রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা শাহবাগে আন্ডারপাস নির্মাণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর। ঘোষণাটি খুব সহজে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু। আছে স্বজনের অশ্রু আর সহপাঠীদের সহিংস প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের দীর্ঘ ইতিহাস। অব্যাহত আন্দোলনের মুখে আন্ডারপাস নির্মাণের প্রতিশ্রুতি মিললেও ওই পর্যন্তই। এখনো প্রতিদিন হাজারো পথচারী মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে শাহবাগের ভয়ংকর মোড় পার হচ্ছে। শুধু শাহবাগ নয়, রাজধানীর সড়ক পারাপারের জন্য শতাধিক মোড়ে ফুটওভারব্রিজ নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর ১২৮টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফুটওভারব্রিজ থাকার কথা। কিন্তু আছে মাত্র ৮৭টি স্থানে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশিই আবার ব্যবহারের অনুপযোগী। এ ছাড়া ৪০০ মোড়ে জেব্রা ক্রসিংয়ে সাদা দাগগুলো অস্তিত্ব হারিয়েছে অনেক আগেই। আর তুলির আঁচড় পড়েনি। সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটওভারব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং না থাকায় রাজধানীর গুলশান-১ ও ২, বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, পুরানা পল্টন মোড়, মতিঝিল জনতা ব্যাংকের মোড়সহ একাধিক স্থানে, গুলিস্তান মোড়, শাহবাগ মোড়, বাড্ডা লিংক রোডসহ নগরীর শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে পথচারীরা। ব্যস্ততম গুলিস্তান এলাকার কোনো সড়কে ফুটওভারব্রিজ নেই। পথচারীদের পারাপারের সুবিধার কথা মাথায় রেখে গুলিস্তান আন্ডারপাস নির্মাণ করা হলেও সেটি এখন পরিচিত মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশের মার্কেট হিসেবে। মার্কেটের দোকানিরা আন্ডারপাসের চলাচলের রাস্তায় শোকেস বসিয়ে যাতায়াতের পথ সঙ্কুচিত করে ফেলেছে। টাইলস উঠে গিয়ে উঁচু-নিচু হয়ে আছে। কাজ করছে না শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। আন্ডারপাসের নিরাপত্তা কর্মী আবু সুফিয়ান জানালেন, আন্ডারপাস মার্কেটটি অন্য মার্কেটের মতো রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এরপর পথচারীরা ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হন। শাহবাগ এলাকায় চার রাস্তার মোড় থেকে দূরে দুটি ফুটওভারব্রিজ রয়েছে। কিন্তু তা ছিন্নমূল মানুষের দখলে। পিজি এবং বারডেম হাসপাতালের সামনে থাকা ফুটওভারব্রিজটি চলে গেছে মাদকাসক্তদের দখলে। তাই মানুষ রাস্তা পারাপারের জন্য সড়ক ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। অভিজাত এলাকা গুলশানে কোনো ফুটওভারব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস নেই। ব্যস্ততম বিমানবন্দর-কুড়িল বিশ্বরোডে এক বছর আগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নির্মাণ করেছে কুড়িল ফ্লাইওভার। কিন্তু দেড় বছর পার হয়ে গেলেও ফ্লাইওভারের সঙ্গে যুক্ত ফুটওভারব্রিজগুলোর কাজ শেষ করেনি কৃর্তপক্ষ। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। সংস্কারের কথা বলে ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হল সংলগ্ন ফুটওভারব্রিজটি গত বছর ১৫ জুলাই থেকে বন্ধ রেখেছে ডিএনসিসি। অথচ সংস্কার কাজও হচ্ছে না। পথচারীদের চলাচলের জন্য 'ঝুঁকিপূর্ণ' লেখা একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে ডিএনসিসি। পাশের ব্রিজটিতেও একই কারণে চলাচল বন্ধ। কারওয়ান বাজারের আন্ডারপাসটি মোটামুটি ব্যবহারের উপযোগী থাকলেও রাতে সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহারে ভয় পান। ছিনতাইকারী, ভাসমান মানুষসহ পতিতাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয় আন্ডারপাসটি। নগরীর মধ্যে থাকা ৮৭টি ফুটওভারব্রিজ ও তিনটি আন্ডারপাসের বেশিরভাগই ময়লা-আবর্জনাসহ মলমূত্রে একাকার হয়ে থাকায় পথচারীদের তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সংলগ্ন ফুটওভারব্রিজটিতে আবাস গড়েছে ছিন্নমূল মানুষ ও মাদকসেবীরা। আজিমপুর গার্লস স্কুল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল, প্রেসক্লাব সংলগ্ন ফুটওভারব্রিজেও একই চিত্র। প্রেসক্লাব সংলগ্ন চা দোকানি খালেক মিয়া জানান, রাতে ব্রিজটি ব্যবহারকারীদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। রাত বাড়লেই ব্রিজটিতে ছিনতাইকারী আর ভাসমান পতিতাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গাউছিয়া থেকে নিউ মার্কেটগামী ফুটওভারব্রিজটির প্রবেশপথে হকাররা দোকান বসিয়ে ব্রিজে ওঠার পথটি সঙ্কুচিত করে ফেলেছে। নীলক্ষেত থেকে নিউ মার্কেটগামী অপর ফুটওভারব্রিজটিতেও রয়েছে হকার আর ভিক্ষুকের উৎপাত। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের গত বছরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীতে বছরে ৪০০ দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে পথচারীদের রাস্তা পারাপারের সময়। এ ব্যাপারে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, দুই বা তিন লেনের রাস্তা হলে সেখানে ফুটওভারব্রিজ থাকা অপরিহার্য। ঢাকা শহরে পথচারীদের তুলনায় ফুটওভারব্রিজ অনেক কম। নগরজুড়ে চলছে সিটি নির্বাচনের ধুন্ধুমার প্রচারণা। প্রার্থীরা ভোট চাইতে ছুটছেন দ্বারে দ্বারে। আর ভোটাররাও নগরীর নানা সমস্যা তুলে ধরছেন প্রার্থীদের কাছে। উঠে আসছে ঢাকার ব্যস্ততম রাস্তায় ফুটওভারব্রিজ ও আন্ডারপাসের অপ্রতুলতা ও অব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও। প্রার্থীরাও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নির্বাচিত হতে পারলে সমস্যাটিকে গুরুত্বসহকারে দেখার।