শ্রীলঙ্কার একটি কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ব্যক্তিগতভাবে দায় স্বীকার করেছেন দেশটির আইনমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা। তিনি বলেছেন, এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশটির সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই দাঙ্গা ঘটেছে রাজধানী কলম্বোর উত্তরে উপকূলীয় শহর নেগোম্বোর একটি কারাগারে। সেখানে দুই দিন ধরে চলা সহিংসতায় বন্দি ও কারারক্ষীসহ ১০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। রবিবার কারাগারের ভেতরে বন্দিদের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের মাধ্যমে অস্থিরতা শুরু হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই দুই গোষ্ঠীর সঙ্গে কারাগারের ভেতরে মাদক পাচারের যোগসূত্র ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাগারের ভেতরে মাদক চক্রের তথ্য ফাঁস করা এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয়। পরে সেই বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়। সোমবার সকালে বন্দিদের খাবার দেওয়ার সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আরো বাইরে চলে যায়। কয়েকজন বন্দি কারাগারের বিভিন্ন অংশে ঢুকে পড়েন। তারা কারাগারের হাসপাতালেও প্রবেশ করেন এবং ওষুধ লুট করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন ধাতব জিনিস অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
কয়েকজন বন্দি কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করেন বলেও জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে গুলির শব্দ শোনা যায় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ, কাটা জখম এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের প্রথমে নেগোম্বো হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে গুরুতর আহত প্রায় ২০ জনকে কলম্বোর জাতীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কারাগারের গণমাধ্যম মুখপাত্র এ সি গজনায়াকে জানান, নিহতদের মধ্যে সাতজন কারারক্ষী এবং ১৯ জন বন্দি ছিলেন। তবে অন্যান্য সরকারি তথ্যেও নিহতের সংখ্যা ২৬ বলে জানানো হয়েছে। ঘটনার পর নেগোম্বো কারাগারের বাইরে স্বজনদের ভিড় জমে যায়। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ভেতরে থাকা স্বজনদের খোঁজ জানতে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেন। কেউ কেউ ঘটনার ব্যাখ্যা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বর্তমান অবস্থা জানতে দাবি জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ, বিশেষ টাস্ক ফোর্স, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ ইউনিট, সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। কারাগারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোনও ব্যবহার করা হয়।
আইনমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কোনো ধরনের প্রাণহানিই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, 'আমরা গভীরভাবে হতবাক। চারদিকে গভীর শোক ও মানসিক আঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। এটি আমাদের কর্মীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই ঘটনা বন্দি ও কর্মী- উভয়ের সঙ্গেই জড়িত। মানুষের প্রাণহানি অত্যন্ত বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।' নানায়াক্কারা বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, কোথায় ভুল হয়েছে, কার দায় ছিল এবং কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো- সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরো বলেন, 'যেহেতু এই ঘটনা ঘটেছে, তাই আমাদের ঘটনাস্থলে যেতে হবে। বিস্তারিত তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত ঘটনা জানতে হবে। এরপর নিশ্চিত করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে এমন কিছু আর না ঘটে। আমরা কারও ভুল ঢাকতে বা কাউকে রক্ষা করতে চাই না।' আইনমন্ত্রী বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কারা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। তাই এই ঘটনার দায় নিজের ওপরও নিতে হবে। তিনি বলেন, 'আইনমন্ত্রী হিসেবে এই প্রতিষ্ঠান আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই এই দায়িত্ব আমাকে স্বীকার করতেই হবে।' তবে তিনি জানান, শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ঘটনার পেছনে থাকা কারণ, দায়ী ব্যক্তি এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা খুঁজে বের করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারাগারের মুখপাত্র এ সি গজনায়াকে জানান, সংঘর্ষের কারণ জানতে বিশেষ তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও আলাদা তদন্ত চলছে। কারা বিভাগের মহাপরিচালক এ ঘটনার জন্য একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করেছেন। নেগোম্বো কারাগারের এই দাঙ্গা শ্রীলঙ্কার দীর্ঘদিনের কারা সংকটকে আবার সামনে এনেছে। দেশটির কারাগারগুলোতে অতিরিক্ত বন্দি, মাদক চক্রের প্রভাব এবং জনবলের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়েছে। শ্রীলঙ্কার কারাগার ব্যবস্থায় ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি বন্দি রয়েছে। দেশটির কারাগারগুলোতে প্রায় ১০ হাজার বন্দি রাখার ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে সেখানে ৩৯ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই এই বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটল।
এর আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার একটি কারাগারে দাঙ্গায় ১১ জন নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনায় অভিযোগ ওঠে, অতিরিক্ত ভিড় থাকা কারাগারে মহামারি পরিস্থিতি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কারারক্ষীরা গুলি চালিয়েছিলেন।





