kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩০ নভেম্বর ২০২১। ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

যানের গতিই কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ

সজিব ঘোষ   

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যানের গতিই কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ সঠিক গতিতে যান চলাচল না করা। যান চলাচলে অতিরিক্ত গতি কিংবা কম গতি দুটিই ক্ষতিকর। দুটিই দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির জন্য দায়ী।

নগর, আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে যান চলাচলে নির্দিষ্ট গতি নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না কিংবা মানা যাচ্ছে না। নগর সড়কে যান চলাচলে গতি থাকার কথা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৫ কিলোমিটার। সেখানে ঢাকা শহরে যানজটের কারণে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে যান চলাচলের উপায় নেই।

আবার আঞ্চলিক সড়কে ৪০ কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সড়ক ভাঙাচোরা থাকায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে যান চালানো সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে মহাসড়কে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করে দিলেও যান চলাচল করে ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে। একই অবস্থা এক্সপ্রেসওয়েতে (ঢাকা-মাওয়া)। ৮০ কিলোমিটার গতিতে যান চলাচলের নির্দেশনা থাকলেও চলাচল করে ৯০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে।

২০১৬ সালে জাইকার এক সমীক্ষা বলছে, ঢাকায় যানের গতি ঘণ্টায় মাত্র সাত কিলোমিটার। আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এআরআই) বলছে, ঢাকায় ‘পিক টাইমে’ যানের গতি থাকে ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ কিলোমিটার।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে পুরো দেশের তুলনায় ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের পরিসংখ্যান বলছে, এই তিন বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৮৫টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৯৪৮ জন। অথচ ঢাকার সড়কে যানের গতি সবচেয়ে কম।

মহাসড়কে পথচারীর মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এআরআইয়ের এক গবেষণা তথ্য বলছে, সব ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার ৮৪ শতাংশ ঘটে অতিরিক্ত গতির কারণে। সোজা পথে দুর্ঘটনা ঘটে ৬৭ শতাংশ, বাকিটা সড়কের বাঁকে। সোজা পথে যানের গতিও থাকে বেশি। ওই গবেষণায় দেখা যায়, ৩০ কিলোমিটার গতির একটি যান যদি কোনো মানুষকে ধাক্কা দেয় তাহলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে ৯৫ শতাংশ। এই গতি ৪০ হলে বাঁচার সম্ভাবনা থাকে ৪৫ শতাংশ। আর যানের গতি ৫০ কিলোমিটার হলে ধাক্কা লাগা ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে মাত্র ৫ শতাংশ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের চিত্রে পরিষ্কার বোঝা যায়, গাড়ির গতি সামান্য বাড়লে মানুষের বাঁচার সুযোগ কত কমে যায়। কিন্তু মহাসড়কগুলোয় ৮০-৯০ কিলোমিটার গতির নিচে কোনো যান চলাচল করে না।’

ঢাকায় যান চলাচলের গতি সবচেয়ে কম। তারপরও সেখানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও মৃত্যু হচ্ছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে হাদিউজ্জামান বলেন, ‘যান চলাচলের গতি যেমন অতিরিক্ত হওয়া উচিত না, মাত্রাতিরিক্ত কম হওয়াও উচিত না। এই দুটিই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।  ঢাকার যে অবস্থা তাতে ২০৩৫ সালে ঢাকায় মানুষের হাঁটার গতি আর যান চলার গতি সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন  বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার অনেকগুলো কারণ। তবে গতি যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে দুর্ঘটনা হলেও ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, যত গতি তত ক্ষতি। মহাসড়কে অতিরিক্ত গতির কারণেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ শতাংশ গতি কমানো গেলে অন্তত ২০ শতাংশ ক্ষতি কমানো যাবে।’

এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ শুক্রবার জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২১। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে গতিই একমাত্র কারণ না। গতি ছাড়াও আরো অনেক কারণ আছে। আমরা প্রতিবছরই নানা প্রতিপাদ্য ঠিক করি। গতি নিয়ে সচেতন করতে এবার এই প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে।’



সাতদিনের সেরা