সংকোচ, সামাজিক বাধা ও সচেতনতার অভাবে অনেক কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে দ্বিধাবোধ করে। ফলে তারা মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে কমিউনিটির কার্যকর সংযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীতে সিরাক-বাংলাদেশ আয়োজিত ‘কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার (ভিপিএল) মডেল প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ বিষয়ক জাতীয় পর্যায়ের মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পিএইচসি ও আইটিএইচসি) এবং টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি ডা. সৈয়দ কামরুল ইসলাম।
সভাপতির বক্তব্যে কামরুল ইসলাম বলেন, কিশোর-কিশোরীদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার (ভিপিএল) কার্যক্রম অত্যন্ত কার্যকর। তবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিত আলোচনা ও কাঠামোবদ্ধ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে টেকসইভাবে যুক্ত করতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে সিরাক-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান জনবল সংকটের মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডাররা প্রাথমিক কাউন্সেলিং, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবায় রেফারেলের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটির মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।
সিরাক-বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. নাজমুল হাসান এক উপস্থাপনায় কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান ঘাটতি, ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডারদের কার্যক্রম এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
আলোচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন কারণে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে দ্বিধাবোধ করে। এ বাস্তবতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডাররা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তারা প্রাথমিক কাউন্সেলিং, স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রেফারেলের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
বক্তারা বলেন, এই উদ্যোগকে আরো কার্যকর করতে একটি সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামো, দায়িত্ব ও কার্যপরিধি (টার্মস অব রেফারেন্স), নীতিগত অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। পাশাপাশি জাতীয় কৈশোর স্বাস্থ্য কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে গঠিতব্য অ্যাডোলেসেন্ট ফোকাল বডির সঙ্গে এই কার্যক্রম যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মো. বনি আমিন মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে তারা সমবয়সী কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয়ে সচেতন করেন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন।
বক্তারা আরো বলেন, এই উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ায় না, বরং তরুণদের নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, মাদকাসক্তি ও অন্যান্য সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবার, বিদ্যালয়, কমিউনিটি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের প্রতিনিধি, সিরাক-বাংলাদেশের কর্মকর্তাসহ সাবেক ও বর্তমান ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার এবং বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় উত্থাপিত সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।






