তৃতীয় বিশ্বে অহরহ এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যাপারটা অভিনবই বটে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্পের কয়েক বিলিয়ন ডলারের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। আদালতে জমা দেওয়া এক নথিতে জ্বালানি বিভাগ এ কথা স্বীকার করেছে।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল সরকার এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকাকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে; যা সম্পূর্ণ বেআইনি, অসাংবিধানিক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতার অপব্যবহার।
ট্রাম্প প্রশাসন যখন পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অনুদান বাতিল করে, তখন ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার একদল গবেষক এর বিরুদ্ধে একটি যৌথ মামলা করেন। মামলায় মূল অভিযোগ ছিল, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব অনুদান বন্ধ করা হয়েছে। এই মামলারই অংশ হিসেবে গত ১৫ জুলাই জ্বালানি বিভাগ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক আইনি নথি আদালতে জমা দেওয়া হয়। সেখানে স্বীকার করা হয়, অনুদান বাতিলের সিদ্ধান্ত কোনো কাজের পারফরম্যান্স বা বাজেট কমানোর জন্য ছিল না; এটি নেওয়া হয়েছিল কেবলমাত্র রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে।
এই নথির ভিত্তিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট প্রকাশ করলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও হৈচৈ শুরু হয়। আদালতে জমা দেওয়া নথি বিশ্লেষণ করে রিপোর্টে বলা হয়, গত নির্বাচনে যেসব রাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস জিতেছিলেন এবং যেসব রাজ্যে দুজন সিনেটরই ডেমোক্র্যাট দলের; কেবল সেইসব ডেমোক্র্যাটশাসিত রাজ্যগুলোর কয়েক বিলিয়ন ডলারের ২৮৪টি প্রকল্পের অনুদান বাতিল করা হয়েছে। বিপরীতে, ট্রাম্প সমর্থিত রিপাবলিকানশাসিত রাজ্যগুলোর তহবিল বহাল রাখা হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিবেচনার অভ্যাস একেবারে নতুন নয়। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া এবং ডেমোক্র্যাট-শাসিত রাজ্যগুলোতে ফেডারেল অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ডেমোক্র্যাট-শাসিত ৫টি রাজ্যের সামাজিক সেবামূলক খাতের ১০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল স্থগিত করার চেষ্টা করেছিল। যদিও পরে তারা সেই প্রচেষ্টা থেকে সরে আসে। গত ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি বিভিন্ন রাজ্যের জন্য দীর্ঘকাল ধরে আটকে থাকা ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি দুর্যোগ সহায়তা তহবিল ছাড় করে। তবে এতে এমন কয়েকটি ডেমোক্র্যাট-শাসিত রাজ্যকে বাদ দেওয়া হয়, যাদের গভর্নরদের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ ছিল।
সিনেটের মাইনোরিটি লিডার ও ডেমোক্র্যাট সদস্য চাক শুমার আদালতে জ্বালানি বিভাগের স্বীকারোক্তিকে ‘নজিরবিহীন ট্রাম্পবাদ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এটি এমন একটি বিষয় যা আমাদের কখনোই স্বাভাবিকভাবে নেওয়া উচিত নয়। এক্স (সাবেক টুইটার)-এ শুমার লিখেছেন, ‘ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করছেন যে তিনি কঠোর পরিশ্রমী পরিবারগুলোর ওপর আঘাত হানছেন, যাতে তিনি সেইসব আমেরিকানদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারেন, যারা তাকে ভোট দেয়নি। এটি অত্যন্ত অসুস্থ ও বিকৃত মানসিকতা। তার অহংকার এতটাই ঠুনকো যে, সামান্য প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি এমন সব পরিবারকে শাস্তি দিচ্ছেন, যারা দুবেলা অন্নসংস্থানের জন্য এমনিতেই সংগ্রাম করছে।’
মেরিল্যান্ডের কংগ্রেস সদস্য জেমি রাস্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে আমেরিকার সঙ্গে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে উল্লেখ করেছেন এবং অবিলম্বে এই তহবিলগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এক্স-এ রাস্কিন লিখেছেন, ‘এই গণ-দলীয় প্রতিশোধমূলক আচরণ অত্যন্ত জঘন্য, আপত্তিকর, বিপজ্জনক, বেআইনি, অসাংবিধানিক, দেশদ্রোহী এবং এই প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি মস্ত বড় অপরাধ। ট্রাম্প জানতেন বাইডেন আমলের এই অনুদানগুলো আমেরিকান জনগণের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল; আর সেই কারণেই তিনি রেড স্টেট (রিপাবলিকান-শাসিত)-গুলোর অনুদান কাটেননি। কিন্তু ব্লু স্টেটগুলোর (ডেমোক্র্যাট শাসিত) অনুদান কেটে দিয়েছেন।’
উভয় কক্ষের বাজেট বরাদ্দকারী কমিটির দুই ডেমোক্র্যাট সদস্য ওহাইও-র রিপ্রেজেন্টেটিভ মার্সি ক্যাপ্টুর এবং ওয়াশিংটনের সিনেটর পটি মারে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এটি একটি বিস্ময়কর স্বীকারোক্তি যে প্রেসিডেন্ট এবং তার দল রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ভালো কর্মসংস্থান ধ্বংস করতে এবং কঠোর পরিশ্রমী পরিবারগুলোকে শাস্তি দিতে দুর্নীতিগ্রস্তভাবে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে, ফেডারেল সরকারকে এভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে আমেরিকা-বিরোধী।’




