৩২ দল থেকে বেড়ে যখন ৪৮ দলের বিশ্বকাপ হলো, তখন অনেকেই মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ আমাদের এমন সব রূপকথা উপহার দিতে যাচ্ছে, যা ফুটবল ইতিহাসের সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে।
আয়তনে মাত্র ১৭১ বর্গ মাইলের সমান ক্যারিবীয় অঞ্চলের পুচকে দেশ কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার। এবার বিশ্বমঞ্চে পা রাখছে সেই পুচকে কুরাসাও। আইসল্যান্ডের রেকর্ড ভেঙে কুরাসাও এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ। যেখানে বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলের আয়তনও এর সমান।
যোগ্যতা অর্জন পর্বের লড়াইয়ে সাবেক ফুটবল কিংবদন্তি ডোয়াইট ইয়র্কের দেশ ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো এবং স্টিভ ম্যাকক্লারেনের জ্যামাইকার মতো শক্তিশালী দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চের টিকিট কেটেছে তারা। ২০১১ সালে ফিফার সদস্যপদ পাওয়া এই দেশটি মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে খেলবে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে।
ডিক অ্যাডভোকাটের রেকর্ড ও ‘পারিবারিক’ প্রত্যাবর্তন
কুরাসাওর এই রূপকথার মাস্টারমাইন্ড ৭৮ বছর বয়সী ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ কোচ হিসেবে ডাগআউটে দাঁড়াতে যাচ্ছেন তিনি। তবে তার এই বিশ্বকাপ যাত্রা সহজ ছিল না। দলকে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করানোর পর গত ফেব্রুয়ারিতে অসুস্থ মেয়ের পাশে থাকতে কোচের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন অ্যাডভোকাট।
তার অনুপস্থিতিতে ফ্রেড রুটেন দায়িত্ব নিলেও প্রীতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ও চীনের কাছে বিধ্বস্ত হয় দল। এরপর মেয়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় গত মে মাসে আবারও ‘দ্য ব্লু ফ্যামিলি’ খ্যাত এই দলের ডাগআউটে ফিরে আসেন অ্যাডভোকাট। আর তাতেই স্বস্তি ফিরেছে পুরো শিবিরে।
মাঠের কৌশল ও শক্তি
ফুটবল মহলে কুরাসাও পরিচিত ‘দ্য ব্লু ফ্যামিলি’ বা ‘ব্লু ওয়েভ’ নামে। দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের অটুট একতা। মাঠের কৌশলে তারা মূলত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে থাকে। চূড়ান্ত বাছাইপর্বের শেষ ৬ ম্যাচে তারা গোল হজম করেছে মাত্র ৩টি।
গভীর রক্ষণভাগ, সুশৃঙ্খল মাঝমাঠ এবং কাউন্টার অ্যাটাকে উইং ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাই অ্যাডভোকাটের মূল মন্ত্র। প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনা করে দলটিকে ৪-৫-১ অথবা ৫-৪-১ ফর্মেশনে খেলতে দেখা যেতে পারে।
দুর্বলতা ও আভিজাত্যের অভাব
কুরাসাও দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই নেদারল্যান্ডসের ঘরোয়া লিগে খেলেন। কিছু খেলোয়াড়ের প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও, বিশ্বমানের ‘এলিট’ ঘরোয়া পারফর্মারের অভাব রয়েছে এই স্কোয়াডে। আর এই অভিজ্ঞতার ঘাটতিই কাল হতে পারে জার্মানির মতো পরাশক্তির বিপক্ষে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে।
নজর থাকবে যাদের ওপর
বাছাইপর্বে কুরাসাওর হয়ে সর্বোচ্চ ২০টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন মিডফিল্ডার জুনিনহো বাকুনা। বার্মিংহাম সিটি ও রেঞ্জার্সের সাবেক এই তারকাকে ‘ফলস নাইন’ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন কোচ।
এছাড়া আছেন দলের অধিনায়ক এবং জুনিনহোর বড় ভাই লিয়ান্দ্রো বাকুনা। অ্যাস্টন ভিলা ও কার্ডিফ সিটির হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে প্রায় ১০০ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার।
এদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অ্যাকাডেমির গ্র্যাজুয়েট তাহিত চং ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের একমাত্র ফুটবলার, যার জন্ম কুরাসাওতে। দেশের হয়ে ৫ ম্যাচে ৩ গোল ও ১টিতে সহায়তা করে দারুণ ফর্মে আছেন তিনি।
চমকে দেওয়ার মতো তথ্য
কাতার বিশ্বকাপে হ্যাজার্ড (বেলজিয়াম), মিলিনকোভিচ-সাভিচ (সার্ভিয়া) এবং আইয়ু (ঘানা) ভাইদের জুটি দেখা গিয়েছিল। এবার কুরাসাওর হয়ে মাঠ মাতাবেন বাকুনা ভাইয়েরা (লিয়ান্দ্রো ও জুনিনহো)।
কাকতালীয়ভাবে, ২০১৮-১৯ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে কার্ডিফ সিটি ও হাডার্সফিল্ড টাউনের হয়ে দুই ভাই একই মৌসুমে রেলিগেশনের স্বাদ পেয়েছিলেন।
‘গ্রুপ অব ডেথ’-এ পড়েছে এই পুচকে দ্বীপরাষ্ট্রটি। গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি, ইকুয়েডর এবং আইভরি কোস্ট। এই তিন প্রতিপক্ষের মিলিত জনসংখ্যা যেখানে ১৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি, সেখানে কুরাসাওর জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখ!
তবে কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, তিনি জানান, ‘টিভি স্ক্রিনে যাদের খেলা দেখি, তাদের বিপক্ষে লড়তে যাওয়াটা দারুণ কিছু। বিশ্বকাপে যেকোনো দল চমকে দিতে পারে। কুরাসাও কেন নয়? আমরা সেটাই চেষ্টা করব।’