ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি, ধর্মকে ব্যবহার করে ভণ্ডামি—এ পথ থেকে আমাদের ফিরতে হবে, যে যেখানেই থাকি না কেন।
মো. আসাদুজ্জামান, আইনমন্ত্রী

ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি, ধর্মকে ব্যবহার করে ভণ্ডামি—এ পথ থেকে আমাদের ফিরতে হবে, যে যেখানেই থাকি না কেন।
মো. আসাদুজ্জামান, আইনমন্ত্রী

‘আসাদ গেট থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যেতে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া নিয়ে থাকে। কিন্তু এখন কোনো চালক ৫০০ টাকার নিচে রাজি হচ্ছে না!’
আক্ষেপ করে কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন অর্পিতা ইসলাম নামের এক যাত্রী। গতকাল শনিবার রাজধানীর আসাদ গেট মোড়ে হন্যে হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁজছিলেন তিনি। আরো কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে ৪২০ টাকা ভাড়ায় একজন অটোরিকশাচালককে রাজি করাতে পারলেন।
শুধু এই অর্পিতাই নন, গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যাত্রীদের দুর্ভোগের একই চিত্র দেখা যায়। গ্যাসসংকট থাকায় ছোট-বড় সব ধরনের যাত্রী পরিবহন যান কম ছিল। একই সঙ্গে ভাড়াও ছিল বেশি।
রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের জন্য পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করায় চালকদের একটি বড় অংশ দিনের স্বাভাবিক সময় রাস্তায় থাকতে পারছে না। ফলে গাড়ির সংখ্যা কমে অ্যাপভিত্তিক ভাড়াও বাড়ছে।
গতকাল রাজধানীর খিলক্ষেত, নদ্দা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর রোড, মহাখালী, তেজগাঁও ও প্রগতি সরণির বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোথাও স্টেশন একেবারেই বন্ধ, কোথাও আবার গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে কয়েকটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়ার পর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে বেশির ভাগ চালককে দিনের যাত্রী পরিবহনের বদলে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতে হয়েছে।
শাহাদাৎ হোসেন নামের একজন চালক বলেন, আগে একটি গাড়ি দিনে একাধিকবার পাম্পে গেছে গ্যাস নিতে, কিন্তু সময় লাগেনি। এখন একবার গ্যাস নিতেই কয়েক ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। এতে গাড়ির ব্যবহার কমে যাচ্ছে, চালকের আয় কমছে এবং যাত্রীদেরও বিড়ম্বনা বাড়ছে।
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বেশির ভাগ পাম্পে ‘গ্যাস নেই’ লেখা ঝুলছে। যেসব স্টেশনে গ্যাস মিলছে, সেখানে স্বল্প চাপের কারণে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পাম্পে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের দীর্ঘ অপেক্ষা : মিরপুর রোডের দুটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও চাপ কম থাকায় সেখানে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও আশানুরূপ গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেন চালকরা।
তেজগাঁও, বাড্ডা ও প্রগতি সরণির কয়েকটি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কর্মীরা অলস বসে আছেন। কোথাও পাম্পের কার্যক্রম বন্ধ, আবার কোথাও সামান্য গ্যাস এলেও দীর্ঘ লাইনের কয়েকটি গাড়িতে সরবরাহ দেওয়ার পরই তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
উবারের চালক শাহেদ হোসেন কুড়িলের প্রগতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের লাইনে অপেক্ষা করছিলেন। গতকাল সকালে লাইনে দাঁড়ানোর পর দুপুর পর্যন্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিন-চার দিন ধরে একই অবস্থা। আগে সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় থাকত। এখন গাড়ি চালিয়ে খরচের টাকাও উঠছে না। গাড়ির মাসিক ভাড়া ৪০ হাজার টাকা হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল।
বাস কম, যাত্রীদের হুড়াহুড়ি : গতকাল অন্যান্য দিনের তুলনায় ঢাকায় বাস চলাচল ছিল বেশ কম। মিরপুর, পল্লবী, বিমানবন্দর রোড ঘুরে যাত্রী পরিবহনকারী বাস কম দেখা গেছে। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে সব সময় একাধিক কম্পানির প্রজাপতি পরিবহন, পরিস্থান পরিবহন, আলিফ, রাজধানী পরিবহনের বাস যাত্রীর অপেক্ষায় থাকে। গতকাল যাত্রীরাই বাসের অপেক্ষায় ছিল। একটি বাস এলেই কে কার আগে উঠবে—এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে হুড়াহুড়ি দেখা গেছে।
সদরঘাট, গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, রামপুরা সড়ককেও বাস তেমন দেখা যায়নি। যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়ায় অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিংয়ের বাইক ব্যবহার করে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।
বাসসংকট হঠাৎ বাড়ার কারণ হিসেবে রমজান পরিবহনের চালক শহিদ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস পায়নি অনেক বাস। আমার রিজার্ভে গ্যাস থাকায় আমি চালাতে পারছি। আজকে যদি গ্যাস না পাই, কাল আমিও বাস নামতে পারব না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্যাসেরসংকট চলছে, গাড়ি তো কম থাকবেই। সংকট কেটে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক জুবায়ের আহমেদ, ছালেহ আতিফ ও অনির্বাণ বিশ্বাস]

চট্টগ্রামে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের জের ধরে দেশজুড়ে চলছে ভয়াবহ গ্যাসসংকট। শিল্প-কারখানা ও পরিবহন খাতে নেমে এসেছে স্থবিরতা, বাসাবাড়িতেও রান্না করতে না পেরে মানুষের ভোগান্তি শুধুই বাড়ছে।
এদিকে গ্যাসের এই চলমান সংকট দূর হওয়ার মতো কোনো সুখবর দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
চট্টগ্রাম : মহেশখালীতে থাকা মার্কিন কম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান কমে গেছে। আমদানি করা এলএনজির ওপর শতভাগ নির্ভর করায় এই পরিস্থিতির সরাসরি শিকার হয়েছে চট্টগ্রাম। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দৈনিক ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে যেখানে আগে ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ মিলত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
গ্যাসসংকটে এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএলসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে শুধু কাফকো ও শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমিত পরিসরে কাজ চলছে। অন্যান্য শিল্প-কারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নগরীর বিভিন্ন এলাকার গৃহিণীরা। একই সঙ্গে প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা ক্ষীণ। তবে টার্মিনালের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার দুটি প্রকৌশলীরা মেরামতের চেষ্টা করছেন। একটি বয়লার চালু করা সম্ভব হলে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
গাজীপুর : তীব্র গ্যাসসংকটে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের বহু কলকারখানা। বিশেষ করে কালিয়াকৈরের মৌচাক, চন্দ্রা, গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী, বাসন, বোর্ডবাজার, টঙ্গী ও শ্রীপুর শিল্প এলাকায় গ্যাসসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
তিতাস গ্যাসের গাজীপুর আঞ্চলিক বিপণন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৯১৫টি শিল্প, ৫২৮টি ক্যাপটিভ, ২৫৮টি বাণিজ্যিক, ৭০টি সিএনজি স্টেশন ও ৮০ হাজার আবাসিক গ্রাহকের সংযোগে প্রতিদিন গাজীপুরে (টাঙ্গাইলসহ) গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট; পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেকেরও অনেক কম।
কালিয়াকৈরের গোমতি টেক্সটাইলে গ্যাসের অনুমোদিত চাপ ৫ পিএসআই। গ্যাসসংকটের কারণে বর্তমানে চাপ রয়েছে ১ পিএসআই। ফলে উৎপাদনে ধস নেমেছে। কারখানার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘জেনারেটর অথবা এলপিজি দিয়ে কারখানা সচল রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবার নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হচ্ছে না। উৎপাদিত মাল শিপের পরিবর্তে কার্গো জাহাজে বিদেশি ক্রেতার কাছে পাঠাতে গিয়ে খরচ আরো বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত এর সমাধান না হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
সাদমা ফ্যাশনওয়্যার কারখানায় গ্যাসের অনুমোদিত চাপ ১৫ পিএসআই। সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী কারখানাটি চালু রাখতে প্রয়োজন কমপক্ষে ১০ পিএসআই। বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই। গ্যাসের অভাবে বেশির ভাগ ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন ৬০ টন থেকে নেমে এসেছে ১০ টনে।
গ্যাসসংকটের প্রভাব সিএনজি স্টেশন ও বাসাবাড়িতেও পড়েছে। প্রতিটি সিএনজি স্টেশনে দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। চালকদের সাত-আট ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করে নিতে হচ্ছে গ্যাস, তা-ও চাপ না থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় কম। অনেক এলাকায় দিনের বেলা চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্না হচ্ছে না। এতে সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা।
গার্মেন্টস শ্রমিক দিপালী রানী দাস বলেন, ‘সারা দিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে দেখি চুলায় গ্যাস নেই। ভোরে গ্যাস পাওয়া গেলেও চুলায় সিরিয়াল পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনে রান্না করতে গিয়ে সাংসারিক ব্যয় বেড়ে গেছে।’
সাভার (ঢাকা) : শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় গ্যাসের তীব্র সংকট ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে তৈরি পোশাক কারখানাসহ শত শত কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর উৎপাদন নেমে এসেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে। গ্যাসের চাপ না থাকায় কারখানার মেশিনগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না, ফলে সময়মতো তৈরি হচ্ছে না পণ্য।
ব্যাংকঋণ নিয়ে কারখানা চালানো মালিকরা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও রপ্তানি হোঁচট খাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান। সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে রপ্তানিমুখী কারখানার কার্যাদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
কারখানার মালিকরা বলছেন, সাভার ও আশুলিয়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে কারখানা রয়েছে এক হাজার দুই শর বেশি। কারখানার জেনারেটর বা বয়লার চালানোর জন্য ১৫ পিএসআই (প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে গ্যাসের চাপের ইউনিট) চাপের গ্যাস প্রয়োজন, যা বর্তমানে ২-৩ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেলসহ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শুধু শিল্প-কারখানাই নয়, সংকটের আঁচ লেগেছে পরিবহন খাতেও। বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই দেখা গেছে দীর্ঘ যানজট এবং অপেক্ষমাণ যানবাহনের সারি। সাভার সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে সিএনজিচালক মতিউর জানান, পাম্পে গ্যাসের চাপ কম হওয়ায় ৭০-৮০ টাকার গ্যাস ঢুকছে। কিন্তু এই গ্যাস পেয়ে যাত্রীদের নিয়ে সড়কে চলাচল সম্ভব না।
পাম্পটির নজেল অপারেটর শরীফ হোসেন বলেন, ‘লাইনে যেটুকু গ্যাস থাকা দরকার, সেই পরিমাণ গ্যাস নেই। তাই পাম্পের গাড়ি এসে ভিড় করলেও গ্যাস দিতে পারছি না।’
নরসিংদী : জেলার ছোট-বড় সাড়ে তিন শর বেশি শিল্প-কারখানা পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর। কিন্তু গ্যাসসংকটের কারণে বেশির ভাগ কারখানা প্রায় বন্ধ। এতে সময়মতো শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংকের পাওনা পরিশোধও করতে পারছেন না শিল্প মালিকরা।
মাধবদীর এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কাঁচামালসংকট, নীরব চাঁদাবাজি এবং অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়ার কারণে এমনিতেই সংকট যাচ্ছে। এর ওপর গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংকের পাওনা যথাসময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
শেখেরচর এলাকার এমআর টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ রুমন বলেন, ‘বেশ কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ২০ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার থেকে কারখানার ডায়িং, ফিনিশিং, নিটিং, ডিজিটাল—সব ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ। কবে নাগাদ ঠিক হবে তা তিতাস কর্তৃপক্ষও বলতে পারছে না।’
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি ও এমএমকে ডায়িং প্রিন্টিং লিমিটেডের পরিচালক আবদুল কাইয়ুম মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্যাসসংকট শুধু নরসিংদী নয়, সারা দেশের সমস্যা। আমার কারখানা, সিএনজি স্টেশন—সবই বন্ধ। আমার কারখানায় গত এক সপ্তাহে উৎপাদন ২০ শতাংশের নিচে চলে আসছে।’
গতকাল বিকেলে নরসিংদীর চিনিশপুরের তিতাস গ্যাস ট্রন্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের ম্যানেজার মাকসুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশা করছি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।’

আগামী দুই মাসের মধ্যেই বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কে হচ্ছেন তা নির্ধারিত হয়ে যাবে। সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। নির্বাচন কমিশনও আজ রবিবার এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে স্পিকারের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সাক্ষাতের বিধান রয়েছে। সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন সংসদের বৈঠক নিশ্চিত করারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ আইনের ৫ ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর আগের নির্বাচনগুলোতে স্পিকারের সঙ্গে সিইসির সাক্ষাৎ পর্ব শেষ হওয়ার পর দু-এক দিনের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন।
গতবার ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতের পরদিন ২৫ জানুয়ারি নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়। তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ভোটগ্রহণের তারিখ পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান ছিল ২৫ দিন। তবে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য ভোটগ্রহণ পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় পার হলেই একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তার আগে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করলেই জানা হয়ে যায় কে হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি।
এবার নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের প্রয়োজন পড়ছে না। সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনেই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ওই নির্বাচন সামনে রেখে সংসদ ভবন, বঙ্গভবন ও রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের অধিবেশন ঘিরেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা চলছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ৭ জুন শুরু হওয়া বাজেট অধিবেশন ১৫ জুলাই শেষ হয়েছে। ফলে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওই অধিবেশনেই নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হবে বলে আশা করি।’
এদিকে আজ জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর তাঁর বঙ্গভবনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গভবনে অফিস ও সংসদ ভবনে স্পিকারের বাসায় থাকবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজই বঙ্গভবনের সরকারি বাসভবন ছেড়ে রাজধানীর গুলশানে নিজের বাসায় ফিরতে পারেন বলে জানা গেছে।
কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি : দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল শনিবার দুপুরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, বিএনপিদলীয় নাকি বাইরের কেউ, তা দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে। সংবিধান ও প্রয়োজনীয় আইন মেনে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বিএনপি সভা করবে, স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হবে; আমাদের তো এখনো কোনো মিটিংই হয়নি। বৈঠকের পর বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।’ আপনি রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।’ বগুড়ায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমির বার্ষিক পরিকল্পনা সম্মেলনের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
আট নির্বাচনে মাত্র একবার ভোট : ১৯৯১ সালে সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা এবং পরোক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একবার রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। আর ওই সময় বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। ওই নির্বাচনে আব্দুর রহমান বিশ্বাস বিজয়ী হন।
আইনমন্ত্রী যা বলেছেন : পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পর্যাপ্ত সময় আছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল শনিবার বলেছেন, ‘সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় আছে। সুতরাং বিশেষ অধিবেশন ডাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যেহেতু ১৫ জুলাই থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আমাদের পরবর্তী অধিবেশন হওয়ার কথা, আশা করি সেই অধিবেশনেই এটা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।’ রাজধানী ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
শিগগিরই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা : গত শুক্রবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, খুব দ্রুত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। রবিবার (আজ) এ বিষয়ে কমিশন আলোচনায় বসবে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। তিনি ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ইনশাআল্লাহ ৯০ দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই ‘নির্বাচনী কর্তা’র দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। সে অনুযায়ী ইসি ভোটার তালিকা প্রস্তুত করবে। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের মতোই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এরপর একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আর একক প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি ছিলেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি। জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী পদত্যাগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।