান টিউবের কার্যকারিতা কমে গেলে, টনসিল বা এডিনয়েড টিস্যু বড় হলে, ওপরের শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জি, ইনফেকশন, সাইনুসাইটিস ইত্যাদি কারণে)।

♦ মধ্যকর্ণের ভেতর অস্বাভাবিক হাড় বৃদ্ধির কারণে কানের অস্থিগুলোর নড়াচড়া কমে যায়। এর ফলে শব্দতরঙ্গপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যা অটোস্ক্লেরোসিস নামে পরিচিত।

♦ অন্তঃকর্ণে অস্বাভাবিক তরলীয় চাপ বা মিনিয়ারস ডিজিজ।

♦ মাথা, কান ও ঘাড়ে আঘাত।

♦ অভ্যন্তরীণ কানের পেশিগুলোর খিঁচুনি (সংকোচন)।

♦ মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (একটি অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা স্নায়ুর প্রতিরক্ষামূলক আবরণ নষ্ট হয়)।

♦ কানের সামনে মাথার দুই পাশে চোয়ালের জয়েন্টের ব্যাধি।

♦ মাথা ও ঘাড়ে টিউমার।

♦ রক্তনালির ব্যাধি; যেমন—উচ্চ রক্তচাপ, বিকৃত রক্তনালি, এথেরোস্ক্লেরোসিস (একটি অবস্থা যেখানে ধমনির দেয়ালে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমা হয়)।

♦ দীর্ঘস্থায়ী (দীর্ঘমেয়াদি) অবস্থা; যেমন—ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ডিস-অর্ডার, মাইগ্রেন, রক্তস্বল্পতা (লাল রক্তকণিকার অভাব), লুপাস (যখন ইমিউন সিস্টেম শরীরে ব্যথা এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে) এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস।

♦ প্রেগন্যান্সি—এই সময় শরীরে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়।

♦ বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ ইত্যাদি।

♦ এ ছাড়া ধূমপান, মদ্যপান, স্থূলতা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও টিনিটাস বেশি দেখা দেয়।

 

সমস্যা

অবসাদ, দুশ্চিন্তা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, অস্থিরতা, বিষণ্নতা, মাথা ব্যথা, মাথা ধরে থাকা, পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রে সমস্যা।

 

চিকিৎসা

টিনিটাস যেহেতু বিভিন্ন কারণে হতে পারে, তাই এর জন্য নির্দিষ্ট একক কোনো চিকিৎসা নেই। যদি টিনিটাসের নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করা যায়, তবে তা চিকিৎসার ফলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। বর্তমান বিশ্বে টিনিটাসের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। কারণ অনেক ক্ষেত্রে সব ধরনের চিকিৎসার পরও এই রোগটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে এ ব্যাপারে গবেষণা চলমান রয়েছে।

তবে সঠিকভাবে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী অগ্রসর হলে অনেকেই এ উপসর্গ থেকে আরোগ্য লাভ করতে পারেন।

ব্যবস্থাপনাগুলো হচ্ছে :

প্রতিরোধ : যেসব কারণে এ রোগে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে (যেমন—শব্দদূষণ, কানের ক্ষতিকারক অসুখ, ধূমপান, মদ্যপান, অত্যধিক দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ইত্যাদি) সেগুলো থেকে সাবধানে থাকা।

রোগের চিকিৎসা : যেসব রোগের কারণে টিনিটাসের উৎপত্তি হয়, সেগুলোর চিকিৎসা করা। যেমন—কানের ওয়াক্স, ইনফেকশন, পানি জমা, টনসিল, এডিনয়েডের চিকিৎসা, মিনিয়ারস ডিজিজ ইত্যাদি।

অপারেশন : কানের পর্দা লাগানো, স্প্যাপিস সার্জারি, ককলিয়ার ইমপ্লান্ট, কানের টিউমার ইত্যাদি চিকিৎসা ও অপারেশনে ভালো ফল পাওয়া যায়।

♦ টিনিটাস মাসকার বা হিয়ারিং এইড ব্যবহার।

ওষুধ : হতাশাজনক হলেও সত্যি যে এখন পর্যন্ত এফডিএ কর্তৃক টিনিটাস নিয়ন্ত্রণকারী কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। তবে কিছু ওষুধ; যেমন—সিনারাজিন, ক্লোনাজিপাম, কারবামাজেপিন, নিমোডিপিন ইত্যাদি কিছু মাত্রায় টিনিটাস নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। এ ছাড়া কিছু ওষুধ, যা এখন ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে জিঙ্গোবিলো বা এক্সট্রাকট অন্যতম। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বটুলিনাম টক্সিনের ব্যবহার করা যায়।

শব্দথেরাপি বা পিচমেচিং : টিনিটাসের ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে ম্যাচ করে এরূপ কোনো শব্দতরঙ্গ বা সুর টিনিটরের মাধ্যমে কানে দেওয়া হয়, যাতে টিনিটাসের শব্দ কানে অনুভূত না হয়। বারবার এটি দেওয়া হলে একসময় রোগীর কানের ভেতর টিনিটাসের শব্দ অভিযোজিত হয়ে যায়। এ ছাড়া রুমে হালকা মিউজিক, টিকটিক ঘড়ির শব্দ, রেডিও, একটু বেশি শব্দ হয় এমন কোনো ফ্যান চালানো যেতে পারে।

কাউন্সেলিং : টিনিটাসকে মেনে নিয়ে এটির সঙ্গে জীবনযাপনে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এটির জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।

কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি : টিনিটাস সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো। এর ফলে এটি হয়তো এত খারাপ লাগবে না।

টিনিটাস রিট্রেনিং থেরাপি : টিনিটাসের ফলে মস্তিষ্কে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, সেটি কমানো। তাই টিনিটাস নিয়ে অবহেলার সুযোগ নেই। টিনিটাস হলে আপনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

লেখক : কনসালট্যান্ট (ইএনটি)

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

 

 

 



সাতদিনের সেরা