নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ট্রাফিক পুলিশের হয়রানির শিকার হয়ে এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র গণ-অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে মোটরসাইকেলের চাকা লক করে দেওয়ার পর ক্ষোভে ও অভিমানে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন ওই তরুণ চালক। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজধানী কাঠমান্ডুর রাস্তায় নেমে এসেছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নেপালের ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্ম।
নেপালি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) কাঠমান্ডুর একটি সড়কে গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ওই তরুণ রাইড-শেয়ারিং চালক। আকস্মিকভাবে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল (পৌর) পুলিশ এসে তার মোটরসাইকেলের চাকায় লক লাগিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের এই অন্যায্য আচরণের প্রতিবাদে এবং জীবিকা হারানোর চরম হতাশায় তরুণ চালক নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরদিন শুক্রবার (১০ জুলাই) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। রবিবার (১২ জুলাই) রাজধানীর সরকারি দপ্তর ‘সিংদরবার সচিবালয়’-এর বাইরে শত শত মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘গরিবের ওপর অত্যাচার বন্ধ করুন’ ও ‘মানবাধিকারকে সম্মান করুন’-এর মতো স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। সাধারণ মানুষ এই ঘটনাকে বালেন শাহ সরকারের ‘দরিদ্র-বিরোধী ও আগ্রাসী’ নীতিমালার ফসল হিসেবে দেখছেন। বালেন্দ্র শাহ মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ফুটপাত পরিষ্কার, হকার উচ্ছেদ ও নদীর ধারের অবৈধ বসতি ভাঙার নামে দরিদ্র ও ভূমিহীনদের ওপর পুলিশের নিষ্ঠুর নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনজীবী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠমান্ডুর পৌর পুলিশ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। প্রবীণ আইনজীবী রাজু চাপাগাঁই বলেন, ‘আইন অনুযায়ী পৌর পুলিশকে শারীরিক বলপ্রয়োগ বা দাঙ্গা দমনের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তাদের কাজ বুঝিয়ে ও সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করা। যানজট বা আইন ভঙ্গের সমস্যা হলে ট্রাফিক পুলিশকে জানানো উচিত ছিল। তা না করে তারা হকারদের ধাওয়া করছে ও নাগরিকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।’
২০২৩ সালে পাস হওয়া ‘কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন সিটি মিউনিসিপ্যাল পুলিশ অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, এই বাহিনীর কাজ মূলত সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা এবং স্বাস্থ্যবিধি ও উৎসবের শৃঙ্খলা বজায় রাখা। লাঠিচার্জ বা কাউকে আটক করার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। নেপাল পুলিশের সাবেক ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল পূর্ণচন্দ্র যোশী জানান, আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা বলপ্রয়োগের পরিস্থিতি তৈরি হলে পৌর পুলিশ ‘নেপাল পুলিশ’-কে ডাকতে বাধ্য, তারা নিজেরা কোনো অ্যাকশনে যেতে পারে না।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে দিনমজুর ও প্রান্তিক মানুষের ওপর পুলিশের এমন বেপরোয়া আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বালেন্দ্র শাহ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।




