স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন, এমন এক নারীর অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন বোম্বে হাইকোর্ট। আবেদনকারী নারী ২০১১ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বসবাস করেন। সেখানকার উচ্চ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি তার স্বামীর কাছে মাসে এক লাখ টাকা অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ চেয়েছিলেন। কিন্তু বোম্বে হাইকোর্ট তার আবেদন খারিজ করে দিয়ে বলেছেন, কেবল যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ ব্যয় অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ পাওয়ার যুক্তি হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রে থাকাটা তার ব্যক্তিগত পছন্দ। তারচেয়ে বড় কথা হলো, আবেদনকারী নারী মাসে ৮ লাখ রুপি (৮ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার) আয় করেন, যা তার স্বামীর আয়ের চেয়ে ঢের বেশি।
আলোচিত দম্পতির দুজনই আইটি প্রফেশনাল। আবেদনকারী নারী যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে নয়াদিল্লিভিত্তিক আইটি সলিউশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘মার্ক ইনফোটেক’-এ কাজ করছেন। তার স্বামী কাজ করেন ভারতে। ২০১৮ সাল থেকে পুনের একটি পারিবারিক আদালতে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা চলছে।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালে পুনের পারিবারিক আদালত তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদনটি আংশিকভাবে মঞ্জুর করেন এবং তাদের বিয়ে ভেঙে দেওয়ার ডিক্রি জারি করেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এই দম্পতির বড় সন্তান বাবার হেফাজতে আর ছোট সন্তান মায়ের হেফাজতে রয়েছে।
পুনের পারিবারিক আদালত মামলার খরচ বাবদ স্ত্রীকে ২৫ হাজার রুপি দেওয়ার জন্য স্বামীকে আদেশ দিয়েছেন। তবে আদালত নারীর স্থায়ী খোরপোশের দাবিটি খারিজ করে দিয়েছিলেন। পারিবারিক আদালতের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবং স্থায়ী খোরপোশের দাবি নিয়ে সেই নারী পরবর্তীতে বোম্বে হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্টে আপিলটি বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেই আবেদনকারী অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ হিসেবে প্রতিমাসে ১ লাখ টাকা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। বিচারপতি ভারতী ডাংরে এবং বিচারপতি মঞ্জুষা দেশপাণ্ডের বেঞ্চ সম্প্রতি সে আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন।
আবেদনকারী নারীর প্রধান যুক্তি ছিল, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বসবাস করেন এবং সেখানে জীবনযাত্রার অত্যন্ত উচ্চ ব্যয় ও সন্তানের পড়াশোনার খরচের কারণে তিনি তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আদালত তার আবেদন খারিজ করে দিয়ে বলেন, আবেদনকারী নারীর জমা দেওয়া বেতনের নথি থেকেই প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি তার স্বামীর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আয় করেন। আদালত স্পষ্ট জানায়, বিদেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি, কেবল এই অজুহাত দেখিয়ে উচ্চ উপার্জনকারী কোনো পেশাদার ব্যক্তি খোরপোশ দাবি করতে পারেন না। এটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব জীবনযাত্রার পছন্দ। তা ছাড়া আদালত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বর্তমান সময়ে আইটি শিল্পে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের ফলে স্বামীর চাকরিই বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।
আদালতে স্বামীর আইনজীবী দাবি করেন, অস্ট্রেলিয়ার সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় এবং বৃদ্ধ বাবা-মার দেখাশোনা করতে গিয়েই তার টানাটানি লেগে যায়।
আলোচিত এই মামলাটি পরিচালিত হচ্ছে হিন্দু বিবাহ আইনের ২৪ নম্বর ধারার অধীনে। এই ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো আর্থিকভাবে দুর্বল পক্ষকে সুরক্ষা দেওয়া। হিন্দু বিবাহ আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী, কেবল স্ত্রী নন, স্বামীও যদি উপার্জনহীন বা আর্থিকভাবে সক্ষম না হন, তবে তিনি কর্মক্ষম ও সচ্ছল স্ত্রীর কাছ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ দাবি করতে পারেন।
আইনে বলা আছে, আবেদনকারীর যদি নিজের ভরণপোষণ এবং মামলার খরচ চালানোর মতো ‘স্বাধীন ও পর্যাপ্ত আয়’ থাকে, তবে তিনি খোরপোশ পাওয়ার যোগ্য নন। আইনটি জীবনযাত্রার মান সমান করার কোনো বিলাসবহুল চুক্তি নয়, এটি কেবল জীবনধারণের আইনি অধিকার।