মোনাকোতে এক ধনী ব্যবসায়ী ও তার পরিবারের ওপর হত্যাচেষ্টার মামলায় নতুন মোড় এসেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা আগে স্বীকার করা ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভ্লাদিস্লাভ রেউত এখন আদালতে দাবি করেছেন, তিনি কোনো গুলি চালাননি এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই।
বৃহস্পতিবার কিয়েভের একটি আদালতে হেফাজত শুনানিতে ৩৪ বছর বয়সী রেউত বলেন, তিনি আনাস্তাসিয়া বেরেজোভস্কাকে হত্যার অভিযোগ 'সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার' করছেন। তার দাবি, হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন তার কথিত সহযোগী ভিতালি ঝিকোভিচ। তবে কয়েক দিন আগেই রেউত তদন্তকারীদের কিয়েভের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বন এলাকায় নিয়ে গিয়ে বেরেজোভস্কার কবর দেখিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি হত্যার দায়ও স্বীকার করেছিলেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। আদালতে এসে তিনি সেই বক্তব্য থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
মামলাটি ইউক্রেনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ রেউত দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিইউআরের কর্মরত ও পদকপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। অন্যদিকে অভিযুক্ত ভিতালি ঝিকোভিচ কিছুদিন আগ পর্যন্ত ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউতে কর্মরত ছিলেন। এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ ঘটনা সম্পর্কে আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হবে। তবে মোনাকোতে যে বিস্ফোরণে ধনী ব্যবসায়ী ভাদিম ইয়ারমোলায়েভকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, সেই হামলার উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। ইয়ারমোলায়েভ কনিয়াক ও আবাসন ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন। কয়েক বছর আগে তিনি ইউক্রেনের নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন। পরে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখলের পরও সেখানে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ায় কিয়েভ তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে জানান, মোনাকোর বিস্ফোরণের দুই দিন পর আনাস্তাসিয়া বেরেজোভস্কা পোল্যান্ড হয়ে বাসে করে ইউক্রেনে প্রবেশ করেন। তখনও তিনি এই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন ছিলেন না। পরে তার বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি হলে তদন্তকারীরা মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত রেউত ও ৫০ বছর বয়সী ঝিকোভিচের কাছে পৌঁছে যান। তদন্তে দেখা যায়, ওই দুই ব্যক্তি বেরেজোভস্কার হিসাবে নগদ অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠিয়েছিলেন। এরপর রেউত প্রথমে হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং তদন্তকারীদের বনাঞ্চলে নিয়ে গিয়ে ডালপালা দিয়ে ঢেকে রাখা একটি কবর থেকে বেরেজোভস্কার মরদেহের অবস্থান দেখিয়ে দেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই আদালতে এসে রেউত বলেন, তিনি এবার 'সত্য' বলতে চান। তার দাবি, তিনি কখনোই বেরেজোভস্কাকে গুলি করেননি। রেউত বলেন, 'আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছি। আমি ইচ্ছা করে কোনো নিরীহ নারীকে হত্যা করতে পারি না।' তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ও ঝিকোভিচ একটি বিএমডব্লিউ গাড়িতে করে কিয়েভের মহাসড়কে বেরেজোভস্কাকে আনতে যান। কারণ একটি অপরাধসংক্রান্ত ঘটনার পর তাকে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল। তবে সেই অপরাধ কী ছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। রেউতের দাবি, পথে ঝিকোভিচ তার ব্যাগ থেকে পরিবর্তিত একটি মাকারভ পিস্তল বের করে তাতে গুলি ভরেন। তিনি আপত্তি জানালে ঝিকোভিচ বলেন, বেরেজোভস্কা আতঙ্কিত হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য অস্ত্রটি রাখা হয়েছে। পরে তিনজন ইউরিভ গ্রামের কাছে একটি বনপথে যান। সেখানে গাড়ি থেকে নেমে ঝিকোভিচ তাকে গুলি করার নির্দেশ দেন। রেউতের দাবি, ঝিকোভিচ তখন বলেন, 'হয় সে থাকবে, নয় আমরা।' তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানালে ঝিকোভিচ নিজেই বেরেজোভস্কাকে চারটি গুলি করে হত্যা করেন। এরপর তারা দুজনে মিলে একটি কবর খুঁড়ে মরদেহটি সেখানে লুকিয়ে রাখেন। পরে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র এবং বেরেজোভস্কার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি হ্রদে ফেলে দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
আদালতে রেউতকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি যদি গুলি না চালিয়ে থাকেন, তাহলে আগে হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন কেন? জবাবে তিনি বলেন, ঝিকোভিচ তাকে ও তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। রেউতের ভাষায়, 'সে আমাকে বলেছিল, আমার কিছু হলে তোমার আত্মীয়দের ক্ষতি হবে।' ঝিকোভিচের আইনজীবী আনাতোলি ইভানভ আদালতে রেউতের নতুন বক্তব্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, তার মক্কেল এসবিইউর সাবেক নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা। একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে কর্মরত একজন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, ঝিকোভিচ একজন দেশপ্রেমিক। ২০১৪ সালে তিনি পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধ করেছেন। পরে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সময়ও কিয়েভ রক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। আইনজীবীর দাবি, রেউত শুধু কারাগার এড়ানোর জন্য নিজের বক্তব্য বদলেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার মক্কেল কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, রেউত ও ঝিকোভিচ পরিকল্পিতভাবে একসঙ্গে কাজ করেছেন। তাই দুজনের বিরুদ্ধেই পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এ মামলায় এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। আদালতে ঝিকোভিচের আইনজীবী দাবি করেন, এর পেছনে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তার বক্তব্য, অতীতে ইউক্রেনের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের রাশিয়ার হয়ে কাজ করার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। অন্যদিকে তদন্তে দুর্নীতি, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রসিকিউটর দিমিত্রো তকাচুক বলেন, 'সব সম্ভাবনাই তদন্ত করা হচ্ছে।'তিনি জানান, সন্দেহভাজনদের একজন সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। বিচারক দুই সন্দেহভাজনের জামিন আবেদন নাকচ করেছেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের হেফাজতেই রাখা হবে।












