অবশেষে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধানের পদ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত বিশ্বস্ত ব্যক্তিটিও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্থান পাওয়ার জন্য চলে গেলেন। তাঁকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থাকা বিএনপি নেতৃত্বের পক্ষেও সহজ হলো রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক ও শীর্ষ সাংবিধানিক পদে তাদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে আসীন করার। গত ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে গুঞ্জন শুরু হয়, কে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হবেন! সম্ভাব্য নামগুলো এখন আরও বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদকে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করতে হবে। অতএব মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে বিএনপি সরকারকে আগাম সুযোগ দিয়েছেন তাদের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের। আশা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি সংসদীয় দল এমন একজনকে মনোনীত করতে চায়, যাতে তিনি সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত হতে পারেন। সেই লক্ষ্যে বিএনপি বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছার যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সাংবিধানিক সংকটের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে আসছে এবং দেশের তথাকথিত ‘ক্রান্তিকাল’-এর কখনো অবসান ঘটছে না। অতএব সময়ের এক এক পর্যায়ে সংবিধানে সংসদীয় সরকারপদ্ধতি, রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থার তালগোলের মধ্যে দেশবাসী রাষ্ট্রের শীর্ষ পদটিতে কখনো নির্বাহী ক্ষমতাহীন, কখনো সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে আসীন এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগকারী জেনারেল, কখনোবা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিকে দেখেছেন। দুজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে, একজন সামরিক একনায়ককে রাজপথের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁদের শাসনের অবসান ঘটানো হয়েছে। বেশ কজন রাষ্ট্রপতিকে বন্দুকের নলের মুখে অথবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে পদ থেকে হটানোর ঘটনাও ঘটেছে। ১৯৯১ সালের পর যদিও জাতীয় সংসদের সদস্যদের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীরাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি হয়ে আসছেন। কিন্তু এর মাঝেও কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অথবা বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্যের হেরফের হলে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন একাধিক ব্যক্তির নাজেহাল হওয়ার ইতিহাসও বাংলাদেশেই বিদ্যমান।
কোনো কোনো রাষ্ট্রপতি একাধিক মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের অনুপস্থিত রাষ্ট্রপ্রধান ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান এবং পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। খুব কমসংখ্যক রাষ্ট্রপতির পক্ষেই তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে। একটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মাত্রা বিচার করার ক্ষেত্রে সাড়ে ৫৫ বছর বয়সি বাংলাদেশে ২৩তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ বিবেচনা করাই যথেষ্ট। রাষ্ট্রপতিদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদের গড় হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিজন রাষ্ট্রপতি গড়ে আড়াই বছর দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। আর মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ নতুন একজন রাষ্ট্রপতি উপহার পাবে, যিনি হবেন রাষ্ট্রের ২৪তম রাষ্ট্রপতি। পাশের দেশ ভারতকেও অনেক উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক ধারা বহাল রাখার ক্ষেত্রে তারা কোনো আপস করেনি। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সময় বাদ দিলে গত ৭৬ বছরে বর্তমান রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু পর্যন্ত ভারপ্রাপ্তসহ মাত্র ১৮ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্রৌপদী মুর্মু ভারতের ১৫তম রাষ্ট্রপতি। উত্তম দৃষ্টান্ত গ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরা কে কত দিন তাঁদের পদে ছিলেন, তা সামনে থাকলে পাঠকদের বোঝা সহজ হবে যে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় অস্থিতিশীলতার মধ্যে কাটিয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান (প্রবাসী সরকারের অনুপস্থিত রাষ্ট্রপতি) : ২৭০ দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত) : ২৭০ দিন, আবু সাঈদ চৌধুরী : ১ বছর ৩৪৬ দিন, মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী : ১ বছর ৩২ দিন, শেখ মুজিবুর রহমান : ২০২ দিন, খোন্দকার মোশতাক আহমদ : ৮৩ দিন, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম : ১ বছর ১৬৬ দিন, লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান : ৪ বছর ৩৯ দিন, বিচারপতি আবদুুস সাত্তার : ২৯৮ দিন, বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরী : ১ বছর ২৫৮ দিন, লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ : ৬ বছর ৩৬০ দিন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ (ভারপ্রাপ্ত) : ১০৪ দিন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ : ২০৪ দিন, আবদুর রহমান বিশ্বাস : ৫ বছর, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ : ৫ বছর ৩৬ দিন, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী : ২১৯ দিন, মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার (ভারপ্রাপ্ত) : ৭৭ দিন, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ : ৬ বছর ১৫৯ দিন, জিল্লুর রহমান : ৪ বছর ৩৬ দিন, মোহাম্মদ আবদুল হামিদ : ১০ বছর ৪১ দিন, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন : ৩ বছর ৯১ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে পদাধিকারবলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত) হয়েছেন।
মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করে ভলোই করেছেন। পদত্যাগের জন্য তাঁর ওপর সরকারের কোনো চাপ ছিল কি না, তা তখনই জানা যাবে, যখন তিনি কথা বলার মতো নিরাপদবোধ করবেন। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বিপরীত আদর্শের রাজনৈতিক সরকারের সুরে সুরে কথা বলতে বাধ্য হওয়ায় তাঁর মধ্যে অন্তর্দহন চলছিল। তিনি একজন পরীক্ষিত ও কমিটেড আওয়ামী লীগার। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্ভবত এজন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তিনি প্রটোকল ভেঙে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার পদধূলি গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতেও দ্বিধা করেননি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সাহাবুদ্দিন মাত্র ১৫ মাস সময় পেয়েছিলেন শেখ হাসিনার গুণগান করার। কিন্তু প্রায় রাতারাতি সব পাল্টে যাওয়ায় ২০২৪ সালের পর তাঁকেই শেখ হাসিনার সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ সরকার বলতে হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ স্বীকার করতে হয়েছে, এমনকি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বক্তৃতা শেষ করতে হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বিরোধী দল, এমনকি বিএনপির অনেকে তাঁকে আপন ভাবতে পারেননি।
কয়েক দিন ধরে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে দেশের সব মহলে আলোচনা ও গুজব ছিল তুঙ্গে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দলবলসহ দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণার সঙ্গে গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের লন্ডন অবস্থানকালে হাসিনার সঙ্গে টেলিফোন আলাপের খবর ছিল সব আলোচনার ভিত্তি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হাসিনার সঙ্গে তাঁর আলাপের কথা জানার পর তাঁকে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়ে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সাহাবুদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই-একজনের সঙ্গে এ ধরনের আলাপের কথা অস্বীকার করলেও সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। তবে এটা ঠিক যে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘোষণার পর তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা রাজনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এর রাজনৈতিক বাস্তবতাও ছিল। সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনেই বাংলাদেশে কোনো কোনো রাষ্ট্রপতির সহসা ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা গেছে। একাধিক রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হলেও সব ক্ষেত্রে তা ছিল না। রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি তাঁর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগে ব্রতী হলে তাঁকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছাড়া অপসারণ করা কঠিন।
রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে একজন দুর্বল রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের মে মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের অনুকূলে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস দ্রুততার সঙ্গে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার ও তাঁর অনুগত কয়েকজন পদস্থ সেনা অফিসারকে চাকরিচ্যুত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এজন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর শেষ মেয়াদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে কারচুপি, সহিংসতার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি জানায় নির্বাচন বাতিল করতে। যদিও নির্বাচনসংক্রান্ত এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের, আওয়ামী লীগ কেন রাষ্ট্রপতির কাছে এই দাবি উত্থাপন করেছিল, তা রহস্যাবৃত। রাষ্ট্রপতি এটি তাঁর এখতিয়ারবহির্ভূত এবং এক বিবৃতি দিয়ে এ ব্যাপারে তাঁর অক্ষমতার কথা জানালে আওয়ামী লীগ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, অক্টোবরের নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকাকে বিতর্কিত বলে বর্ণনা করে। আওয়ামী লীগের বিবৃতিতে রাষ্ট্রপতিকে আক্রমণ করে এমন কথাও বলা হয়েছিল যে ‘শেখ হাসিনা তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, তার প্রতিদান তিনি কীভাবে দিয়েছেন, ইতিহাস তার বিচার করবে।’ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পাল্টা বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের চোখে তাদের ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তিনি ফেরেশতা, না হলে তিনি শয়তান।’
বিএনপি সরকার ২০০১ সালে বিএনপির অন্যতম সংগঠক, প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি রাষ্ট্রের আলংকারিক সাংবিধানিক প্রধানের পরিবর্তে মোটামুটি তাঁর পদকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার চেষ্টা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সরকার এবং বিএনপিকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় ছিল সশস্ত্র বাহিনীসম্পর্কিত সরকারের একটি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করার জন্য জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর মাজার জিয়ারতে যাননি এবং মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রদত্ত বিবৃতিতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেননি। তাঁর বক্তৃতা ও বাণীতে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ব্যবহার বর্জন করেছিলেন। বিএনপির ওই সময়ের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি দলের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ক্ষমাহীন ব্যাপার। ভুলেরও একটা মাত্রা থাকে। তিনি সেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন।’ বিএনপি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ওপর আস্থা হারালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ওপর বিএনপি সরকারের আস্থা রাখা কঠিন ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ করার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি তা অস্বীকার করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বলেছেন এবং তারেক রহমান এবং বিএনপির প্রশংসা করেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ক্ষমতা যত সীমিতই হোক, আইনানুগভাবে তিনি অনেক কিছু করতে পারেন না। মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর দলীয় আনুগত্যের কারণে যদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপ্রধান, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সংগত কাজ করেননি। এ অভিযোগ যদি সত্য না-ও হয়ে থাকে তাহলেও বিএনপি সরকার তাদের দলীয় আদর্শবিরোধী ও আস্থাভাজন নন এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর পদে রেখে সার্বক্ষণিক সংশয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে পারে না। অতএব তাঁকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দিয়ে থাকলেও বিএনপি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক




