• ই-পেপার

ফাইনালে নামার আগে মেসির বিশেষ বার্তা, কিসের ইঙ্গিত

জুলাইয়ের অভিশাপ পিছু ছাড়ল না মেসিদের!

অনলাইন ডেস্ক
জুলাইয়ের অভিশাপ পিছু ছাড়ল না মেসিদের!

এক যুগ—শুনতে যতটা দীর্ঘ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই, ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও জার্মানি। লিওনেল মেসির সামনে ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গনসালো হিগুয়েন, মেসি ও রদ্রিগো পালাসিও একাধিক সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। এর খেসারত দিতে হয় অতিরিক্ত সময়ে। ম্যাচের ১১৩তম মিনিটে মারিও গোটশের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় জার্মানি। সেই পরাজয়ে ভেঙে যায় কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের হৃদয়।

ঘুরে ফিরে আবারও জুলাই মাসে বিশ্বকাপের ফাইনাল। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল, ২০২৬ সালে কি জুলাইয়ের অভিশাপ কাটাতে পারবে ‘লা আলবিসেলেস্তে’? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরও এল হতাশার মধ্য দিয়েই।

জুলাইয়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনার হতাশার ইতিহাস আজকের নয়। ১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই, প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে আয়োজক উরুগুয়ের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। মন্টেভিডিওর এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধ শেষে ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল আকাশি-সাদা জার্সিধারীরা। তখন মনে হচ্ছিল, শিরোপা জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু বিরতির পর দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় উরুগুয়ে। টানা তিন গোল করে ৪-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ নিজেদের করে নেয় তারা। সেখান থেকেই জুলাইয়ে আর্জেন্টিনার হতাশার অধ্যায়ের সূচনা।

এর ঠিক ৬০ বছর পর, ১৯৯০ সালের ৮ জুলাই আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের তিক্ত স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। ইতালির রোমের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল দলটি। ম্যাচজুড়ে ছিল টানটান উত্তেজনা। ৮৫তম মিনিটে বিতর্কিত একটি পেনাল্টি পায় পশ্চিম জার্মানি। সেই পেনাল্টি থেকেই আন্দ্রেয়াস ব্রেহম গোল করে ১-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। বিতর্কিত সেই পরাজয় আজও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক স্মৃতি। ম্যারাডোনার অশ্রুসিক্ত মুখ এখনও ফুটবলপ্রেমীদের আবেগাপ্লুত করে।

১৯ জুলাই, ২০২৬। ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল স্পেন। অন্যদিকে, আরো একবার জুলাই মাসেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হলো লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনার। ফাইনালে শুরু থেকেই আধিপত্য দেখায় স্পেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা না পেলেও অতিরিক্ত সময়ে আক্রমণের ধার বজায় রাখে স্প্যানিশরা। শেষ পর্যন্ত ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করে ‘লা রোহা’।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু হয় স্পেনের উল্লাস। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৬ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করল ইউরোপের দেশটি।

মেসির সরল স্বীকারোক্তি, ‘স্পেন আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে’

ক্রীড়া ডেস্ক
মেসির সরল স্বীকারোক্তি, ‘স্পেন আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে’
ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে এভাবেই কাঁদতে থাকেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ছবি: ফিফা

যোগ করা সময় বিবেচনা করলে বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়েছে ১৩০ মিনিটের মতো। এই দীর্ঘ সময়েও আর্জেন্টিনা লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি। ভাবা যায়?

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেন মাত্র এক গোলের ব্যবধানে জিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও বাস্তবে আর্জেন্টিনাকে যেন দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেরিয়েছে। লিওনেল মেসিকেও কাল রাতে চেনা ছন্দে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নিজের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে সোনালি ট্রফিটা হাতছাড়া করার পর মেসির দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে। সেই জল মুছতে মুছতেই আর্জেন্টিনার অধিনায়ক স্বীকার করলেন, ফাইনালে স্পেনই ছিল ভালো দল এবং শিরোপার যোগ্য দাবিদার।

ফাইনাল শেষে মেসি বলেন, ‘স্পেন আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে। তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল এবং জয় পাওয়ার যোগ্য ছিল। হারটা খুব কষ্টের। কারণ আমরা শিরোপা ধরে রাখতে চেয়েছিলাম।’

৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা আরো বলেন, ‘এই মুহূর্ত (ফাইনালে হার) মেনে নেওয়া কঠিন। তবে আমি আমার সতীর্থদের নিয়ে গর্বিত। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি এবং পুরো টুর্নামেন্টে নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’

গোলটি ৪ কোটি ৭০ লাখ স্প্যানিশের : তোরেস

ক্রীড়া ডেস্ক
গোলটি ৪ কোটি ৭০ লাখ স্প্যানিশের : তোরেস
ফেরান তোরেসের হাতে ম্যাচসেরার পুরস্কার তুলে দেন বিশ্বকাপের থিম সংয়ের গায়িকা শাকিরা। ছবি : ফিফা

পুরো ম্যাচেই আধিপত্য দেখাচ্ছিল স্পেন। তবে ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন সেই ‘সোনার হরিণ’ খ্যাত গোলটা পাচ্ছিল না তারা। 

অতিরিক্ত সময়ে সেই ডেডলক ভাঙলেন বদলি নামা ফেরান তোরেস। ১০৬ মিনিটে জয়সূচক গোলটি করে মেটলাইফ স্টেডিয়ামকে আনন্দে ভাসান ২৬ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। তার সেই গোলেই পরে ১-০ ব্যবধানে জিতে ১৬ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন।

স্পেনকে স্মরণীয় দিন এনে দিতে দারুণ খুশি তোরেস। তাই ম্যাচ শেষে জানান, গোলটি ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষের। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ফিফাকে বলেছেন, ‘গোলটি শুধু আমার কিংবা স্কোয়াডে থাকা ২৬ ফুটবলারের নয়, ৪ কোটি ৭০ লাখ স্প্যানিশের। আমি বিশ্বাস করি, আজকের ফলের ভাগ্যে আগেই লেখা হয়েছিল। আমাদের জয়ের জন্য। আর সেরাটা দিয়ে আমরা সেটাই করেছি।’

প্রতিপক্ষ হিসেবে লিওনেল মেসি থাকায় ফাইনালটা কঠিন হলেও নিজেদের ব্র্যান্ডিং ফুটবল আরেকবার দেখিয়েছেন বলে জানান তোরেস। বার্সেলোনার স্ট্রাইকার বলেছেন, ‘সব ফাইনালই কঠিন। প্রতিপক্ষ দলে মেসি থাকলে নার্ভাসনেস কাজ করাটাই স্বাভাবিক। তবে নিজেদের ব্র্যান্ডিং ফুটবল খেলে আজ আরেকবার বিশ্বকে দেখিয়ে দিলাম।’

বিশ্বকাপ জিতে কত টাকা পেল স্পেন

ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপ জিতে কত টাকা পেল স্পেন
নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন। ছবি: আরএফইএফ

মাত্র এক গোলের ব্যবধানে বিশ্বকাপ জয়। কিন্তু বাস্তবে গত রাতে আর্জেন্টিনাকে ‘ফুটবল শিখিয়ে’ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। 

যে লিওনেল মেসি-ম্যাক অ্যালিস্টার-এনজো ফার্নান্দেজরা এবারের আসরের নকআউট পর্বজুড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখেছেন, সেই তাদেরই কাল বোতলবন্দী করে রেখেছিলেন রদ্রি-কুকুরেয়া-কুবারসিরা। 

আর অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে এসেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। এরপর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে সোনালি ট্রফিটা বুঝে নিলেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। 

যদি ভেবে থাকেন লড়াইটা ছিল শুধু ৬.১৭ কেজি ওজনের ওই ট্রফির জন্য, তাহলে আপনি ভুল। ১৮ ক্যারেট সোনার ট্রফি তো আছেই, সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থযোগও হয়েছে স্পেনের।

নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা পেয়েছে রেকর্ড ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চেক; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার সমান। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। সেবার তারা পেয়েছিল ৩০ মিলিয়ন ডলার। 

২০২২ সালে এর আগের বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪২ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা)। এবার রানার্স আপ হয়ে মেসির দল পেয়েছে ৩৩ মিলিয়ন ডলার (৪০৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা)। 

পরশু রাতে ১০ গোলের থ্রিলারে ফ্রান্সকে ৬-৪ ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় হয়েছে ইংল্যান্ড। ইংলিশরা পেয়েছে ৩৩ মিলিয়ন ডলার (৩৫৫ কোটি টাকা)। চতুর্থ হয়ে ফরাসিদের অর্থযোগ হয়েছে ২৭ মিলিয়ন ডলার (৩৩৩ কোটি টাকা)। 

৪৮ দলের এই বিশ্বকাপের বাকি ৪৪ দলও খালি হাতে ফেরেনি। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রতিটি দল ১৯ মিলিয়ন ডলার (২৩৪ কোটি টাকা), শেষ ষোলোর প্রতি দল ১৫ মিলিয়ন (১৮৪ কোটি), শেষ বত্রিশের দলগুলো ১১ মিলিয়ন (১৩৫ কোটি) করে, এমনকি গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া প্রতিটি দলও ৯ মিলিয়ন (১১০ কোটি) করে অর্থপুরস্কার পেয়েছে।