• ই-পেপার

স্মার্ট ডিজিটাল নীতিমালা

জ্বালানি সংকটের সমাধান, দীর্ঘ লাইন ভাঙার কার্যকর পথ

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সরকারের আশ্বাস : অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত

ড. মো. মিজানুর রহমান
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সরকারের আশ্বাস : অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত
সংগৃহীত ছবি

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তি এখন শুধু উন্নয়নের একটি সহায়ক উপাদান নয়; বরং অর্থনৈতিক শক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যে দেশ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সেই দেশ ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই বাস্তবতায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। দেশে সেমিকন্ডাক্টরবিষয়ক একটি জাতীয় সেমিনার প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে। প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী ও উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা প্রমাণ করে, দেশে ইতোমধ্যে এমন একটি প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের সরকারপ্রধান সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, তেমনি সুপরিকল্পিত নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সমন্বয়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও দেশের অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে এটি শুধু একটি কারখানা স্থাপনের বিষয় নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি প্রতিবেশ গড়ে তোলার বিষয়। এর সঙ্গে জড়িত দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি। তাই বাংলাদেশের সামনে যেমন বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করাই এ আলোচনার উদ্দেশ্য।

সেমিকন্ডাক্টর এমন একটি উপাদান, যার বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং যার ভিত্তিতে আধুনিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির মূল কাঠামো গড়ে ওঠে। সহজ ভাষায়, এটি সেই প্রযুক্তি যার মাধ্যমে মাইক্রোচিপ বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট তৈরি হয়। এই ক্ষুদ্র চিপই আজকের বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, মহাকাশ প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম, রোবোটিকস এবং ইন্টারনেট অব থিংস—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার অপরিহার্য। একটি আধুনিক গাড়িতে শত শত, এমনকি হাজার হাজার চিপ ব্যবহৃত হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসরের ভিত্তিও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি।

এ কারণেই সেমিকন্ডাক্টরকে অনেকেই ‘ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন তেল’ বলে অভিহিত করেন। বিংশ শতাব্দীর শিল্প অর্থনীতি যেমন জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তেমনি একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি নির্ভর করছে চিপের ওপর। এর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও এটি নিবিড়ভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা দেখিয়েছে, সেমিকন্ডাক্টর এখন একটি কৌশলগত সম্পদ। কোনো দেশের শিল্পোন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহের ওপর।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প অন্যতম দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি খাত। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বিক্রয় প্রায় ৬২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্মার্ট প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে আগামী দশকে এ বাজার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারে উন্নত প্রসেসর ও গ্রাফিক্স চিপের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। একইভাবে বৈদ্যুতিক যানবাহনের সম্প্রসারণও সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, কারণ একটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে প্রচলিত গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি চিপ ব্যবহৃত হয়।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল। একটি উন্নতমানের চিপের নকশা যুক্তরাষ্ট্রে, উৎপাদন তাইওয়ানে, যন্ত্রপাতি নেদারল্যান্ডসে, বিশেষ উপকরণ জাপানে এবং সংযোজন ও পরীক্ষা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, একটি চিপ তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক দেশ অংশগ্রহণ করে। করোনা মহামারির সময় সৃষ্ট বৈশ্বিক চিপ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপানসহ অনেক দেশ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থা বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো উন্নত চিপ উৎপাদনে সক্ষম নয়, তবু চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা এবং শিল্পভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে যুক্ত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বের সফল সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ শিল্পে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। তাইওয়ানের টিএসএমসি বিশ্বের শীর্ষ চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম; দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স মেমোরি চিপ উৎপাদনে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র চিপ নকশা ও গবেষণায় অগ্রণী, আর নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল উন্নত লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে প্রায় একচ্ছত্র অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হলো মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা। তারা শুরুতেই অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনের পরিবর্তে সংযোজন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি সেবায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বৈশ্বিক শিল্পব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। বাংলাদেশেরও উচিত একই বাস্তবধর্মী কৌশল অনুসরণ করা—প্রথমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নির্ভরযোগ্য অবস্থান তৈরি করা। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভবিষ্যতে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর মতো উন্নত চিপ বা ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি; তবে তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং প্রকৌশল শিক্ষায় গত দুই দশকের অগ্রগতি ভবিষ্যতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এ শিল্পের পুরো মূল্যশৃঙ্খলে একযোগে প্রবেশ বাস্তবসম্মত নয়। চিপ ডিজাইন, সংযোজন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, সফটওয়্যার সমন্বয় ও উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ভিন্ন মাত্রার প্রযুক্তি, মূলধন ও দক্ষতার প্রয়োজন। তাই কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগসাপেক্ষ উন্নত চিপ উৎপাদনের পরিবর্তে বাংলাদেশ প্রথম পর্যায়ে চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা এবং প্রকৌশল সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গড়ে তুলতে পারে।

দেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাত ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন এবং বৈশ্বিক আউটসোর্সিং বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে বহু বাংলাদেশি প্রকৌশলী বিশ্বের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, ন্যানোপ্রযুক্তি, ভিএলএসআই ডিজাইন ও চিপ প্রকৌশলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা গেলে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিক্স শিল্পও সেমিকন্ডাক্টর সংযোজন, পরীক্ষা এবং সহায়ক শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি হলো বিপুল তরুণ জনশক্তি। প্রতিবছর হাজার হাজার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি স্নাতক কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এই মানবসম্পদই প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে। তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করেছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ‘চীন প্লাস এক’ কৌশলের ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও দক্ষ শ্রমশক্তি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্পে অর্জিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও গভীর। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্বের অন্যতম মূলধননির্ভর, গবেষণানির্ভর ও প্রযুক্তিঘন খাত। একটি আধুনিক উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহযোগিতা অপরিহার্য। শুধু প্রকৌশলী তৈরি করলেই হবে না; চিপ ডিজাইন, মাইক্রোফ্যাব্রিকেশন, উপাদান বিজ্ঞান, মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, অতিশুদ্ধ পানি, উন্নত লজিস্টিকস, বিশেষায়িত রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ছাড়া এ শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে না। ফলে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই হবে বাংলাদেশের প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ববাজারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের সামনে উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়তা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে উন্নত প্রসেসর উৎপাদনের পরিবর্তে চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, অ্যানালগ ও শিল্পভিত্তিক চিপ এবং প্রকৌশল সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করা। এতে তুলনামূলক কম মূলধন বিনিয়োগে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত উৎপাদনের ভিত্তি গড়ে উঠবে।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয় প্রধানত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পের মূল্যসংযোজন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক বাজারের সামান্য অংশীদারিত্ব অর্জন করলেও তা বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ে রূপ নিতে পারে, যার বাস্তব উদাহরণ মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম। একই সঙ্গে এ শিল্প উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বিকাশে সহায়তা করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মোট দেশজ উৎপাদনে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের অংশ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শ্রমনির্ভরতা থেকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল প্রণয়ন, যেখানে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর প্রণোদনা, রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারত্বকে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, চিপ নকশা কেন্দ্র, দক্ষতা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন উদ্যোগের সহায়তা কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প-সরকারের সমন্বয়ে একটি ‘বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করা গেলে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

উপসংহারে বলা যায়, সেমিকন্ডাক্টর শুধু একটি নতুন শিল্প নয়; এটি বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামোর রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উচ্চ মূল্যসংযোজন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের একটি কৌশলগত সুযোগ। তৈরি পোশাক শিল্প যেমন বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন মানচিত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নীতিসহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও দেশকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘বাংলাদেশে তৈরি’ নয়, বরং ‘বাংলাদেশে নকশাকৃত, উদ্ভাবিত ও প্রকৌশলায়িত’ প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করা—যেখানে বাংলাদেশ কেবল উৎপাদনকারী নয়, উদ্ভাবন, নকশা ও প্রযুক্তি সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবেও বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে সংশয়মুক্ত বিএনপি

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে সংশয়মুক্ত বিএনপি

অবশেষে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধানের পদ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত বিশ্বস্ত ব্যক্তিটিও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্থান পাওয়ার জন্য চলে গেলেন। তাঁকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থাকা বিএনপি নেতৃত্বের পক্ষেও সহজ হলো রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক ও শীর্ষ সাংবিধানিক পদে তাদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে আসীন করার। গত ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে গুঞ্জন শুরু হয়, কে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হবেন! সম্ভাব্য নামগুলো এখন আরও বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদকে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করতে হবে। অতএব মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে বিএনপি সরকারকে আগাম সুযোগ দিয়েছেন তাদের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের। আশা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি সংসদীয় দল এমন একজনকে মনোনীত করতে চায়, যাতে তিনি সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত হতে পারেন। সেই লক্ষ্যে বিএনপি বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছার যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সাংবিধানিক সংকটের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে আসছে এবং দেশের তথাকথিত ‘ক্রান্তিকাল’-এর কখনো অবসান ঘটছে না। অতএব সময়ের এক এক পর্যায়ে সংবিধানে সংসদীয় সরকারপদ্ধতি, রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থার তালগোলের মধ্যে দেশবাসী রাষ্ট্রের শীর্ষ পদটিতে কখনো নির্বাহী ক্ষমতাহীন, কখনো সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে আসীন এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগকারী জেনারেল, কখনোবা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিকে দেখেছেন। দুজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে, একজন সামরিক একনায়ককে রাজপথের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁদের শাসনের অবসান ঘটানো হয়েছে। বেশ কজন রাষ্ট্রপতিকে বন্দুকের নলের মুখে অথবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে পদ থেকে হটানোর ঘটনাও ঘটেছে। ১৯৯১ সালের পর যদিও জাতীয় সংসদের সদস্যদের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীরাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি হয়ে আসছেন। কিন্তু এর মাঝেও কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অথবা বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্যের হেরফের হলে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন একাধিক ব্যক্তির নাজেহাল হওয়ার ইতিহাসও বাংলাদেশেই বিদ্যমান।

কোনো কোনো রাষ্ট্রপতি একাধিক মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের অনুপস্থিত রাষ্ট্রপ্রধান ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান এবং পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। খুব কমসংখ্যক রাষ্ট্রপতির পক্ষেই তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে। একটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মাত্রা বিচার করার ক্ষেত্রে সাড়ে ৫৫ বছর বয়সি বাংলাদেশে ২৩তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ বিবেচনা করাই যথেষ্ট। রাষ্ট্রপতিদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদের গড় হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিজন রাষ্ট্রপতি গড়ে আড়াই বছর দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। আর মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ নতুন একজন রাষ্ট্রপতি উপহার পাবে, যিনি হবেন রাষ্ট্রের ২৪তম রাষ্ট্রপতি। পাশের দেশ ভারতকেও অনেক উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক ধারা বহাল রাখার ক্ষেত্রে তারা কোনো আপস করেনি। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সময় বাদ দিলে গত ৭৬ বছরে বর্তমান রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু পর্যন্ত ভারপ্রাপ্তসহ মাত্র ১৮ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্রৌপদী মুর্মু ভারতের ১৫তম রাষ্ট্রপতি। উত্তম দৃষ্টান্ত গ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরা কে কত দিন তাঁদের পদে ছিলেন, তা সামনে থাকলে পাঠকদের বোঝা সহজ হবে যে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় অস্থিতিশীলতার মধ্যে কাটিয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান (প্রবাসী সরকারের অনুপস্থিত রাষ্ট্রপতি) : ২৭০ দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত) : ২৭০ দিন, আবু সাঈদ চৌধুরী : ১ বছর ৩৪৬ দিন, মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী : ১ বছর ৩২ দিন, শেখ মুজিবুর রহমান : ২০২ দিন, খোন্দকার মোশতাক আহমদ : ৮৩ দিন, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম : ১ বছর ১৬৬ দিন, লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান : ৪ বছর ৩৯ দিন, বিচারপতি আবদুুস সাত্তার : ২৯৮ দিন, বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরী : ১ বছর ২৫৮ দিন, লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ : ৬ বছর ৩৬০ দিন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ (ভারপ্রাপ্ত) : ১০৪ দিন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ : ২০৪ দিন, আবদুর রহমান বিশ্বাস : ৫ বছর, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ : ৫ বছর ৩৬ দিন, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী : ২১৯ দিন, মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার (ভারপ্রাপ্ত) : ৭৭ দিন, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ : ৬ বছর ১৫৯ দিন, জিল্লুর রহমান : ৪ বছর ৩৬ দিন, মোহাম্মদ আবদুল হামিদ : ১০ বছর ৪১ দিন, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন : ৩ বছর ৯১ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে পদাধিকারবলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত) হয়েছেন। 

মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করে ভলোই করেছেন। পদত্যাগের জন্য তাঁর ওপর সরকারের কোনো চাপ ছিল কি না, তা তখনই জানা যাবে, যখন তিনি কথা বলার মতো নিরাপদবোধ করবেন। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বিপরীত আদর্শের রাজনৈতিক সরকারের সুরে সুরে কথা বলতে বাধ্য হওয়ায় তাঁর মধ্যে অন্তর্দহন চলছিল। তিনি একজন পরীক্ষিত ও কমিটেড আওয়ামী লীগার। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্ভবত এজন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তিনি প্রটোকল ভেঙে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার পদধূলি গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতেও দ্বিধা করেননি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সাহাবুদ্দিন মাত্র ১৫ মাস সময় পেয়েছিলেন শেখ হাসিনার গুণগান করার। কিন্তু প্রায় রাতারাতি সব পাল্টে যাওয়ায় ২০২৪ সালের পর তাঁকেই শেখ হাসিনার সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ সরকার বলতে হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ স্বীকার করতে হয়েছে, এমনকি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বক্তৃতা শেষ করতে হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বিরোধী দল, এমনকি বিএনপির অনেকে তাঁকে আপন ভাবতে পারেননি।

কয়েক দিন ধরে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে দেশের সব মহলে আলোচনা ও গুজব ছিল তুঙ্গে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দলবলসহ দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণার সঙ্গে গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের লন্ডন অবস্থানকালে হাসিনার সঙ্গে টেলিফোন আলাপের খবর ছিল সব আলোচনার ভিত্তি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হাসিনার সঙ্গে তাঁর আলাপের কথা জানার পর তাঁকে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়ে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সাহাবুদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই-একজনের সঙ্গে এ ধরনের আলাপের কথা অস্বীকার করলেও সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। তবে এটা ঠিক যে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘোষণার পর তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা রাজনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এর রাজনৈতিক বাস্তবতাও ছিল। সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনেই বাংলাদেশে কোনো কোনো রাষ্ট্রপতির সহসা ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা গেছে। একাধিক রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হলেও সব ক্ষেত্রে তা ছিল না। রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি তাঁর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগে ব্রতী হলে তাঁকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছাড়া অপসারণ করা কঠিন।

রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে একজন দুর্বল রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের মে মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের অনুকূলে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস দ্রুততার সঙ্গে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার ও তাঁর অনুগত কয়েকজন পদস্থ সেনা অফিসারকে চাকরিচ্যুত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এজন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর শেষ মেয়াদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে কারচুপি, সহিংসতার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি জানায় নির্বাচন বাতিল করতে। যদিও নির্বাচনসংক্রান্ত এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের, আওয়ামী লীগ কেন রাষ্ট্রপতির কাছে এই দাবি উত্থাপন করেছিল, তা রহস্যাবৃত। রাষ্ট্রপতি এটি তাঁর এখতিয়ারবহির্ভূত এবং এক বিবৃতি দিয়ে এ ব্যাপারে তাঁর অক্ষমতার কথা জানালে আওয়ামী লীগ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, অক্টোবরের নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকাকে বিতর্কিত বলে বর্ণনা করে। আওয়ামী লীগের বিবৃতিতে রাষ্ট্রপতিকে আক্রমণ করে এমন কথাও বলা হয়েছিল যে ‘শেখ হাসিনা তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, তার প্রতিদান তিনি কীভাবে দিয়েছেন, ইতিহাস তার বিচার করবে।’ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পাল্টা বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের চোখে তাদের ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তিনি ফেরেশতা, না হলে তিনি শয়তান।’

বিএনপি সরকার ২০০১ সালে বিএনপির  অন্যতম সংগঠক, প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি রাষ্ট্রের আলংকারিক সাংবিধানিক প্রধানের পরিবর্তে মোটামুটি তাঁর পদকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার চেষ্টা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সরকার এবং বিএনপিকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় ছিল সশস্ত্র বাহিনীসম্পর্কিত সরকারের একটি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করার জন্য জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর মাজার জিয়ারতে যাননি এবং মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রদত্ত বিবৃতিতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেননি। তাঁর বক্তৃতা ও বাণীতে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ব্যবহার বর্জন করেছিলেন। বিএনপির ওই সময়ের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি দলের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ক্ষমাহীন ব্যাপার। ভুলেরও একটা মাত্রা থাকে। তিনি সেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন।’ বিএনপি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ওপর আস্থা হারালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ওপর বিএনপি সরকারের আস্থা রাখা কঠিন ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ করার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি তা অস্বীকার করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বলেছেন এবং তারেক রহমান এবং বিএনপির প্রশংসা করেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ক্ষমতা যত সীমিতই হোক, আইনানুগভাবে তিনি অনেক কিছু করতে পারেন না। মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর দলীয় আনুগত্যের কারণে যদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপ্রধান, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সংগত কাজ করেননি। এ অভিযোগ যদি সত্য না-ও হয়ে থাকে তাহলেও বিএনপি সরকার তাদের দলীয় আদর্শবিরোধী ও আস্থাভাজন নন এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর পদে রেখে সার্বক্ষণিক সংশয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে পারে না। অতএব তাঁকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দিয়ে থাকলেও বিএনপি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে।  

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

অর্থনীতির নয়া অভিযাত্রায় সরকার : প্রত্যয়ী প্রধানমন্ত্রী

মোস্তফা কামাল
অর্থনীতির নয়া অভিযাত্রায় সরকার : প্রত্যয়ী প্রধানমন্ত্রী

গতি মন্থর হলেও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরছে একটু একটু করে। রূপান্তরিত দেশ গড়তে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যতিক্রম বাদে রাজনৈতিক সহাবস্থানও মন্দ নয়। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তানসহ আশপাশের দেশের তুলনায় তা ইতিবাচক। সামরিক খাতে ধরা দিচ্ছে কিছু আশাজাগানিয়া খবর। সামরিক শক্তিধর বিশ্বের ১৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৪০তম স্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালে বার্ষিক গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের প্রতিবেদন এ বার্তা দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। যে সকল দেশ দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ১২তম। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের প্রতিবেদন করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তির বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লেষণ করে।

বিভিন্ন খাতে নানা সূচকে এমন অগ্রগতির মাঝে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও চেষ্টা অর্থ খাত নিয়ে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারি গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এই লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ কিছু খাত ও সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা, ওষুধ শিল্প ও উন্নত টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লজিস্টিকস অন্যতম। লক্ষ্য পূরণে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা সহজ এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। সরকারি সেবা খাতগুলোকে সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশনের চেষ্টা চলছে। যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং উৎপাদন হাব করার চেষ্টাও চলমান। তৈরি পোশাক শিল্পকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টাও দৃশ্যমান। সেই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতায় অগ্রাধিকার।

এ অভিযাত্রায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সংশ্লিষ্ট টার্গেট গ্রুপকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খোলামেলা জানিয়েছেন তার আন্তরিকতার কথা। বলেছেন, ‘নতুন ও দূরদর্শী বিএনপি সরকার চায়, আপনারা বাংলাদেশে আসুন, নতুন উদ্যোগ নিন এবং ব্যবসা প্রসারিত করুন’। দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ করে বলেছেন, তারা মূলধন বিনিয়োগ করলে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে তাদের পাশে থাকবে। এটি কেবল আশ্বাস নয়, সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার। বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, এর পাশাপাশি আমাদের অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুদৃঢ় ভিত্তিও রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে একটি দ্রুত বিকাশমান বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, একঝাঁক তরুণ ও পরিশ্রমী মানবসম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এ বাস্তবতা বাংলাদেশকে একটি টেকসই ও স্থায়ী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেবে বলে বিশ্বাস তার।

প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় দেশকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে বেসরকারি খাতের গতিশীলতায় পরিচালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা। বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, ব্যাবসায়িক চেম্বার, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নীতি-নির্ধারকরা চান, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগের সুদৃঢ় আইনি সুরক্ষা, আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সহজীকৃত কর ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে অর্জিত মুনাফা প্রত্যাহারের নির্বিঘ্ন প্রক্রিয়া, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো। সরকার তাদের পালস বুঝেছে। এরই মধ্যে সেই দৃষ্টে কাজও শুরু করেছে। লাল ফিতার যন্ত্রণা কাটাতে আইনি ও রেগুলেটরি কাঠামোর আধুনিকায়ন চলছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারে নেওয়া হয়েছে আরো বিভিন্ন ব্যবস্থা। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও উন্নত করা হচ্ছে। কর ও ভ্যাট প্রশাসনকে সহজ এবং মুনাফা অর্জনের পর তা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ঝামেলামুক্ত করার দিকেও বিশেষ অ্যাটেনশন দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের প্রায় ৬০০ বিশিষ্ট প্রতিনিধিকে প্রধানমন্ত্রী তার এ বিষয়ক আন্তরিকতা ও চেষ্টার কথা জানিয়েছেন। পরিষ্কার করে বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, যেকোনো ব্যবসা কেবল উদ্যোক্তার দক্ষতা বা রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সফল হতে পারে না, ব্যবসার সাফল্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে সরকারের প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতিমালার ওপর। সম্মেলনটির দিন দুয়েকের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্য পদক্ষেপ। শ্রমমান ও জোরপূর্বক শ্রম-সংক্রান্ত তদন্তের পর ৮৬ দেশের ওপর নতুন মার্কিন শুল্ক নীতি। সেখানে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান বাংলাদেশের।

এখানে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর হলো, দেশটিকে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে পড়তে হয়েছে সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশ শুল্কের আওতায়। তা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকার একটি আভাস। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন, কেবল কম শুল্ক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না। শ্রমমান উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এই সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে আশাবাদ জানিয়েছে, শ্রমমান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সহযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় বাংলাদেশ নিম্ন শুল্কস্তরে স্থান পেয়েছে। ফলে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত অর্থবছরে দেশটিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে এই বাজার থেকে। ফলে মার্কিন বাণিজ্যনীতির যেকোনো পরিবর্তন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন যাই হোক, বর্তমান পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজারও খুঁজতে হবে। রাশিয়া, লাতিন আমেরিকা, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। এসব অঞ্চলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি একটি ট্যারিফ রেট কোটা ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও টেক্সটাইল উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে সেকশন ৩০১-এর অতিরিক্ত শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়া যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরো বাড়তে পারে এবং মার্কিন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কম শুল্ক সুবিধা কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অংশীদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় শ্রমমান, উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চাপও বাড়ছে। সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের এ সন্ধিক্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমন্ত্রণ কূটনীতির সমান্তরালে অর্থনীতির আরেক বার্তা। বিশ্লেষণের অনেক উপাদান। দিল্লিতে আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর হবে সম্মেলনটি। ১১ সদস্যবিশিষ্ট ব্রিকসে বাংলাদেশ সদস্য না হলেও বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। এই মুহূর্তে ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্রিকসের সদস্য। ব্রিকস জোটে যোগ দিলে বা এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ও কৌশলগত কিছু সুবিধা রয়েছে, যার মধ্যে সহজ ঋণ প্রাপ্তি, বিকল্প বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো অন্যতম।

এ জোটে একদিকে যেমন নতুন অর্থায়ন ও বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা আছে, অন্যদিকে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তার চেয়ে বড় কথা বাংলাদেশকে নানাভাবে ফ্যাক্টর তথা ওজনদার ভেবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ আমন্ত্রন। চীন, রাশিয়া, ভারতসহ পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে অনেক দিন থেকেই চলছে নানা আলোচনা। বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণের পাশাপাশি সামনে আসছে অর্থনীতির বিভিন্ন লাভ-ক্ষতির হিসাবও।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি : স্বপ্ন, সাহস ও বাস্তবতার সমন্বয়

সিরাজুল ইসলাম
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি : স্বপ্ন, সাহস ও বাস্তবতার সমন্বয়
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- আমরা কী কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের, শিল্পভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হব? এই প্রশ্নের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে এনেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার জন্য সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ফরেন ইনভেস্টমেন্ট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে দেওয়া তার বক্তব্য শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে কোনো আনুষ্ঠানিক আহ্বান ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকারের ঘোষণা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই লক্ষ্য কি বাস্তবসম্মত? উত্তর হলো- সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় পাঁচশ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আগামী আট বছরে অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। এটি অর্জন করতে হলে শুধু বার্ষিক উচ্চ প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উৎপাদনশীলতার ব্যাপক বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, রপ্তানির বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সবচেয়ে বড় কথা—বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে যেসব অগ্রাধিকার খাতের কথা বলেছেন- নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকস—এসবই বিশ্ব অর্থনীতির আগামী দশকের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে বাংলাদেশের এরইমধ্যে কিছু শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সঠিক নীতি সহায়তা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পেলে এই খাতগুলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎস হতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রায় ২০ কোটি মানুষের এই দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার এখনো অনেক বেশি। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ যখন দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'। কিন্তু এই সম্ভাবনা কেবল তখনই সম্পদে পরিণত হবে, যখন তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির উপযোগী দক্ষতা দেওয়া যাবে।

মনে রাখতে হবে—শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে আগামী দশকের অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন হাবে পরিণত করার যে লক্ষ্য তুলে ধরেছেন, সেটিও সময়োপযোগী। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদন কেন্দ্র বৈচিত্র্যের কারণে বহু আন্তর্জাতিক কম্পানি নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য খুঁজছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।
তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু বক্তৃতা নয়, বাস্তব সংস্কারই হবে মূল চাবিকাঠি।

প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের সামনে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন- আইনি সুরক্ষা, ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কর ব্যবস্থার সরলীকরণ, মুনাফা নির্বিঘ্নে নিজ দেশে নেওয়ার সুযোগ, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো—এসবই বহু বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রধান দাবি ছিল। ইতিবাচক দিক হলো, সরকার এসব দাবিকে স্বীকার করেছে এবং বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রশাসনিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। একটি শিল্প স্থাপনে কখনো কখনো কয়েক ডজন সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এতে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি বিনিয়োগ ব্যয়ও বেড়ে যায়। ডিজিটাল সরকারি সেবা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ পরিবেশে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।

অবকাঠামো উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর, সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কেবল শ্রম ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না; পণ্য কত দ্রুত, কত কম খরচে এবং কত নির্ভরযোগ্যভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হলেও ভবিষ্যতের জন্য এটিকে আরো বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। উচ্চমূল্যের টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, মেডিকেল টেক্সটাইল, পরিবেশবান্ধব পোশাক এবং নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারলে রপ্তানি আয়ে নতুন মাত্রা যোগ হবে। একই সঙ্গে ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং ইলেকট্রনিক্স খাতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ- ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর- তাদের শিল্প বিপ্লবের বড় অংশই বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশও যদি সেই পথ অনুসরণ করতে চায়, তাহলে নীতির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, শুধু উদ্যোক্তার দক্ষতা নয়; সরকারের প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতিও ব্যবসার সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সফল অর্থনীতি গড়ে ওঠে তখনই, যখন সরকার নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাত উৎপাদক এবং জনগণ অংশীদারে পরিণত হয়।

তবে এই যাত্রাপথে কিছু কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন- সবকিছুই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিক নীতি, দক্ষ প্রশাসন, জবাবদিহি এবং সময়মতো সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান। এই প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অর্থনীতির আকার বড় হলেও যদি তার সুফল সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করা এই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য অংশ।

সবশেষে বলা যায়, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কোনো জাদুকরী সংখ্যা নয়; এটি একটি দিকনির্দেশনা। এই লক্ষ্য জাতিকে বড় করে ভাবতে শেখায়, নীতিনির্ধারকদের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়- বাংলাদেশ বড় হতে চায়, আরো দ্রুত এগোতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ঘোষণাকে যদি কার্যকর সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে ২০৩৪ সালের বাংলাদেশ আজকের বাংলাদেশের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার দেশ হয়ে উঠতে পারে।

ইতিহাস বলে, বড় জাতিগুলো বড় স্বপ্ন দেখেই এগিয়েছে। আমাদের এখন প্রয়োজন এমন স্বপ্নকে পরিকল্পনায়, পরিকল্পনাকে কর্মে এবং কর্মকে ফলাফলে রূপান্তর করার। যদি সরকার, বেসরকারি খাত এবং জনগণ একই লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকবে না; বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

জ্বালানি সংকটের সমাধান, দীর্ঘ লাইন ভাঙার কার্যকর পথ | কালের কণ্ঠ