মাত্র ৭০ দিন বয়সী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপি যা করে দেখিয়েছে, ৭০ বছরের অভিজ্ঞ সংগঠনের জন্যও তা অসম্ভব। নরেন্দ্র মোদির মতো অনমনীয় ব্যক্তিত্বকে আন্দোলনের মুখে নত করানো চাট্টিখানি কথা নয়। বলা যায়, রাজনীতির মাঠে ধামাকা অভিষেক হয়েছে সিজেপির। অভিজিত দীপকে এখন ভারতজুড়ে আলোচিত নাম।
প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর এখন প্রশ্ন হলো সিজেপির ভবিষ্যৎ কী? তারা কি তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে থাকবে, নাকি প্রচলিত ধারায় রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করবে? এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব মেলেনি। এই প্রশ্নে বরং কিছুটা কৌশলি সিজেপির নেতৃত্ব।
গত ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ভারতের বেকার যুবকদের ককরোচ বা তেলাপোকার সাথে তুলনা করলে পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অভিজিৎ দীপকে অনলাইনে অনেকটা ব্যঙ্গ করে ‘ম্যায় হু ককরোচ’ বলে ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপি গঠন করেন। নিট পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ৭ জুন দিল্লির যন্তর-মন্তরে প্রথম সমাবেশ করে সিজেপি। তারপর ঘুরেফিরে তারা যন্তর-মন্তরেই ছিল। সর্বশেষ টানা ৩৭ দিন যন্তর-মন্তরে তারা আন্দোলন চালিয়ে যায়।
গত ২৮ জুন অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক আমরণ অনশন শুরু করলে তাদের আন্দোলন নতুন গতি পায়। আর গত ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশি হামলার শিকার হলে সিজেপির আন্দোলন সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ও আলোচনার জন্ম দেয়। তার ৫ দিনের মাথায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সফল সমাপ্ত ঘটে আন্দোলনের।
অভিজিত দীপকেই সিজেপির মূল মুখ। তবে সংগঠনটির তিনজন মুখপাত্র ছিলেন সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা আর বিজেতা দাহিয়া। ২০ জুলাই তীব্র সংঘর্ষের দিনে প্রকাশ্যে বার্গার খেয়ে পদ হারান বিজেতা। তবে সৌরভ আর আশুতোষ সরকারের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা কৌশলি ছিলের দুই মুখপাত্র আশুতোশ ও সৌরভ।
আশুতোশ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মাথায় এখন একমাত্র চিন্তা হলো বাড়ি যাওয়া, ঘুমানো, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে দেখা করা। কয়েক মাস ধরে আমি বাড়ি থেকে দূরে আছি এবং আমি এখন সত্যিই শুধু বিশ্রাম নিতে চাই। গত দুই মাসে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে একটু ভাবার সুযোগ চাই। আমার মনে হয় এটি আমাদের সবার জন্যই এক আবেগঘন মুহূর্ত। এটি সত্যিই গর্ব করার মতো একটি মুহূর্ত, ভীষণ আনন্দিত এবং স্বস্তি পাওয়ার মতো মুহূর্ত। আর এরপর কী হয়, তা আমরা পরেই দেখব।'
রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আশুতোষ বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভারতে কোনো কিছুকেই কখনো না বলতে নেই।’ তবে সৌরভ দাস এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন আরো পরিষ্কারভাবে, ‘রাজনীতি এই মুহূর্তে আমাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নয়। বর্তমানে আমাদের ফোকাস খুব স্পষ্ট, এই আন্দোলনকে একদম তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। কারণ ইতিমধ্যেই দেশে ৭৫০ থেকে ৮০০টি রাজনৈতিক দল রয়েছে। তাদের কেউই তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে না। আর আমরা এই আন্দোলনকে তৃণমূল স্তরে নিয়ে যেতে চাই, যাতে ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতাই থাকুক না কেন, তারা যেন তরুণদের জন্য কাজ করতে এবং তাদের দাবিগুলো পূরণ করতে বাধ্য হয়। এই মুহূর্তে এটাই আমাদের একমাত্র এজেন্ডা।'
অভিজিৎ দীপকে অবশ্য সাফল্য উদযাপনে একটু আয়েশী। সাফল্যের পরদিন রবিবার তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘এরপর কী করতে হবে বা সন্ধ্যা পর্যন্ত কী ঘটবে, এমন কোনো ভাবনা ছাড়াই কাল আমি ঘুমাতে পেরেছি এবং নিজের শোবার ঘরে জেগে উঠতে পেরেছি।’
৩৭ দিনের আন্দোলনকে অনেক কঠিন অভিহিত করে অভিজেতের কণ্ঠে স্বস্তি, ‘এখন আর কোনো আতঙ্ক নেই।'
সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অভিজিৎ বলেন, ‘যেসব মানুষ ৩৭ দিন ধরে যন্তর-মন্তরে অপেক্ষা করছিল, আমি আপনাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আর আমি আপনাদের বলতে চাই যে, আপনারা এই দেশের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি সত্যিই, সত্যিই মন থেকে কৃতজ্ঞ।’
সমালোচকদেরও ভোলেননি তিনি, ‘সমালোচনা আমাদের যৌক্তিক প্রশ্নের মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করতে সাহায্য করেছিল। আমার মনে হয় এই কারণেই আমরা সফলভাবে ফলাফলও এনে দিতে পেরেছি।’ তবে অনুসারীদের তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘কেবল শুরু মাত্র। আমাদের যেতে হবে বহু দূর।’
নেতাতের কথায় ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা ধারণা হয়তো করা যায়। তবে ভবিষ্যৎকে ছেড়ে দিতে হবে ভবিষ্যতের হাতেই।