kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)

উপমহাদেশের কীর্তিমান সমাজ সংস্কারক

আতাউর রহমান খসরু   

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০৯:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উপমহাদেশের কীর্তিমান সমাজ সংস্কারক

মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের পর ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সমাজে যে সর্বগ্রাসী নৈরাজ্য ও নৈরাশ্য দেখা দেয়, তা থেকে মুসলিম সমাজকে যাঁরা মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) তাঁদের অন্যতম। তিনি একই সঙ্গে মুসলিম দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, চিন্তানায়ক ও সমাজসংস্কারক ছিলেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) একদিকে যেমন মুসলিম সমাজকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনৈসলামিক অনাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন, অন্যদিকে মুসলমানের চিন্তার অসারতা দূর করেছিলেন। তাঁর বিপ্লবী চিন্তাধারা ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ভারতবর্ষের, বিশেষ করে ভারতীয় মুসলমানের রাজনৈতিক মুক্তির পথ দেখিয়েছিল।

জন্ম ও শিক্ষা : শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) ১১১৪ হিজরি মোতাবেক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শাহ আবদুর রহিম (রহ.) ছিলেন সমকালের বিখ্যাত আলেম ও মুসলিম চিন্তাবিদ। সম্রাট আলমগীর সর্বোচ্চ উলামা পরিষদে শাহ আবদুর রহিম (রহ.)-এর নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি সম্পাদনা ও পরিমার্জনের দায়িত্বে নিয়োজিত হন। পিতার কাছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি তিনি আরবি ও ফারসি ব্যাকরণ ও সাহিত্য, উচ্চতর দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, অধিবিদ্যা, অতীন্দ্রিয়তা ও আইনশাস্ত্রের পাঠ নেন। ১১৩১ হিজরি (১৭১৮ খ্রি.) পিতার ইন্তেকাল হলে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে রহিমিয়ার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১২ বছর শিক্ষাদান করেন।

মক্কায় গমন ও উপমহাদেশে হাদিসচর্চার বিস্তার : ১১৪৩ বা ১১৪৪ হিজরিতে ২৯ বছর বয়সে তিনি মক্কায় গমন করেন এবং ১১৪৫ বা ১১৪৬ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি হজব্রত পালন করেন এবং মক্কা-মদিনার বিশিষ্ট হাদিসবিশারদদের কাছে হাদিসের পাঠ গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি ইলমে হাদিসের পাঠদান ও গ্রন্থ রচনায় মনোযোগ দেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) ভারতীয় উপমহাদেশে ইলম হাদিসচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। হাদিসচর্চায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘মুহাদ্দিসে দেহলভি’ উপাধি দেওয়া হয়।

দর্শনচর্চার নতুন ধারা : উমাইয়া যুগে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে যখন দর্শনশাস্ত্র যুক্ত হয়, তখন থেকে মুসলিম দার্শনিকদের ভেতর দুটি ধারা সৃষ্টি হয়। এক. যাঁরা পশ্চিমা বা গ্রিক দর্শনের আলোকে ইসলামী বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের যৌক্তিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিশ্লেষণ করতেন, দুই. যাঁরা গ্রিক দর্শনের অনুগামীদের পক্ষ থেকে ইসলামী আকিদা, মূল্যবোধ ও বিধি-বিধানের ওপর উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও অভিযোগের উত্তর দিতেন। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি (রহ.) প্রধানত দ্বিতীয় ধারার দার্শনিক ছিলেন। তিনি তাঁর ‘তাহাফাতুল ফালাসিফা’ রচনার মাধ্যমে এ ধারাকেই শক্তিশালী করেন। তবে তিনি ইহয়াউ উলুমিদ্দিন রচনার মাধ্যমে মুসলিম দর্শনে তৃতীয় একটি ধারার সূর্যোদয় করেন। তা হলো, গ্রিক বা পশ্চিমা দর্শনের সঙ্গে তুলনা বা সংঘাতে না গিয়ে শরিয়ত ও ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসের যৌক্তিকতা ও সৌন্দর্য তুলে ধরা। তবে ইহয়াউল উলুমিদ্দিন গ্রন্থে দর্শন ও সুফিবাদ উভয় শাস্ত্রের প্রতিফলন ঘটায় তার দার্শনিক দিককে চূড়ান্ত বলার অবকাশ নেই। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ রচনা করে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, বিধি-বিধান ও জীবনব্যবস্থার চূড়ান্ত সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। যা একই সঙ্গে মানবজাতির প্রতি আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রত্যাশার গূঢ় রহস্য যেমন উন্মোচন করেছে, তেমনি এসব বিধি-বিধানের যৌক্তিকতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে। এবং তিনি তা করেছেন মানবিক যুক্তি ও ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার সমন্বয়ে।

শিক্ষা সংস্কার : শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর সময়ে ইসলামী শিক্ষাধারার পাঠক্রমে কোরআন ও হাদিসের স্থান ছিল খুবই সীমিত। কয়েক শতাব্দীকালের প্রাচীন দর্শন ও যুক্তিবিদ্যাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। কোরআনের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা গ্রন্থ ও হাদিসের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলো পাঠক্রমের বাইরে ছিল। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) কোরআন-হাদিস তথা নসভিত্তিক জ্ঞানচর্চায় গুরুত্ব দেন এবং উপমহাদেশে হাদিসশাস্ত্রের বিশুদ্ধ ছয় গ্রন্থের সর্বাত্মক পাঠদান শুরু করেন। নিজে তাফসির (কোরআনের ব্যাখ্যা) ও হাদিসশাস্ত্রের ওপর একাধিক মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। একইভাবে তিনি সম্রাট আলমগীর-পরবর্তী দিল্লির শাসকদের ইসলামের প্রতি উদাসীনতা ও রাজনৈতিক দুর্দশা বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে স্বাধীন ও স্বনির্ভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এমনকি তিনি নিজের মাদরাসা দিল্লি থেকে শাহজাহানাবাদে সরিয়ে নেন।

বৈপ্লবিক চিন্তাধারা : শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের মুসলিম পুনর্জাগরণ ও বৈপ্লবিক চিন্তাধারার জনক। তাঁর সন্তান ও শিষ্যরাই পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রথাগত কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করেননি; বরং একটি বৈপ্লবিক চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছিলেন। শাসকগোষ্ঠীর অভিপ্রায় এবং স্থানীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাবে উপমহাদেশে ইসলাম তার সর্বজনীন রূপ হারিয়ে প্রথাসর্বস্ব আচারে পরিণত হয়েছিল। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ‘ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন বিধান’ চিরায়ত এ সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর চিন্তার পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানকে এমন যুক্তিগ্রাহ্যভাবে ঢেলে সাজাতে প্রয়াসী ছিলেন, যার মাধ্যমে ইসলামী বিধি-ব্যবস্থার মূল রহস্য, তথ্য ও দার্শনিক দিক সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং মুসলিম পুনর্জাগরণ ও ইসলামী রাজনীতির অভ্যুদয় ঘটে। তাঁর লেখায় উম্মাহর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি এবং সমাজিক উন্নয়নের যাবতীয় উপকরণ সম্পর্কে পথনির্দেশ রয়েছে।

সংস্কার ও চিন্তাধারার প্রভাব : শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর সংস্কার আন্দোলন ও বৈপ্লবিক চিন্তাধারার প্রভাব দুই ভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। এক. দারুল উলুম দেওবন্দের মতো স্বনির্ভর ও স্বাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল, যার হাত ধরে উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষা পুনর্জীবন লাভ করেছিল, দুই. ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে শাহ আবদুল আজিজ, শাহ ইসমাইল শহিদ, সাইয়েদ আহমদ শহিদ, কাসেম নানুতভি (রহ.)-এর মতো অকুতোভয় সেনাপতির জন্ম দিয়েছিল। মূলত শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর ছেলে ও চিন্তার উত্তরাধিকারী শাহ আবদুল আজিজ (রহ.)-এর ঐতিহাসিক ফতোয়ার মাধ্যমে উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। তিনি ভারতবর্ষকে ‘দারুল হরব’ বা শত্রুকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেন এবং ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরজ বলে ফতোয়া দেন।

মৃত্যু : শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) ২৯ সফর ১১৭৬ হিজরি ইন্তেকাল করেন এবং শাহজাহানাবাদে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর পাঁচ ছেলের মধ্যে শাহ আবদুল আজিজ (রহ.) পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর প্রায় ৪৩টি বইয়ের নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে ফাতহুর রহমান, ফাউজুল কাবির, ফাতহুল কাবির, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, আরবাইন, ইজালাতুল খিফা অন্যতম।

তথ্যসূত্র : দার্শনিক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি ও তাঁর চিন্তাধারা, আখতার ফারুক (রহ.) অনূদিত হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ-এর ভূমিকা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা