প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গণিত পুরস্কার ‘ফিল্ডস মেডেল’ জিতেছেন দুই চীনা গণিতবিদ। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চীনের হং ওয়াং ও ইউ দেং ২০২৬ সালের ফিল্ডস মেডেল পেয়েছেন। তাদের সঙ্গে আরো দুই গবেষক—যুক্তরাষ্ট্রের জন পার্ডন এবং কানাডার জ্যাকন সিমারম্যান—এই পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।
চারজন বিজয়ীর প্রত্যেককে ১৫ হাজার কানাডীয় ডলার (প্রায় ১০ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার) পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গণিতবিদদের সামনে থাকা দুটি জটিল সমস্যার সমাধান করায় হং ওয়াং ও ইউ দেং এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী হং ওয়াং ফিল্ডস মেডেল পাওয়া ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় নারী গণিতবিদ। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। গণিতের সবচেয়ে বড় সম্মান হিসেবে পরিচিত ফিল্ডস মেডেল এমন এক সময়ে দেওয়া হলো, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের গণনাভিত্তিক অনেক কাজ দ্রুত পরিবর্তন করে দিচ্ছে।
আরো পড়ুন
স্পেন ও ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল : দেড় লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
এই অর্জনের খবর প্রকাশের পর চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ‘ফিল্ডস মেডেল’ এবং ‘ফিল্ডস মেডেল জয়ী প্রথম চীনা গণিতবিদ’—এই দুটি হ্যাশট্যাগ ওয়েইবো, রেডনোটসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে। ওয়েইবোর একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এটি সব চীনা মানুষের গর্ব।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘আমরা ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছি।’ চীনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও দুই গণিতবিদকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে তাদের শিক্ষাজীবন, গবেষণা, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং এই অর্জনের মাধ্যমে দেশের জন্য কী ধরনের গুরুত্ব তৈরি হয়েছে, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। চীনা বংশোদ্ভূত প্রথম ফিল্ডস মেডেলজয়ী গণিতবিদ শিং-টুং ইয়াউ বলেন, ‘চীনের গণিত সমাজের জন্য এটি এমন একটি স্বপ্ন, যা আমরা কয়েক দশক ধরে বাস্তব হতে চেয়েছি।’
হং ওয়াং তার সহকর্মী জশ জালের সঙ্গে মিলে ১৯১৭ সালে জাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকেয়া উত্থাপন করা একটি বিখ্যাত সমস্যার সমাধান করেন। সমস্যাটি ছিল—একটি পেনসিলকে একবার সম্পূর্ণ ঘোরাতে হলে সবচেয়ে কম কতটুকু জায়গা প্রয়োজন? ওয়াং ও জাল এই সমস্যাটি নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেন। তারা ধরে নেন, পেনসিলটি সমতল জায়গায় নয়, বরং ত্রিমাত্রিক স্থানে ভাসছে। এই ধারণার ভিত্তিতে তারা সমস্যাটির সমাধান করেন এবং গত বছর তাদের গবেষণা প্রকাশ করেন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে হং ওয়াং বলেন, ‘এই ধারণাটি মানুষকে আকর্ষণ করে, কারণ একই ধরনের বিষয় একেবারে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের সমস্যার মধ্যেও দেখা যায়।’ হং ওয়াং মূলত হারমোনিক বিশ্লেষণ নিয়ে গবেষণা করেন। গণিতের এই শাখায় তরঙ্গের চলাচল ও তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করা হয়।
আরো পড়ুন
জার্মানির কোচ হয়েই কেন পদত্যাগের হুংকার ক্লপের
৩৭ বছর বয়সী গণিতবিদ ইউ দেংও আরেকটি শতবর্ষী সমস্যার সমাধানের জন্য ফিল্ডস মেডেল পেয়েছেন। ১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন, যা পরে ‘হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যা’ নামে পরিচিত হয়। এই সমস্যার মূল প্রশ্ন ছিল—অসংখ্য আলাদা কণার চলাচল থেকে কিভাবে পুরো একটি ব্যবস্থার আচরণ ব্যাখ্যা করা বা হিসাব করা সম্ভব। ইউ দেং গ্যাসের আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করেন। পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘যেসব মহান গণিতবিদকে আমি সব সময় শ্রদ্ধা করেছি, তাদের নামের পাশে আমার নাম যুক্ত হওয়া সত্যিই অনেক বড় সম্মানের।’ বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ফিল্ডস মেডেলকে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার হিসেবে ধরা হয়। এটি প্রতি চার বছর পরপর ৪০ বছরের কম বয়সী অসাধারণ গণিতবিদদের দেওয়া হয়। নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।
হং ওয়াং ১৯৯১ সালে দক্ষিণ চীনের গুয়াংশি অঞ্চলের গুইলিন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি একসঙ্গে দুটি শ্রেণি পাস করেন। পরে মাত্র ১৬ বছর বয়সে চীনের মর্যাদাপূর্ণ পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রথমে তিনি পৃথিবীবিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও এক বছর পর গণিত বিভাগে চলে যান। স্নাতক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে যান। সেখানে প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয় ও একোল পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। একই সঙ্গে ফ্রান্সের ইনস্টিটিউ দে ওত এতুদ সিয়ঁতিফিক (আইএইচইএস)-এর স্থায়ী অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
আরো পড়ুন
আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হতে ফিলিপাইনের সমর্থন চাইল বাংলাদেশ
ফিল্ডস মেডেল পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাখোঁ বলেন, ‘তিনি আমাদের গবেষণা ও শিক্ষাব্যবস্থার উৎকর্ষের প্রতীক।’ আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বিজ্ঞানের জন্য ফ্রান্সকে বেছে নিন।’ অন্যদিকে ইউ দেং ছোটবেলা থেকেই গণিত অলিম্পিয়াড ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। ২০০৭ সালে তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে দুই বছর পর তিনি এমআইটিতে চলে যান। এরপর প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।