অভাব কখনো মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারে না, যদি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে কেউ পাশে দাঁড়ায়। সে লক্ষ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় পলাশবাড়ীর দরিদ্র নারীদের কল্যাণে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ।
তিন মাসের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলে ২৪ জন অসচ্ছল নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দিয়েছে সংগঠনটি। আর সেই সেলাই মেশিন যেন শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং দরিদ্র নারীদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। সেলাই মেশিন পেয়ে আবেগাপ্লুত হন প্রশিক্ষিত নারীরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) পলাশবাড়ী উপজেলা অডিটরিয়ামে সুরুজ হক লিটনের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় আয়োজিত সেলাই মেশিন ও গাছের চারা বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও শুভসংঘ প্রধান ইমদাদুল হক মিলন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বুলবুল, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহনাজ আক্তার, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম রুবেল, উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মোছা. সায়মুম মুসতারী।
উপকারভোগী নারীদের একজন উপজেলা পর্যায়ের পরিচিত নারী ফুটবলার হাবিবা। মাঠে দৌড়ে বেড়ানো এই স্বপ্নবাজ তরুণীর জীবনও ছিল অভাবের বেড়াজালে আটকে। কৃষক বাবার চার সন্তানের সংসারে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবার পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে বারবার থামিয়ে দিতে চাইলেও হার মানেননি তিনি। বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রশিক্ষণ শেষে হাতে পাওয়া সেলাই মেশিন এখন তার নতুন আশার আলো। ফুটবলের পাশাপাশি নিজের আয়ে পরিবারকে সহায়তা করার স্বপ্ন দেখছেন হাবিবা।
একই গল্প লিমা আক্তারেরও। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী লিমার বাবা একজন অটোরিকশাচালক। চার ভাই-বোনের সংসারে প্রতিদিনই অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয় তাদের। বাবার সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় সেলাই প্রশিক্ষণ ও একটি সেলাই মেশিন পেয়েছে লিমা। তার বিশ্বাস, এই মেশিন একদিন তাকে পরিবারের শক্তিতে পরিণত করবে।
হাবিবা কিংবা লিমা—তাদের গল্প আলাদা হলেও বাস্তবতা একই। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এমন ২৪ নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দিয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ আত্মনির্ভরতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তারা এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্য ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘এটি কোনো সাহায্য নয়, বসুন্ধরা গ্রুপের উপহার। আমরা চাই, এই সেলাই মেশিনকে কাজে লাগিয়ে নারীরা আত্মনির্ভরশীল হোক, নিজের পরিবারের পাশাপাশি সমাজের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখুক। একটি মেশিন থেকেই একদিন তারা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে আরো অনেক নারীর।’
নারীর ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি আরো বলেন, ‘যে সমাজে নারীরা এগিয়ে যায়, সেই সমাজকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। তরুণরাই সমাজ পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেয়। তাই এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।’
তিনি উপকারভোগীদের সেলাই মেশিনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে স্বাবলম্বী হওয়ার আহ্বান জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করতে বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। সেই জায়গায় বসুন্ধরা শুভসংঘ এগিয়ে এসে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি আশা করি, যারা আজ সেলাই মেশিন পেয়েছেন তারা এর সঠিক ব্যবহার করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবেন। বসুন্ধরা গ্রুপ ও বসুন্ধরা শুভসংঘ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, মানবকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।’
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহনাজ আক্তার বলেন, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ ও বসুন্ধরা গ্রুপকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করার এই মানবিক উদ্যোগের জন্য। পলাশবাড়ী উপজেলার ২৪ জন নারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সেলাই মেশিন বিতরণ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই সেলাই মেশিন শুধু একটি উপকরণ নয়, বরং তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার একটি মাধ্যম। আমি আশা করি, এই কার্যক্রম শুধু ২৪ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভবিষ্যতে আরো বেশি সংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত নারী এর আওতায় আসবেন। দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আজকের এই আয়োজন আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। কারণ এখানে অসচ্ছল নারীদের হাতে শুধু একটি সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়নি, তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা নিজেরা আয় করতে পারবেন, অন্যদেরও প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন এবং নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করবেন।’
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম রুবেল বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আজ যারা এই সেলাই মেশিন পেলেন, তারা এটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারবেন। তাদের সাফল্যই বসুন্ধরার এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে। ভবিষ্যতেও এমন মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি।’




