দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ডেঙ্গু মোকাবেলার চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘আমি কসম কেটে বলছি, আমি খুব নার্ভাস হয়ে গেছি। আমি খুব দুর্বল হয়ে গেছি। আমি কিভাবে এই ফাইটটা করব? আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু চিকিৎসায় মৃত্যুর বিষয়ে আমার কোনো হাত নেই।’
রবিবার (৭ জুন) সকালে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) অনুষ্ঠিত ‘ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত কর্মশালাটি ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়; এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবেলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের দায়িত্ব নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিককে এতে সম্পৃক্ত হতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকদের ওপর চাপ দিতে পারি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে বলতে পারি। কিন্তু শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত করতে পারি না। মশা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে, যেকোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। তাই এটি অত্যন্ত কঠিন একটি লড়াই।’
ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে ‘টোটাল ফাইট’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ স্থান এবং কচুরিপানাযুক্ত এলাকা পরিষ্কার না করলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এসংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমরা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, ঠিক তেমনি ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়তেও জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নও কঠিন।
তিনি বলেন, যদি ব্যাপক ভ্যাকসিনেশনে যেতে হয়, তাহলে বিপুল বাজেট প্রয়োজন হবে। চার মাস পর পর টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হলে দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
ডেঙ্গু বিস্তারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, শহর ও গ্রামে অসংখ্য ছোট ছোট স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। গ্যারেজে গাড়ি ধোয়ার পর জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, অব্যবহৃত ক্যান, রাস্তার ছোট গর্ত কিংবা বড় ড্রেন ও খালে জমে থাকা ময়লাযুক্ত পানি সবখানেই লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিরোধব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর করা কঠিন। তাই আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিতের ওপর।’
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্লাজমা লিকেজ সময়মতো শনাক্ত করা। রোগীর অবস্থা কখন সংকটজনক পর্যায়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বা কয়েকটি বড় হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দেশের প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি ক্লিনিক এবং সব পর্যায়ের চিকিৎসকদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
সোসাইটি অব মেডিসিনের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের সঠিক চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির বার্তা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ স্যালাইন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সম্ভাব্য চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় মশক নিধন কার্যক্রম আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত এ কার্যক্রম দৃশ্যমান মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকা জরুরি। নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা এবং প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। প্লাজমা লিকেজ বেড়ে গেলে রোগী দ্রুত শকে চলে যেতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এবার ‘রিঅ্যাকটিভ’ নয়, বরং ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। তাই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রোগীর প্লাটিলেট কাউন্টের চেয়ে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর প্রধান জটিলতা হলো, শরীরে তরল পদার্থের লিকেজ এবং রোগের ক্রিটিক্যাল ফেজ সফলভাবে অতিক্রম করা।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ডেঙ্গুর উপসর্গেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগী ডায়রিয়া ও বমি নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। এর ফলে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে শকের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না। সঠিকভাবে বাসায় চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণের মাধ্যমে অনেক রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তবে যাদের মধ্যে সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা যায়, তাদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
ডেঙ্গু চিকিৎসা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।
অধ্যাপক মনিরুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গুতে স্টেরয়েড বা ব্যথানাশক ওষুধের কোনো ভূমিকা নেই। একইভাবে প্লাটিলেট বাড়ানোর জন্য পেঁপেপাতার ক্যাপসুল বা এ ধরনের প্রচারিত ওষুধেরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তিনি বলেন, যারা আগে থেকে রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করছেন, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ চালিয়ে যাওয়া বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।




