ক্লাস শেষ, এবার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হওয়ার পালা। ঠিক এমন সময় মাথার ওপর হঠাৎ বিকট শব্দে আছড়ে পড়ল একটি যুদ্ধবিমান। মুহূর্তেই ক্ষতবিক্ষত হলো ৩৬ তাজা সবুজ প্রাণ, ফুটবার আগেই ঝরে গেল ডজন ডজন অমূল্য ফুল।
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির আজ এক বছর পূর্ণ হলো। সময়ের ব্যবধানে ক্যালেন্ডারে ১২টি মাস পেরিয়ে গেলেও, এখনো বেঁচে ফেরা শিক্ষার্থীরা বের হতে পারেনি সেই মানসিক আতঙ্ক ও ট্রমা থেকে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, সোমবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই (F-7BGI) মডেলের একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল কোমলমতি শিক্ষার্থী। এতে আহত হন আরো শতাধিক মানুষ।
স্কুলের জানালাটা এখন সব সময় বন্ধই থাকে, ঘরে সূর্যের আলো ঢোকার কোনো অনুমতি নেই। দিন শব্দটাই যেন হারিয়ে গেছে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে গুরুতর আহত শিক্ষার্থী আহনাফ ইসলাম নিলয়ের জীবন থেকে। এক বছর ধরে কেবল অন্ধকারের সঙ্গেই তার বসবাস।
চিকিৎসকদের পরামর্শে আরো অন্তত দেড় বছর তাকে এভাবে সূর্যের আলো থেকে দূরে কাটাতে হবে, কারণ সূর্যের প্রতিটি কিরণ তার ঝলসানো ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। নিলয় বলে, ‘ডাক্তাররা বলছেন আমার গায়ে সূর্যের আলো লাগানো যাবে না। তাতে ত্বকের আরো ক্ষতি হতে পারে।’
শুধু শরীরের ক্ষত নয়, চোখের সামনে বন্ধুকে পুড়তে দেখার অসহায় স্মৃতিও নিলয়কে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিদিন। সে জানায়, ‘ও বলছিল, নিলয়, আমাকে বাঁচাও। আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছি।’ আমি দেখছিলাম ও পুড়ছে, কিন্তু ওকে ধরে বের করার কোনো উপায় খুঁজে পাইনি।’
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জারিফ ফারহান এখন শুধুই স্মৃতি। তার ঘরটি এখনো আগের মতোই সাজানো, নিজের হাতে লেখা অক্ষরগুলো যেন অপেক্ষায় আছে তার ফেরার। সেদিন মায়ের সঙ্গে অভিমান করে টিফিন আর পানির বোতল না নিয়েই স্কুলে গিয়েছিল জারিফ।
তার মা আজও অশ্রুসজল চোখে কান্নাভেজা কণ্ঠে প্রশ্ন করেন, ‘সেদিন যাওয়ার সময় অভিমান করে একটা কথাও বলেনি। টিফিনও নেয়নি। আমার জারিফটা সেদিন টিফিন খেয়েছিল কি না, তা আজও জানতে পারিনি। ওর অনেক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু কেউ বলতে পারেনি।’
একইভাবে সন্তান হারানো তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়া কিংবা তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তারের জীবনেও সময় থমকে আছে। প্রতিদিন ছোট ছেলেকে স্কুলে আনতে গিয়ে হাজারো শিক্ষার্থীর মাঝে আজও তানভীরের মুখটি খুঁজে ফেরেন তার বাবা।
ট্র্যাজেডির প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে দুই দিনের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল, স্মৃতিচারণা, গার্ড অব অনার এবং এক মিনিট নীরবতা পালন। দুর্ঘটনাস্থলে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মৃতিকথা প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থল উন্মুক্তকরণ : দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসের দুর্ঘটনাস্থলটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।
গার্ড অব অনার ও পুষ্পস্তবক অর্পণ : দুর্ঘটনাস্থলে স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার প্রদান করেন এবং নিহতদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এক মিনিট নীরবতা ও দোয়া : নিহত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পাশাপাশি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
স্মৃতিপ্রদর্শনী ও স্মৃতিচারণা : নিহতদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিবার্তা ও শোকগাথা প্রদর্শন করা হয়। সহপাঠী ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে স্মৃতিকথা তুলে ধরেন।
বিকেলের স্মরণসভা : স্কুল শাখার উদ্যোগে আয়োজিত বিকেলবেলার স্মরণসভায় নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং অভিভাবকেরা উপস্থিত থেকে অংশ নেন।
শাখাসমূহে বিশেষ ছুটি : এই বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তরাসহ মোট ১৬টি শাখায় ছুটি ঘোষণা ও শোক পালন করা হয়।
শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যেতে হবে : ডা. জুবাইদা রহমান
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীদের স্মরণে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি আহত ও স্বজনহারাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আজ এমন একটা দিন, যেদিন আমাদের দেশ ও জাতি গভীরভাবে শোকাহত, মর্মাহত। শোককে শক্তিতে পরিণত করে আপনারা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, জাতি তা কোনো দিন ভুলবে না।’
তিনি বলেন, ‘ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে শোকাহত করেছে। তবে শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং আহতদের সাহস ও দৃঢ়তা থেকে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে হবে।’
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘প্রথমেই আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো আমাদের ভাই-বোন ও ছোট্ট বন্ধুদের। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।’
ভয়াবহ স্মৃতি কাটিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াইকে অনুপ্রেরণার উৎস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও আপনারা যেভাবে সাহস ও সংকল্প নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তা আমাদের সবার জন্য প্রেরণা। সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সাহসিকতার সঙ্গে ভয়কে জয় করার যে দৃষ্টান্ত আপনারা স্থাপন করেছেন, দেশ ও জাতি তার জন্য কৃতজ্ঞ।’
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিহতদের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘নিহত তাসনিয়ার বাবার বক্তব্য শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। এক বছর আগের সেই দিনে শিক্ষিকা মেহরিন চৌধুরী নিজের জীবনের পরোয়া না করে সন্তানের মতো শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আহত শিক্ষার্থীদের ফলোআপ চিকিৎসা চলছে এবং প্রয়োজন হলে তাদের আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সে সময় থেকে শুরু করে নিয়মিত তাদের খোঁজখবর রাখছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।