মাদক উদ্ধার অভিযানে জব্দ করা ইয়াবা, হেরোইন ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ মামলায় উল্লেখ না করার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠা ঢাকা মেট্রোর উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ডিএনসির পৃথক দুটি অফিস আদেশ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, জনৈক আবুল খায়ের অভিযোগ করেন, নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় তিনটি অভিযানের তথ্য তিনি উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান এবং বিমানবন্দর সার্কেলের সহকারী উপপরিদর্শক মোহাম্মদ রোকুনুজ্জামানকে দিয়েছিলেন।
ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম অভিযানে এক হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা, দ্বিতীয় অভিযানে ৪০০ গ্রাম হেরোইন এবং তৃতীয় অভিযানে ২০ হাজার পিস ইয়াবা ও দুই লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়; কিন্তু সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো দায়েরের সময় উদ্ধার করা আলামত ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া তথ্যদাতা হিসেবে চুক্তি অনুযায়ী তিনি সোর্সমানিও পাননি।
আবুল খায়ের বলেন, ‘পশ্চিম সানারপাড়ে এক অভিযানে ৫৪ হাজাার ৫০০ টাকা উদ্ধার দেখিয়ে বাকি দুই লাখের বেশি টাকা মেরে দিছে জিল্লুর রহমান। এ ছাড়া ইয়াবা, হেরোইন গায়েবসহ টাকার বিনিময়ে নিরীহ মানুষকে আসামি করা এবং অপরাধীকে ছাড় দেওয়াসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আশা করি তদন্তে সব তথ্য উঠে আসবে।’ তবে সোর্স হিসেবে কাজ করে বর্তমানে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন বলে জানান খায়ের।
উদ্ধারকৃত মাদক ও নগদ অর্থ গায়েবের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ডিএনসি চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে পরিচালক (নিরোধ শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকাশনা) রাজীব আহসানকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম, উপপরিচালক (অপারেশনস) মুকুল জ্যোতি চাকমা এবং সদস্যসচিব হিসেবে সহকারী পরিচালক (অপারেশনস) ফয়সাল মাহমুদ। কমিটিকে সরেজমিন তদন্ত করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পৃথক আরেক অফিস আদেশে পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
একই আদেশে উত্তরা সার্কেলের দাপ্তরিক কার্যক্রম ও অভিযান পরিচালনার স্বার্থে তেজগাঁও সার্কেলের পরিদর্শক তমিজ উদ্দিন মৃধাকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে উত্তরা সার্কেলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে তদন্ত কমিটির সদস্য ডিএনসির উপপরিচালক (অপারেশনস) মুকুল জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটিতে আমি কাগজে-কলমে থাকলেও অন্য কাজে যুক্ত থাকায় কাজ করতে পারিনি। তবে কমিটিতে থাকা অন্য সদস্যরা কাজ করছেন। আমি যত দূর জানি তদন্ত চলমান।’
জানতে চাইলে ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো তদন্ত কমিটির সময় শেষ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলমান। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত বলা যাবে।’
এ ছাড়া সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরার একাধিক অবৈধ বারের বৈধতা দিয়ে মোটা অঙ্কের মাসোহারা নিয়ে বারগুলোকে অসাধু উকিল ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে। কিছু অসাধু আইনজীবীর সহায়তায় আদালত থেকে বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে আদেশ সংগ্রহ করা হয়, যা পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মাধ্যমে বৈধতার রূপ পাইয়ে দেওয়া হতো বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর আগে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদনেও মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা (ছয়জন) প্রত্যেকেই মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁরা বিভিন্ন উপায়ে অর্থ আদায় করেছেন। তখন তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ও তাঁর সহকর্মী এসআই জুলহাস আহমেদ, এএসআই সানাউল্লাহ এবং সিপাহি আনোয়ার হোসেন, জিয়াউল হক ও আমজাদ। সে সময় তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তত চারটি মাদকের ঘটনায় টাকা আদায়ের সম্পৃক্ততা পান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।




