মাত্র ৩২ সেকেন্ডের একটি ফ্লাইট বদলে দিয়েছে ভারতের এভিয়েশন খাতকে। শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বের এভিয়েশন খাতেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-১৭১ ফ্লাইটের ৩২ সেকেন্ডের উড়ান।
ঠিক এক বছর আগে ভারতের আহমেদাবাদের সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশে ফ্লাই করার ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে পাশের বিজে মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল ও ক্যান্টিনের ওপর আছড়ে পড়েছিল। একজন যাত্রী ছাড়া পাইলট, যাত্রী, ক্রুসহ বিমানের ২৪১ জন, আর যেখানে আছড়ে পড়েছিল সেখানকার ১৯ জনসহ মোট ২৬০ জন মানুষ প্রাণ দিয়েছিল সেদিন।
দূরের অনেকের মনে হয়তো স্মৃতির ধুলার আস্তর জমেছে। কিন্তু ২৬০টি পরিবার এখনো দিন কাটায় স্বজন হারানোর সেই দগদগে ক্ষত নিয়ে। সিতাবেন পাটানি ঠেলাগাড়িতে একটি ভ্রাম্যমাণ চায়ের স্টল চালাতেন। তার ১৫ বছরের কিশোর ছেলে আকাশ পাটানি মায়ের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছিল। ঠিক তখনই তাদের মাথায় আকাশ মানে ড্রিমলাইনার ৭৮৭ এয়ারক্র্যাফটটি ভেঙে পড়েছিল। কিশোর আকাশ আকাশের তারা হয়ে যায়। আর সিতাবেন শরীরে থার্ড ডিগ্রি বার্ন নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন হাসপাতালে। নিজে যন্ত্রণায় কাতর হলেও বারবার সন্তানের খবর নিচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে তখন সত্যিটা জানানো হয়নি।
প্রিয় নাতি আকাশের মৃত্যু শোক সইতে না পেরে ২০ দিন পর মারা যান তার দাদা বাবুভাই পাটানি। সন্তানের মৃত্যু, হাসপাতালে স্ত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, পিতার মৃত্যু এলোমেলো করে দেয় অটোরিকশাচালক সুরেশভাই পাটানির জীবন। এত দুঃখ বুকে চাপা দিয়ে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। অসুস্থ শরীরে সিতাবেন শোকের এই ধাক্কা নিতে পারবেন না ভেবে তাকে কিছু জানানোই হয়নি। ছেলের মৃত্যুর এক মাস পর সিতাবেন জানতে পেরেছিলেন। ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে না পারার বেদনা এখনো তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। প্রতিদিন ছেলের কথা ভেবে চোখের জল ফেলেন।
কাঁদতে কাঁদতেই সাংবাদিকদের বললেন, ‘আমি শেষবারের মতো ছেলেটাকে দেখতেও পারিনি। আমার স্মৃতিগুলো ১২ জুনেই থমকে গেছে, যখন আকাশ বেঁচে ছিল। এরপর থেকে আমার স্মৃতি আর সামনে এগোয়নি এবং আমি মনে করি না কোনোদিন এগোবে।’
সিতাবেনের মতো ২৬০টি পরিবারেই নিত্যদিনের হাহাকার। সরকারের ক্ষতিপূরণে আর্থিক সংকট মিটলেও প্রিয়জনের বিনিময় টাকায় হয় না কখনো।
এআই-১৭১ দুর্ঘটনার পর ভারতের দ্রুত বড় হতে থাকা এভিয়েশন খাত বড় ধাক্কা খায়। এয়ারলাইনস কম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম পড়ে যায়। তবে ২৬০ জন মানুষ জীবন দিয়ে ভারতের এভিয়েশন খাতের বড় উপকারও করে গেছেন। লোভের গ্রাস থেকে বেরিয়ে এয়ারলাইনস মালিকরা নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, সতর্কতা আরো নিখুঁত হয়েছে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সত্যিকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ‘সেফটি ফার্স্ট’ যেন কথার কথা না হয়, সেই চেষ্টাও আছে। তবে ৩২ সেকেন্ডের একটি ফ্লাইটের দুর্ঘটনার তদন্ত একবছরেও শেষ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ অনেকেই।
এআই-১৭১ ফ্লাইটটি আছড়ে পড়েছিল বিমানবন্দরের পাশের বিজে মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ও ক্যান্টিনের ওপর। তারপর থেকে ভবন দুটি পরিত্যক্ত, যেন অভিশপ্ত কোনো ভৌতিক বাড়ি। তবে দুর্ঘটনার এক বছর পর সেই পরিত্যক্ত ছাত্রাবাস ও ক্যান্টিন নিয়ে দারুণ এক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করলেন গুজরাটের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল পানসারিয়া।
নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি দুর্ঘটনার ক্ষত সারিয়ে সেখানেই সম্ভাবনার ফুল ফোটানোর ঘোষণা দিলেন। ৫৪৭ কোটি টাকা খরচ করে পুনর্নির্মাণ করা হবে বিজে মেডিক্যাল কলেজের ক্যাম্পাস।
তিনি বলেন, ‘বিজে মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার হাব হিসাবে গড়ে তোলা হবে, যা মেডিক্যাল পড়ুয়াদের নতুন আশা দেবে।’ ভাঙা ও পোড়া ভবনগুলো সরিয়ে ফেলা হবে। ঠিক যে জায়গায় বিমানটি আছড়ে পড়েছিল, সেখানে প্যারাপ্লেগিয়া স্পাইন হাসপাতাল তৈরি হবে। এর পাশে রিহ্য়াবিলেশন সেন্টার, ফিজিওথেরাপি কলেজ ও হোস্টেল তৈরি করা হবে। ১ লাখ ৭১ হাজার ১০০ স্কয়ার মিটার জমিতে শিক্ষকদের জন্য ছয়টি কোয়ার্টার তৈরি করা হবে, যেখানে ১২০টি ফ্ল্যাট থাকবে। এছাড়া স্নাতক স্তরের পডুয়াদের জন্য দুটি হোস্টেল ব্লক তৈরি করা হবে, যেখানে ৩৬৪টি রুম থাকবে। স্নাতকোত্তর স্তরের বিবাহিত শিক্ষার্থীদের জন্য ১৬১টি ইউনিট বরাদ্দ থাকবে। এ ছাড়া মেস, ক্যান্টিন থাকবে। নতুন ক্যাম্পাসে গুজরাটের ফার্মাসিউটিক্যাল টেস্টিংয়ের জন্য বিশ্বমানের ফুড অ্যান্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরি তৈরি করা হবে।
বিজে হাসপাতালের নতুন ক্যাম্পাস আর মেডিক্যাল হাবেই হয়তো বেঁচে থাকবে ২৬০ জনের স্মৃতি। এই হাসপাতালে সেবাগ্রহীতারা ভালো সেবা পেলে নিশ্চয়ই শান্তি পাবে দুর্ঘটনায় নিহত ২৬০ জনের আত্মাও।




