প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করেছেন। এর প্রতিবাদে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী কিয়েভে বিক্ষোভকারীরা ‘ফেদোরভকে বরখাস্ত করা যাবে না’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে সমবেত হন। এ সময় তারা ‘ধিক্কার’ স্লোগানও দেন।
বিবিসিকে ইউক্রেনের এক সৈনিক ওলেক্সান্ডার বলেন, ‘জেলেনস্কি তার পুরো প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এটাই সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন।’
তিনি মনে করেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে অপসারণের সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। ফেদোরভের বরখাস্তকে ঘিরে ইউক্রেনের বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও অসন্তোষ বাড়ছে।
বিক্ষোভকারীরা ফেদোরভের অপসারণের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এর কারণ প্রকাশের দাবি জানান। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখনও এই সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করেননি। তবে এ পদক্ষেপকে ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং সুশীল সমাজের একটি অংশের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সৈনিক ওলেক্সান্ডার আরো বলেন, ‘ফেডোরভের দলের ওপর আস্থা থাকায় এ বছরের শুরুতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম। আমি এমন কাউকে চিনি না যে, তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। সেনাবাহিনীতেও না, সমাজেও না।’
তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে আমার অনেক বন্ধু আছে। তাদের অনেকেই মারা গেছে। আমি চাই না এটা চলতে থাকুক।’ মধ্য কিয়েভের ইভান ফ্রাঙ্কো স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভে ৩১ বছর বয়সী মারিয়া লাভরিনেটস বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা ফেদোরভের কাজের ফলাফল দেখতে পাচ্ছি।
আমরা সৈন্যদের মনোবলও দেখছি। আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।’ তিনি বলেন, ফেদোরভের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং এ কারণে তার অপসারণের সিদ্ধান্তে অনেক মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
এই ঘটনাকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভ চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গতি আনেন, দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন এবং তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে সামরিক কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন বলে তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের পার্লামেন্টে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইহোর ক্লিমেনকোকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
ফেদোরভের অপসারণ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তার সঙ্গে ইউক্রেনের সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কির মতবিরোধ এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আবার অন্যদের মতে, সেনাবাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগ ও সমাবেশ সংস্কারের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে না পারাও তার অপসারণের একটি কারণ হতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর মিখাইলো ফেদোরভ মন্ত্রণালয়ের সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন। ইউক্রেনের অনেকের মতে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সোভিয়েত আমলের পুরোনো ধ্যানধারণায় আটকে ছিল।
ডিজিটাল রূপান্তর বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী হিসেবে ফেদোরভ ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকেই সাইবার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে সাইবার অভিযান চালানোর জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ‘ইউক্রেনের আইটি আর্মি’ গঠনে সহায়তা করেন।
পরে তিনি ‘আর্মি অব ড্রোনস’ নামে একটি সফল তহবিল সংগ্রহ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন, যার মাধ্যমে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর জন্য ড্রোন সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া তিনি এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেন, যেখানে রুশ লক্ষ্যবস্তুতে সফল হামলার জন্য ইউক্রেনীয় সামরিক ইউনিটগুলোকে বিশেষ স্বীকৃতি ও পুরস্কার দেওয়া হতো।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরও মিখাইলো ফেদোরভ ড্রোন প্রযুক্তি, আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার দায়িত্বকালে তিনি স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের কাছে আহ্বান জানান, যাতে রাশিয়া ড্রোন হামলায় স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে না পারে। ইউক্রেনের দাবি, এ পদক্ষেপ রাশিয়ার সামরিক অভিযানে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল।
ফেদোরভের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয় মস্কো-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলাগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত মাসে তিনি মাঝারি পাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে ক্রিমিয়াকে রাশিয়া থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করার অঙ্গীকার করেছিলেন।
বরখাস্ত হওয়ার পর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ফেদোরভ তার বিভিন্ন সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উদ্ভাবন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাংগঠনিক শক্তির মাধ্যমে তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন।
এদিকে, খ্যাতনামা ড্রোন ইউনিট কমান্ডার পাভলো ইয়েলিজারভ ফেদোরভের বরখাস্তের প্রতিবাদে ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডারের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তকে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য বড় ধরনের ক্ষতি বলে মন্তব্য করেন।