গাজার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়া এলাকায় একটি পুলিশ পোস্টে ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা, আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং একজন নারী রয়েছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও পুলিশ সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
মঙ্গলবার জাবালিয়ার একটি ব্যস্ত বাজারের কাছে এই হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি ইসরায়েলি ড্রোন থেকে পুলিশ পোস্টটি লক্ষ্য করে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। হামলার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের মানুষ আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে স্থানীয় থানার প্রধান কর্নেল মোহাম্মদ মারওয়ান সালেম রয়েছেন। এছাড়া আরো কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা হামলায় নিহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে 'গণহত্যা' আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, কর্নেল মারওয়ান সালেম হামাসের সেন্ট্রাল জাবালিয়া ব্যাটালিয়নের সামরিক নিরাপত্তা প্রধান ছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় তার সঙ্গে আরো তিনজন 'সন্ত্রাসী' নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, নিহত অন্য তিনজন হলেন আবদুল মালিক আল-জাবিন, ঘাসান আল-দাকাস এবং ইয়ামান আবু ওবেইদা। সেনাবাহিনীর দাবি, প্রথম দুজন পুলিশ কর্মকর্তা হলেও তারা হামাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হামলায় নিহত ও আহতদের গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নিহত এক পুলিশ কর্মকর্তার চাচা মোহাম্মদ মুসা বলেন, তার ভাতিজা কোনো যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি বেসামরিক পুলিশ বাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, তার ভাতিজা একটি বেসামরিক গাড়িতে করে ফালুজাহ রাউন্ডঅ্যাবাউট এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছিলেন। সেই সময় একটি নজরদারি ড্রোন তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন বেসামরিক পুলিশ সদস্যকে কেন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলো। এদিকে একই দিনে দক্ষিণ গাজাতেও পৃথক হামলায় আরো দুজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় একজন নিহত এবং আরো তিনজন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ওই হামলায় হামাসের একজন সদস্যকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। অন্যদিকে রাফাহ এলাকায় ইসরায়েলি গুলিতে ১০ বছর বয়সী মুয়াতাজ আবু শার নামে এক শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। শিশুটির ফুফু সুজান আবু শার বলেন, হামলার সময় মুয়াতাজ নিজের তাঁবুর ভেতরে কাপড় বদলাচ্ছিল। তার ভাষায়, ছেলেটি ছিল তার মায়ের একমাত্র ভরসা। তিনি বলেন, এখন গাজায় কোথাও নিরাপদ আশ্রয় নেই। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। তিনি যুদ্ধ বন্ধ এবং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বন্ধের আহ্বান জানান।
রাফায় শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইসরায়েল ও হামাস প্রায় প্রতিদিনই একে অপরের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। উভয় পক্ষই বলছে, অপর পক্ষ যুদ্ধবিরতির শর্ত মানছে না। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ১১০ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, একই সময়ে ফিলিস্তিনি হামলায় তাদের চারজন সেনা নিহত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় বড় পরিসরের সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেই অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ২৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।






