আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন প্রধান সমন্বয়কারী জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তার বক্তব্যে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা, শ্রম আইন সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শ্রমব্যবস্থা গড়ে তুলতে বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি ৩০ মে ২০২৬ তারিখ রাত ১টা ৪০ মিনিটে সুইজারল্যান্ডের জেনেভার উদ্দেশে যাত্রা করেন। বাংলাদেশের অনান্য শ্রমিক সংগঠন ও বাংলাদেশ সরকার তাকে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনীত করে।
উল্লেখ্য, তিনি একজন শ্রমিক নেতা এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৩১ মে থেকে ১২ জুন ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য আইএলওর ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করছেন।
সম্মেলনের অংশ হিসেবে ৮ জুন ২০২৬ তারিখ বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে (সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান সামার টাইম -সিইএসটি) এবং বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাস্থ জাতিসংঘ দপ্তরের টেম্পাস হলে বক্তব্য দেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি আইএলও মহাপরিচালকের সময়োপযোগী ও চিন্তাশীল প্রতিবেদনের প্রশংসা করেন এবং ন্যায়বিচার, মর্যাদা, সমতা ও সবার জন্য শোভন কাজ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইএলওর মূলনীতি ও আদর্শের প্রতি বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকে তিনি শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আস্থা ও স্বীকৃতির প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ন্যায্য দাবি-দাওয়া উপস্থাপনের জন্য সম্মিলিত আলোচনায় অংশগ্রহণের অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থান হ্রাস, যুব বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়গুলো নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের প্রায় ৭ কোটি ৩৫ লাখ কর্মশক্তি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সুরক্ষায় অধিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দক্ষতা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ভিত্তিক একটি বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
তিনি ডিজিটাল বৈষম্য ও দক্ষতার ব্যবধান দূর করা, এআই প্রযুক্তিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপদ ও দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনোই এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যা মানব মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে বা সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়-এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংহতি ও কার্যকর সহযোগিতা অপরিহার্য।
প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অর্থনীতিতে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা, স্বীকৃতি ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি ‘প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে শোভন কাজ’ বিষয়ক প্রস্তাবিত আইএলও কনভেনশনকে স্বাগত জানান। পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সম্প্রতি দুটি মৌলিক কনভেনশনসহ আইএলওর তিনটি কনভেনশন অনুমোদন করেছে। তিনি শ্রম আইন সংস্কার, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সংলাপ আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
সবশেষে তিনি সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও টেকসই কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বিশ্বের সকল শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে তার বক্তব্য শ্রমিক অধিকার, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরেছে।







