ইরানের সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষায়, ইরানের সাধারণ মানুষ একটি দমনমূলক শাসনের অধীনে বসবাস করছে।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের জনগণ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, কারণ তারা কঠোর দমন-পীড়ন ও অস্ত্রধারী নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ে থাকে।
ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসে প্রচারিত এক ফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইরানি জনগণের প্রতি আমার বার্তা হলো, তারা ভীত। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু অন্য পক্ষের হাতে অস্ত্র আছে। তারা সমাবেশ করলে গুলিবিদ্ধ হয়।’
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সরকার ইয়েমেন, ইরাক, লেবানন ও সিরিয়ায় তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তারা বলে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। এসব হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইরানের দাবি, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরো বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছেন, যার মধ্যে খার্গ দ্বীপ ও এর তেল স্থাপনা দখলের কথাও ছিল। অন্যদিকে তিনি আলোচনার জন্যও সময় দিয়েছেন।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবার তিনি সত্যিই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চান, যাতে চলমান সংঘাত কমানো বা বন্ধ করা যায়। তিনি বলেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ও স্থান শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।’ সম্ভাব্য স্থান হিসেবে তিনি ইউরোপের কথা উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প আরো দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অনুমোদনও পেয়েছে। এ কারণে তিনি ওই রাতে ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা ও বোমাবর্ষণ স্থগিত করেছেন।
ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের পর শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা যায় এবং তেলের দাম কমে যায়। তবে শুক্রবার ইরান জানায়, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি করেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই একটি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।
ইরানি জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় ট্রাম্প বলেন, তিনি সেতু, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা এড়াতে চান, কারণ এতে সাধারণ মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ব্রায়ান কিলমিডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাইলে এক মিনিটের মধ্যেই তা করতে পারি। কিন্তু আমি তা করতে চাই না, কারণ একবার এমন হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বে।’
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক দফা হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে, যার ফলে অঞ্চলটি তেল বিক্রি থেকে বিপুল আয় হারিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা অগ্রগতি না হলে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে ইরান কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। একই সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে পর্দার আড়ালেও আলোচনা চলেছে।
ইরানের সরকার ও জনগণের মধ্যে পার্থক্য
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ইরানের সরকার ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি এর আগেও বলেছিলেন, যদি ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, তবে তা দেশটির জনগণের অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে হতে পারে, সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর আগে এ ধরনের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
ট্রাম্পের সমালোচক এবং কিছু ইরানি বিরোধী নেতা মনে করেন, অবকাঠামোতে হামলার পরিবর্তে ইরানের শাসকগোষ্ঠী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরো সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
কেউ কেউ সাধারণ নাগরিকদের সহায়তা বা অস্ত্র দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন। তবে আলোচনা চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা ও অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অন্য সমালোচকরা।
এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করেছে।
এসব জাহাজে বহন করা অপরিশোধিত তেলের মূল্য ছিল প্রায় ৭.৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার। তার দাবি, এই অভিযানের মাধ্যমে জাহাজগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য বাধা এড়িয়ে যেতে সহায়তা করা হয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার পরিবহন
ট্রাম্প দাবি করেছেন, গোপন এক মার্কিন অভিযানে ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রণালি দিয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানি রাডার সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করা হয়। এরপর মার্কিন সামরিক বাহিনী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো আলো ছাড়াই গভীর রাতে ট্যাংকার ট্রানজিট সমর্থন করেছিল।
ট্রাম্প বিশেষভাবে এমন একটি অভিযানের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ২২টি তেলবাহী জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করা হয়েছিল। তার দাবি, এই প্রচেষ্টার ফলে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তার মতে, তেলের দাম যেখানে প্রতি ব্যারেল ২৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারত, সেখানে তা প্রায় ৮৫ ডলারে সীমাবদ্ধ ছিল।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির স্বাধীন কোনো যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (পেন্টাগন) ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে এসব তথ্য বা সংখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করেননি।