‘আসাদ গেট থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যেতে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া নিয়ে থাকে। কিন্তু এখন কোনো চালক ৫০০ টাকার নিচে রাজি হচ্ছে না!’
আক্ষেপ করে কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন অর্পিতা ইসলাম নামের এক যাত্রী। গতকাল শনিবার রাজধানীর আসাদ গেট মোড়ে হন্যে হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁজছিলেন তিনি। আরো কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে ৪২০ টাকা ভাড়ায় একজন অটোরিকশাচালককে রাজি করাতে পারলেন।
শুধু এই অর্পিতাই নন, গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যাত্রীদের দুর্ভোগের একই চিত্র দেখা যায়। গ্যাসসংকট থাকায় ছোট-বড় সব ধরনের যাত্রী পরিবহন যান কম ছিল। একই সঙ্গে ভাড়াও ছিল বেশি।
রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের জন্য পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করায় চালকদের একটি বড় অংশ দিনের স্বাভাবিক সময় রাস্তায় থাকতে পারছে না। ফলে গাড়ির সংখ্যা কমে অ্যাপভিত্তিক ভাড়াও বাড়ছে।
গতকাল রাজধানীর খিলক্ষেত, নদ্দা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর রোড, মহাখালী, তেজগাঁও ও প্রগতি সরণির বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোথাও স্টেশন একেবারেই বন্ধ, কোথাও আবার গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে কয়েকটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়ার পর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে বেশির ভাগ চালককে দিনের যাত্রী পরিবহনের বদলে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতে হয়েছে।
শাহাদাৎ হোসেন নামের একজন চালক বলেন, আগে একটি গাড়ি দিনে একাধিকবার পাম্পে গেছে গ্যাস নিতে, কিন্তু সময় লাগেনি। এখন একবার গ্যাস নিতেই কয়েক ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। এতে গাড়ির ব্যবহার কমে যাচ্ছে, চালকের আয় কমছে এবং যাত্রীদেরও বিড়ম্বনা বাড়ছে।
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বেশির ভাগ পাম্পে ‘গ্যাস নেই’ লেখা ঝুলছে। যেসব স্টেশনে গ্যাস মিলছে, সেখানে স্বল্প চাপের কারণে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পাম্পে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের দীর্ঘ অপেক্ষা : মিরপুর রোডের দুটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও চাপ কম থাকায় সেখানে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও আশানুরূপ গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেন চালকরা।
তেজগাঁও, বাড্ডা ও প্রগতি সরণির কয়েকটি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কর্মীরা অলস বসে আছেন। কোথাও পাম্পের কার্যক্রম বন্ধ, আবার কোথাও সামান্য গ্যাস এলেও দীর্ঘ লাইনের কয়েকটি গাড়িতে সরবরাহ দেওয়ার পরই তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
উবারের চালক শাহেদ হোসেন কুড়িলের প্রগতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের লাইনে অপেক্ষা করছিলেন। গতকাল সকালে লাইনে দাঁড়ানোর পর দুপুর পর্যন্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিন-চার দিন ধরে একই অবস্থা। আগে সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় থাকত। এখন গাড়ি চালিয়ে খরচের টাকাও উঠছে না। গাড়ির মাসিক ভাড়া ৪০ হাজার টাকা হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল।
বাস কম, যাত্রীদের হুড়াহুড়ি : গতকাল অন্যান্য দিনের তুলনায় ঢাকায় বাস চলাচল ছিল বেশ কম। মিরপুর, পল্লবী, বিমানবন্দর রোড ঘুরে যাত্রী পরিবহনকারী বাস কম দেখা গেছে। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে সব সময় একাধিক কম্পানির প্রজাপতি পরিবহন, পরিস্থান পরিবহন, আলিফ, রাজধানী পরিবহনের বাস যাত্রীর অপেক্ষায় থাকে। গতকাল যাত্রীরাই বাসের অপেক্ষায় ছিল। একটি বাস এলেই কে কার আগে উঠবে—এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে হুড়াহুড়ি দেখা গেছে।
সদরঘাট, গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, রামপুরা সড়ককেও বাস তেমন দেখা যায়নি। যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়ায় অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিংয়ের বাইক ব্যবহার করে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।
বাসসংকট হঠাৎ বাড়ার কারণ হিসেবে রমজান পরিবহনের চালক শহিদ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস পায়নি অনেক বাস। আমার রিজার্ভে গ্যাস থাকায় আমি চালাতে পারছি। আজকে যদি গ্যাস না পাই, কাল আমিও বাস নামতে পারব না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্যাসেরসংকট চলছে, গাড়ি তো কম থাকবেই। সংকট কেটে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক জুবায়ের আহমেদ, ছালেহ আতিফ ও অনির্বাণ বিশ্বাস]



