মসজিদ আল্লাহর ঘর। পৃথিবীর বুকে সর্বাধিক সম্মানিত স্থানগুলোর একটি হলো মসজিদ। এখানে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করে, কোরআনের শিক্ষা গ্রহণ করে এবং দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাই মসজিদ নির্মাণ ইসলামের অন্যতম মহৎ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদ নির্মাণকারীর জন্য জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে ইসলাম যেমন মসজিদ নির্মাণকে উৎসাহিত করেছে, তেমনি অন্যের সম্পদের অধিকার সংরক্ষণকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই সরকারি (খাস) জমিতে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি।
ইসলামে অন্যের সম্পদের অধিকার
ইসলামে মানুষের সম্পদ, জমি ও মালিকানার অধিকার অত্যন্ত পবিত্র। কারো অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ ব্যবহার করা কিংবা দখল করা হারাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে তা বৈধ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
তাই মালিকের সন্তুষ্টি ও বৈধ অনুমতি ছাড়া কারো সম্পদ ব্যবহার করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন, ‘সাবধান! তোমরা কারো ওপর জুলুম করো না। সাবধান! কোনো ব্যক্তির সন্তুষ্টি ব্যতীত তার সম্পদ অন্য কারো জন্য হালাল নয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২০৬৯৫)
এ হাদিস স্পষ্ট করে যে, মানুষের সম্পদের ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি হলো—মালিকের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি।
মসজিদ নির্মাণের ফজিলত
মসজিদ নির্মাণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর মসজিদ তো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর নির্মাণ করবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৫০)
তবে এই ফজিলত তখনই অর্জিত হবে, যখন মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমও শরিয়তসম্মত হবে।
সরকারি (খাস) জমির শরয়ি বিধান
সরকারি বা খাস জমি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনসাধারণের সম্পদ, যা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকে। তাই সংশ্লিষ্ট বৈধ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের জমি দখল বা ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত নয়। ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো, ‘অন্যের সম্পদে তার অনুমতি বা বৈধ কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বৈধ নয়।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৯/২৯১)
আরো বলা হয়েছে, ‘কারো জন্য অন্যের মালিকানাধীন সম্পদে তার অনুমতি, প্রতিনিধিত্ব বা বৈধ অভিভাবকত্ব ছাড়া হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়।’ (শারহু মাজাল্লাতিল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ১/২৬২)
সরকারি জমিতে অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণের হুকুম
যদি সরকারি জমিতে সরকারের বৈধ অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তাহলে অধিকাংশ সমকালীন ফকিহের ব্যাখ্যায় সেটি শরঈ ওয়াক্ফকৃত পূর্ণাঙ্গ মসজিদের মর্যাদা লাভ করে না; বরং সেটি সাধারণ নামাজ আদায়ের স্থান (মুসাল্লা/নামাজঘর) হিসেবে বিবেচিত হয়, যতক্ষণ না বৈধ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন প্রদান করে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কারণ, ওয়াক্ফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ওয়াক্ফকারীর বৈধ মালিকানা বা বৈধ কর্তৃত্ব থাকা জরুরি। ইমাম ইবনু নুজাইম (রহ.) বলেন, ‘ওয়াক্ফ শুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো ওয়াকফের সময় সম্পদের বৈধ মালিকানা থাকা।’ (আল-বাহরুর রায়িক, ৫/১৮৮)
যদি পরে সরকার অনুমতি দেয়
যদি পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ বৈধভাবে জমিটি মসজিদের জন্য বরাদ্দ বা অনুমোদন প্রদান করে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তাহলে সেই স্থান শরঈ মসজিদের মর্যাদা লাভ করবে। কিন্তু—কোনো নিম্নপদস্থ কর্মচারীর ব্যক্তিগত মৌখিক সম্মতি, অবৈধ প্রভাব খাটানো, ঘুস দিয়ে বরাদ্দ নেওয়া এসব কোনোভাবেই শরিয়তসম্মত বৈধ অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে না।
যদি অনুমতি না পাওয়া যায়
যদি সরকার বা বৈধ কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দেয়, তাহলে মুসল্লিদের উচিত সেই নামাজঘর অন্য বৈধ স্থানে স্থানান্তর করে নতুনভাবে মসজিদ নির্মাণ করা। মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও তা কখনো অন্যের হক নষ্ট করে বাস্তবায়ন করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
সেখানে আদায় করা নামাজের হুকুম
ফিকহবিদদের মতে, দখলকৃত বা গাসবকৃত জমিতে নামাজ আদায় করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়, কারণ জমিটি পবিত্র; তবে জমি দখল করা আলাদা গুনাহ। এ প্রসঙ্গে ফিকহের গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে, ‘গাসবকৃত জমিতে নামাজ শুদ্ধ হয়; কারণ জমিটি পবিত্র। তবে দখল করা পৃথক গুনাহের বিষয়।’ অতএব, পূর্বে সেখানে যে নামাজ আদায় করা হয়েছে, তা পুনরায় (কাজা) পড়তে হবে না। তবে জমির মালিকানার বিষয়টি শরিয়তসম্মতভাবে সমাধান করা অপরিহার্য।
করণীয় হলো
১. মসজিদ নির্মাণের আগে জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে।
২. সরকারি জমি হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদন নিতে হবে।
৩. কোনোভাবেই জবরদখল, প্রভাব খাটানো বা ঘুসের মাধ্যমে জমি নেওয়া বৈধ নয়।
৪. বৈধ অনুমতি না পেলে অন্য বৈধ স্থানে মসজিদ নির্মাণ করতে হবে।
৫. ইসলামে উদ্দেশ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই উদ্দেশ্য অর্জনের মাধ্যমও বৈধ হওয়া আবশ্যক।
মসজিদ নির্মাণ ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেক আমল। কিন্তু ইসলাম কখনো এমন শিক্ষা দেয় না যে, একটি নেক কাজ সম্পাদনের জন্য অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে। সরকারি জমিও একটি আমানত, যার তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্র। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমতি ছাড়া সেখানে মসজিদ নির্মাণ শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক পদ্ধতি নয়। (তথ্যসূত্র : ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ২১/৩৩১–৩৩৭)