• ই-পেপার

কোরআনের যে আয়াত মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের ভয়াবহতা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের ভয়াবহতা
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মিকদাদ (রা.)- থেকে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, কিয়ামতের ময়দানে সূর্যকে সৃষ্টজীবের অনেক কাছাকাছি করা হবে, ফলে সূর্য ও সৃষ্টজীবের মধ্যে দূরত্ব হবে মাত্র এক মাইল। মিকদাদ (রা.)- থেকে রাবি সুলাইম ইবনে আমির বলেন, ওয়াল্লাহি! আমি জানি না, রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানে মাইল দ্বারা কোন মাইল উদ্দেশ্য নিয়েছেন! জমিনের দূরত্ব সমপরিমাণ মাইল, নাকি (সুরমাদানির) শলাকা, যার দ্বারা চোখে সুরমা লাগানো হয়, সেটা উদ্দেশ্য নিয়েছেন! (কেননা সেটাকেও মাইল বলা হয়)।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ নিজ-নিজ আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। সেদিন কারো ঘাম হবে পায়ের টাখনু পর্যন্ত। আবার কারো-কারো হাঁটু পর্যন্ত ঘাম হবে। আবার কারো ঘাম হবে নাক পর্যন্ত। এ কথা বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর মুখের দিকে ইশারা করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২০৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৮১৩)

শিক্ষা ও বিধান 
১. কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী : একদিন অবশ্যই কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে।
২. কিয়ামতের ভয়াবহতা : সেদিন সূর্য মানুষের খুব কাছে আনা হবে, যা কিয়ামতের কঠিন ও ভয়ংকর অবস্থার পরিচয় বহন করে।
৩. আমলের গুরুত্ব : মানুষের ঘাম তার আমল অনুযায়ী হবে। যার আমল যত খারাপ, তার কষ্টও তত বেশি হবে।
৪. ন্যায়বিচারের প্রমাণ : আল্লাহ তাআলা কারও প্রতি অবিচার করবেন না; প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে।
৫. নেক আমলের প্রতি উৎসাহ : সালাত, সিয়াম, জাকাত, সদকা, সৎকাজ ও আল্লাহভীতি মানুষের কিয়ামতের কষ্ট লাঘবের কারণ হতে পারে।
৬. গুনাহ থেকে সতর্কতা : পাপ ও অবাধ্যতা কিয়ামতের দিন মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেবে।
৭. আখিরাতমুখী জীবন গড়ার শিক্ষা : দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগে মগ্ন না হয়ে আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
৮. তাওবার গুরুত্ব : কিয়ামতের কঠিন দিনের আগে আন্তরিক তাওবা করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা জরুরি।
৯. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী : তিনি উম্মতকে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিস্থিতি জানিয়ে সতর্ক করেছেন, যাতে তারা নিজেদের সংশোধন করতে পারে।
১০. আল্লাহর রহমতের আশা : ভয়াবহ দিনের বর্ণনা মুমিনকে ভীত করার পাশাপাশি নেক আমল ও আল্লাহর রহমতের আশায় জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়।
 

জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভে পঠিতব্য মহামূল্যবান তিনটি দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভে পঠিতব্য মহামূল্যবান তিনটি দোয়া
সংগৃহীত ছবি

জ্ঞান মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি মানুষকে সাময়িক মর্যাদা দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান ও আল্লাহভীতি মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতেই সম্মানিত করে। ইসলামে ইলম অর্জনকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রথম যে ওহি নাজিল করেছেন, তার সূচনাই ছিল—‘পড়ো’। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চিন্তাশীলতার ধর্ম।

তবে জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আল্লাহর বিশেষ সাহায্য, তাওফিক ও বরকত। তাই কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যেগুলো নিয়মিত পাঠ করলে উপকারী জ্ঞান, সঠিক বুঝ এবং প্রজ্ঞা লাভ হয়। দোয়াগুলো হলো—

১. ইবরাহিম (আ.)-এর প্রজ্ঞা লাভের দোয়া

رَبِّ هَبۡ لِي حُكۡمًا وَأَلۡحِقۡنِي بِالصَّالِحِينَ

উচ্চারণ : রাব্বি হাবলি হুকমান ওয়া আলহিকনি বিস সালিহিন।
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮৩)

এই দোয়ায় হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে শুধু জ্ঞান নয়, বরং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রজ্ঞা এবং নেককারদের সঙ্গ লাভের আবেদন করেছেন। কারণ প্রকৃত জ্ঞান তখনই মূল্যবান হয়, যখন তা মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করে।

২. উপকারী জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া

اللَّهُمَّ انْفَعْنِي بِمَا عَلَّمْتَنِي، وَعَلِّمْنِي مَا يَنْفَعُنِي، وَزِدْنِي عِلْمًا، وَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ حَالِ أَهْلِ النَّارِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মানফাতানি বিমা আল্লামতানি, ওয়া আল্লিমনি মা ইয়ানফাউনি, ওয়া জিদনি ইলমা, ওয়া আউজু বিল্লাহি মিন হালি আহলিন নার।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা শিখিয়েছেন, তা দ্বারা আমাকে উপকৃত করুন। আমার জন্য যা উপকারী, তা আমাকে শিক্ষা দিন। আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন এবং আমি জাহান্নামিদের অবস্থা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৯৯)

এটি এমন একটি পরিপূর্ণ দোয়া, যেখানে উপকারী জ্ঞান, নতুন জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান বৃদ্ধি এবং আখিরাতের মুক্তি—সবকিছুরই আবেদন রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও এই দোয়া নিয়মিত করতেন।

৩. দ্বীনের গভীর জ্ঞান লাভের দোয়া

اللَّهُمَّ فَقِّهْنِي فِي الدِّينِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ফাক্কিহনি ফিদ দ্বীন।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন।’

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছোটবেলায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করতেন। একদিন তিনি নবীজি (সা.)-এর অজুর জন্য পানি প্রস্তুত করে রাখলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জন্য এই দোয়া করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৩)
এই দোয়ার বরকতেই ইবনে আব্বাস (রা.) পরবর্তীকালে ‘হিবরুল উম্মাহ’ (উম্মতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত) ও ‘তারজুমানুল কোরআন নামে খ্যাত হন।

আমাদের করণীয়
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক, আলেম কিংবা সাধারণ মুসলিম—সবারই উচিত প্রতিদিন এই দোয়াগুলো পাঠ করা। বিশেষ করে পড়াশোনা শুরু করার আগে, পরীক্ষার পূর্বে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিংবা নতুন কিছু শেখার সূচনায় এসব দোয়া নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। মনে রাখতে হবে, জ্ঞান তখনই কল্যাণকর হয়, যখন তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, সত্যকে জানা এবং মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উপকারী জ্ঞান, বিশুদ্ধ প্রজ্ঞা এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

বাংলাদেশে আসছেন দেওবন্দের মোহতামিম  মুফতি আবুল কাসেম নোমানী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বাংলাদেশে আসছেন দেওবন্দের মোহতামিম  মুফতি আবুল কাসেম নোমানী
সংগৃহীত ছবি

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস, প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুফতি আবুল কাসেম নোমানী চার দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে বাংলাদেশে আসছেন। আগামী ৪ আগস্ট ২০২৬ (মঙ্গলবার) তিনি ঢাকায় পৌঁছাবেন। সফরকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত ইলমি সেমিনার, ইসলাহি মাহফিল, উলামায়ে কেরামের সমাবেশ ও বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করবেন।

বাংলাদেশে মুফতি আবুল কাসেম নোমানীর সফর বাস্তবায়ন কমিটির সিনিয়র সদস্য এবং খুলনা বিভাগীয় কওমি মাদরাসা পরিষদের মহাসচিব মাওলানা নাসীরুল্লাহ সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের আলেম-ওলামা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে এ সফরকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ বিরাজ করছে।

একনজরে চার দিনের সফরসূচি

৪ আগস্ট ২০২৬ (মঙ্গলবার)
মুফতি আবুল কাসেম নোমানী ভারতের দিল্লি থেকে ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সেখান থেকে তিনি রাজধানীতে অবস্থান করবেন। রাতে তিনি মুফতি জহিরুল ইসলাম সাহেবের বাসভবনে অবস্থান করবেন।

৫ আগস্ট ২০২৬ (বুধবার)
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রাজধানীর ফার্মগেটের খামারবাড়িস্থ কেআইবি কমপ্লেক্সে ‘মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ইলমি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান প্রদান করবেন।

দুপুরে তিনি জামিয়া হুসাইনিয়া ইসলামিয়া, আরজাবাদ (মিরপুর)-এ মধ্যাহ্নভোজ ও বিশ্রাম গ্রহণ করবেন। এরপর বিকেল ৩টায় একই প্রতিষ্ঠানে উলামায়ে কেরামের উদ্দেশে বিশেষ নসিহত পেশ করবেন।

বাদ মাগরিব রাজধানীর মারকাজুল ফিকরিল ইসলামী, বসুন্ধরায় অনুষ্ঠিত ইসলাহি মাহফিলে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেবেন।

৬ আগস্ট ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)
সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারযোগে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হবেন। পরে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে বগুড়া থেকে পিরোজপুরে যাবেন।

পিরোজপুরের আশরাফুল মাদারিস-এ মধ্যাহ্নভোজ ও বিশ্রামের পর কাবলাল আসর অনুষ্ঠিত ‘তাহাফফুজে ফিকরে আকাবির’ শীর্ষক বিশাল সমাবেশে প্রধান বয়ান প্রদান করবেন।

বাদ আসর তিনি পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসবেন। রাতে উত্তরায় উলামা ও আইম্মা কাউন্সিল আয়োজিত ‘দেওবন্দের ঐতিহ্য ও খিদমত’ শীর্ষক কনফারেন্সে নসিহতমূলক বক্তব্য দেবেন। সেদিনও তিনি মুফতি জহিরুল ইসলাম সাহেবের বাসভবনে অবস্থান করবেন।

৭ আগস্ট ২০২৬ (শুক্রবার)
সফরের শেষ দিনে তিনি রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ আদায় করবেন এবং মুসল্লিদের উদ্দেশে বয়ান প্রদান করবেন।

এরপর বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকাকে বিদায় জানিয়ে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হবেন।

মুফতি আবুল কাসেম নোমানী সমকালীন ইসলামী বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আলেম ও হাদিসবিশারদ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস হিসেবে ইলমে দ্বিন, ফতোয়া, তালিম-তারবিয়াত এবং উম্মাহর দিকনির্দেশনামূলক খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। তাঁর বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে দেশের কওমি অঙ্গন, আলেমসমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, তাঁর এ সফর দেশের দ্বীনি শিক্ষা, ইলমি চর্চা এবং ইসলাহি কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সরকারি জমিতে মসজিদ নির্মাণ প্রসঙ্গে ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
সরকারি জমিতে মসজিদ নির্মাণ প্রসঙ্গে ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

মসজিদ আল্লাহর ঘর। পৃথিবীর বুকে সর্বাধিক সম্মানিত স্থানগুলোর একটি হলো মসজিদ। এখানে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করে, কোরআনের শিক্ষা গ্রহণ করে এবং দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাই মসজিদ নির্মাণ ইসলামের অন্যতম মহৎ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদ নির্মাণকারীর জন্য জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে ইসলাম যেমন মসজিদ নির্মাণকে উৎসাহিত করেছে, তেমনি অন্যের সম্পদের অধিকার সংরক্ষণকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই সরকারি (খাস) জমিতে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি।

ইসলামে অন্যের সম্পদের অধিকার
ইসলামে মানুষের সম্পদ, জমি ও মালিকানার অধিকার অত্যন্ত পবিত্র। কারো অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ ব্যবহার করা কিংবা দখল করা হারাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে তা বৈধ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

তাই মালিকের সন্তুষ্টি ও বৈধ অনুমতি ছাড়া কারো সম্পদ ব্যবহার করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন, ‘সাবধান! তোমরা কারো ওপর জুলুম করো না। সাবধান! কোনো ব্যক্তির সন্তুষ্টি ব্যতীত তার সম্পদ অন্য কারো জন্য হালাল নয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২০৬৯৫)
এ হাদিস স্পষ্ট করে যে, মানুষের সম্পদের ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি হলো—মালিকের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি।

মসজিদ নির্মাণের ফজিলত
মসজিদ নির্মাণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর মসজিদ তো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর নির্মাণ করবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৫০)
তবে এই ফজিলত তখনই অর্জিত হবে, যখন মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমও শরিয়তসম্মত হবে।

সরকারি (খাস) জমির শরয়ি বিধান
সরকারি বা খাস জমি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনসাধারণের সম্পদ, যা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকে। তাই সংশ্লিষ্ট বৈধ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের জমি দখল বা ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত নয়। ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো, ‘অন্যের সম্পদে তার অনুমতি বা বৈধ কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বৈধ নয়।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৯/২৯১)

আরো বলা হয়েছে, ‘কারো জন্য অন্যের মালিকানাধীন সম্পদে তার অনুমতি, প্রতিনিধিত্ব বা বৈধ অভিভাবকত্ব ছাড়া হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়।’ (শারহু মাজাল্লাতিল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ১/২৬২)

সরকারি জমিতে অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণের হুকুম
যদি সরকারি জমিতে সরকারের বৈধ অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তাহলে অধিকাংশ সমকালীন ফকিহের ব্যাখ্যায় সেটি শরঈ ওয়াক্ফকৃত পূর্ণাঙ্গ মসজিদের মর্যাদা লাভ করে না; বরং সেটি সাধারণ নামাজ আদায়ের স্থান (মুসাল্লা/নামাজঘর) হিসেবে বিবেচিত হয়, যতক্ষণ না বৈধ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন প্রদান করে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কারণ, ওয়াক্ফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ওয়াক্ফকারীর বৈধ মালিকানা বা বৈধ কর্তৃত্ব থাকা জরুরি। ইমাম ইবনু নুজাইম (রহ.) বলেন, ‘ওয়াক্ফ শুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো ওয়াকফের সময় সম্পদের বৈধ মালিকানা থাকা।’ (আল-বাহরুর রায়িক, ৫/১৮৮)

যদি পরে সরকার অনুমতি দেয়
যদি পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ বৈধভাবে জমিটি মসজিদের জন্য বরাদ্দ বা অনুমোদন প্রদান করে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তাহলে সেই স্থান শরঈ মসজিদের মর্যাদা লাভ করবে। কিন্তু—কোনো নিম্নপদস্থ কর্মচারীর ব্যক্তিগত মৌখিক সম্মতি, অবৈধ প্রভাব খাটানো, ঘুস দিয়ে বরাদ্দ নেওয়া এসব কোনোভাবেই শরিয়তসম্মত বৈধ অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে না।

যদি অনুমতি না পাওয়া যায়
যদি সরকার বা বৈধ কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দেয়, তাহলে মুসল্লিদের উচিত সেই নামাজঘর অন্য বৈধ স্থানে স্থানান্তর করে নতুনভাবে মসজিদ নির্মাণ করা। মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও তা কখনো অন্যের হক নষ্ট করে বাস্তবায়ন করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

সেখানে আদায় করা নামাজের হুকুম
ফিকহবিদদের মতে, দখলকৃত বা গাসবকৃত জমিতে নামাজ আদায় করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়, কারণ জমিটি পবিত্র; তবে জমি দখল করা আলাদা গুনাহ। এ প্রসঙ্গে ফিকহের গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে, ‘গাসবকৃত জমিতে নামাজ শুদ্ধ হয়; কারণ জমিটি পবিত্র। তবে দখল করা পৃথক গুনাহের বিষয়।’ অতএব, পূর্বে সেখানে যে নামাজ আদায় করা হয়েছে, তা পুনরায় (কাজা) পড়তে হবে না। তবে জমির মালিকানার বিষয়টি শরিয়তসম্মতভাবে সমাধান করা অপরিহার্য।

করণীয় হলো
১. মসজিদ নির্মাণের আগে জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে।
২. সরকারি জমি হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদন নিতে হবে।
৩. কোনোভাবেই জবরদখল, প্রভাব খাটানো বা ঘুসের মাধ্যমে জমি নেওয়া বৈধ নয়।
৪. বৈধ অনুমতি না পেলে অন্য বৈধ স্থানে মসজিদ নির্মাণ করতে হবে।
৫. ইসলামে উদ্দেশ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই উদ্দেশ্য অর্জনের মাধ্যমও বৈধ হওয়া আবশ্যক।

মসজিদ নির্মাণ ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেক আমল। কিন্তু ইসলাম কখনো এমন শিক্ষা দেয় না যে, একটি নেক কাজ সম্পাদনের জন্য অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে। সরকারি জমিও একটি আমানত, যার তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্র। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমতি ছাড়া সেখানে মসজিদ নির্মাণ শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক পদ্ধতি নয়। (তথ্যসূত্র : ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ২১/৩৩১–৩৩৭)