• ই-পেপার

জীবনে যেসব পরিস্থিতিতে চুপ করে থাকাটাই ভালো

বারবার ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তির সমস্যা কি রোগের ইঙ্গিত?

অনলাইন ডেস্ক
বারবার ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তির সমস্যা কি রোগের ইঙ্গিত?
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

গরমে একটু বের হলেই অস্বস্তি, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঝিমঝিম বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি এগুলোকে অনেকেই সাধারণ গরমের প্রভাব বলে এড়িয়ে যান।

কিন্তু শরীর যদি স্বাভাবিকভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে এটি হতে পারে ‘হিট ইনটলারেন্স’ বা তাপ-অসহিষ্ণুতার লক্ষণ। সময়মতো বিষয়টি বুঝতে না পারলে হিট এক্সহস্টশন থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী হিট স্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে।

স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথের প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা জানান, হিট ইনটলারেন্স কোনো রোগ নয়। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীর নিজের তাপমাত্রা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সামান্য গরম পরিবেশেও অস্বস্তি, দুর্বলতা বা অসুস্থতা অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় এর পেছনে ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, স্নায়বিক রোগ বা অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের জটিলতা দায়ী থাকে।

যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন

হিট ইনটলারেন্সের লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত দেখা যায়—

  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া
  • মাথা ব্যথা
  • মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম করা
  • বমিভাব
  • মনোযোগ কমে যাওয়া
  • মেজাজের পরিবর্তন
  • দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন

এসব লক্ষণ অন্য রোগের কারণেও হতে পারে। তাই বারবার এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যেসব কারণে শরীর গরম সহ্য করতে পারে না

হিট ইনটলারেন্স বা গরম সহ্য করতে না পারার প্রধান কারণ হলো, শরীর যখন নিজের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এর অন্যতম সাধারণ কারণ ডিসঅটোনোমিয়া বা অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের কার্যকারিতার সমস্যা। শরীরের এই স্নায়ুতন্ত্রই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ঘাম হওয়া, হৃদস্পন্দনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করে। এই সিস্টেমে সমস্যা হলে শরীর গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। ডিসঅটোনোমিয়ার সঙ্গে যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কিত, সেগুলো হলো— 

  • ডায়াবেটিস
  • গিলেইন-বারে সিনড্রোম
  • হাইপোথাইরয়েডিজম
  • পারকিনসনস রোগ
  • ভিটামিন বি–১২-এর ঘাটতি

এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত গরম পরিবেশে থাকা, খুব বেশি বা খুব কম আর্দ্রতাযুক্ত এলাকায় অবস্থান করা, উঁচু এলাকায় দীর্ঘ সময় থাকা কিংবা দীর্ঘক্ষণ সরাসরি রোদের মধ্যে থাকলেও গরম সহ্য করার সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে এ সময় যদি উপযুক্ত পোশাক না পরা হয় বা পর্যাপ্ত পানি পান না করা হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

সমাধান : হিট ইনটলারেন্সের চিকিৎসায় মূল লক্ষ্য হলো কারণ শনাক্ত করে তা নিয়ন্ত্রণ করা। পাশাপাশি কিছু অভ্যাসও সাহায্য করতে পারে—

  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
  • গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বাইরে যাওয়া কমান।
  • ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখুন।
  • প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ পরিবর্তন করুন।
  • শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা ঠান্ডা পরিবেশে বেশি সময় থাকুন।
  • গরমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার উপায়

কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে 

হঠাৎ করে গরম একেবারেই সহ্য না হলে বা হিট-সম্পর্কিত জরুরি অবস্থার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। বিশেষ করে যদি প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যায়, মাথা ঘোরে বা ঝিমঝিম অনুভূত হয়, অতিরিক্ত ঘাম হয়, অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দেয়, তীব্র মাথাব্যথা, পেশিতে খিঁচুনি, বমি বমি ভাব বা বমি, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদস্পন্দন এবং অতিরিক্ত তৃষ্ণার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। এসব লক্ষণ শরীরে পানিশূন্যতা বা গুরুতর তাপজনিত অসুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে জটিলতা বাড়তে পারে।

গরমকে হালকাভাবে নেবেন না। বারবার গরম সহ্য করতে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এর পেছনের কারণ জেনে নেয়া ভালো।  

বিশ্ব আইভিএফ দিবস : কখন ডাক্তার দেখানো উচিত?

জীবনযাপন ডেস্ক
বিশ্ব আইভিএফ দিবস : কখন ডাক্তার দেখানো উচিত?
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বিবাহিত জীবনের কিছুদিন যাওয়ার পরই অনেক দম্পতির মনে একটি প্রশ্ন জাগে—‘সবকিছু কি ঠিক আছে, নাকি আমাদের চিকিৎসা নেওয়া দরকার?’ বিশেষ করে যখন সন্তান আসতে দেরি হয়, তখন আইভিএফ (টেস্টটিউব শিশু) নামটির কথা মাথায় এলেও সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

আজ ২৫ জুলাই, ‘বিশ্ব আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) দিবস’। ১৯৭৮ সালের এই দিনে জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের প্রথম টেস্টটিউব শিশু লুইস ব্রাউন। এরপর থেকে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক চিকিৎসার বদলিতে লাখ লাখ নিঃসন্তান দম্পতির মুখে হাসি ফুটিয়েছে এই প্রযুক্তি।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে—কখন একজন দম্পতির আইভিএফ-এর কথা ভাবা উচিত? আর চিকিৎসা শুরুর আগেই বা কী কী বিষয় মাথায় রাখা জরুরি? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন নতুন দিল্লির বিখ্যাত এলান্টিস হেলথকেয়ারের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. মান্নান গুপ্তা।

lll

কখন আর দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যাবেন?

ড. মান্নান গুপ্তার মতে, কতদিন চেষ্টা করছেন এবং নারীর বয়স কত—এই দুটো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার সময় নির্ধারণ করা উচিত:

  • নারীর বয়স ৩৫ বছরের কম হলে: কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে টানা ১ বছর চেষ্টা করার পরও যদি সন্তান না আসে, তবে আর দেরি না করে ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত।

  • নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে : বয়সের সাথে সাথে সন্তান ধারণের ক্ষমতা কমতে থাকে। তাই ৩৫ বছর পার হয়ে গেলে টানা ৬ মাস চেষ্টার পরও সন্তান না এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কাদের জন্য আইভিএফ প্রয়োজন হতে পারে?

সব বন্ধ্যাত্বেই যে আইভিএফ লাগবে, বিষয়টি তেমন নয়। তবে নিচের সমস্যাগুলো থাকলে চিকিৎসকরা আইভিএফ-এর পরামর্শ দেন: ১. নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত থাকলে।

২. পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা অনেক কম বা শুক্রাণুর মান দুর্বল হলে।

৩. ডিম্বাণু তৈরিতে বা নিঃসরণে (ওভিউলেশন) সমস্যা থাকলে।

৪. জরায়ুর জটিল সমস্যা যেমন—অ্যান্ডোমেট্রিওসিস থাকলে।

৫. সব রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও সন্তান না এলে।

৬. সাধারণ ওষুধ বা অন্য চিকিৎসায় কাজ না হলে।

ll
১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই লুইস ব্রাউন জন্মগ্রহণ করার সাথে সাথে বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত বা অধ্যায়ের সূচনা প্রত্যক্ষ করে।

আইভিএফ নিয়ে সাধারণ কিছু ভুল ধারণা

চিকিৎসক জানান, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো আইভিএফ নিয়ে কিছু ভুল ধারণা রয়ে গেছে:

  • ভুল ধারণা ১: “বয়স কোনো বিষয় নয়, আইভিএফ করলেই সন্তান হবে।”

    বাস্তবতা: আইভিএফ-এর সফলতার প্রধান চাবিকাঠি হলো নারীর বয়স। বয়স বাড়লে ডিম্বাণুর গুণমান ও সংখ্যা কমতে থাকে, যা সফলতার হার কমিয়ে দেয়।

  • ভুল ধারণা ২: “আইভিএফ করলেই যমজ সন্তান হয়।”

    বাস্তবতা: আগে একাধিক ভ্রূণ জরায়ুতে দেওয়া হতো বলে যমজ শিশু বেশি হতো। কিন্তু এখন আধুনিক প্রযুক্তিতে একটিই ভালো মানের ভ্রূণ স্থাপন করা হয়, ফলে একটি সন্তান হওয়ার ধারণাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক।

আইভিএফ শুরুর আগে দম্পতিদের যা করা উচিত

আইভিএফ চিকিৎসায় ভালো ফল পেতে ল্যাবরেটরির প্রযুক্তির পাশাপাশি দম্পতির নিজেদের জীবনযাত্রাও অনেক বড় ভূমিকা রাখে। চিকিৎসা শুরুর আগেই দম্পতিদের যে নিয়মগুলো মানা উচিত:

  • সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ওজন: পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খেতে হবে। অতিরিক্ত বা খুব কম ওজন দুটোই গর্ভধারণে বাধা দেয়, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

  • পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়াম : প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে হবে এবং হালকা হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে।

  • বাজে অভ্যাস ত্যাগ : ধূমপান, মদ্যপান বা যেকোনো ধরনের মাদক সেবন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

  • রোগ নিয়ন্ত্রণ ও সাপ্লিমেন্ট : ডায়াবেটিস, প্রেসার বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে তা আগেই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এছাড়া ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ফোলিক অ্যাসিডের মতো প্রয়োজনীয় ভিটামিন খাওয়া শুরু করতে হবে।

সবশেষে চিকিৎসক মনে করিয়ে দেন, আইভিএফ কোনো ম্যাজিক বা অলৌকিক কিছু নয়—এটি একটি বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা। সবার ক্ষেত্রে প্রথমবারেই ফল নাও আসতে পারে, তাই মানসিকভাবে প্রস্তুত থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

মৌসুমি অ্যালার্জিতে তুলসী ড্রপ, কী বলছেন চিকিৎসক?

জীবনযাপন ডেস্ক
মৌসুমি অ্যালার্জিতে তুলসী ড্রপ, কী বলছেন চিকিৎসক?
সংগৃহীত ছবি

বর্ষাকালে তাপমাত্রার পরিবর্তন, বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি, ধুলাবালি, পরাগরেণু ও ছত্রাকের কারণে অনেকেই মৌসুমি অ্যালার্জিতে ভোগেন। এ সময় অনেকেই ঘরোয়া উপায় হিসেবে তুলসী ড্রপ ব্যবহার করেন। তবে এটি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলসী ড্রপ তুলসী পাতার ঘন নির্যাস থেকে তৈরি হয়। এতে থাকা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সমর্থন করতে সাহায্য করতে পারে। তাই কারো কারো ক্ষেত্রে এটি গলা জ্বালা কমাতে, শ্বাসনালিতে কিছুটা স্বস্তি দিতে এবং মৌসুমি অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত গবেষণায় এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, তুলসী ড্রপ একাই মৌসুমি অ্যালার্জির কার্যকর চিকিৎসা। এর উপকারিতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, তুলসী ড্রপ অ্যালার্জি পুরোপুরি সারাতে পারে না। এটি অ্যান্টিহিস্টামিন বা চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের বিকল্পও নয়। তীব্র অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের মতো জরুরি অবস্থায় এটি কোনোভাবেই চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

যাদের জন্য কিছুটা উপকারী হতে পারে

হালকা মৌসুমি অ্যালার্জিতে ভোগা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।
আয়ুর্বেদভিত্তিক পরিচর্যার সঙ্গে অন্য চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে চান, এমন ব্যক্তিদের জন্য।

অ্যালার্জি কমাতে আরও যা করবেন

বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ ও চুল পরিষ্কার করুন।
ঘরের জানালা প্রয়োজন ছাড়া খোলা রাখবেন না।
ঘর পরিষ্কার রাখুন এবং আর্দ্রতা কমানোর চেষ্টা করুন।
প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন।

সতর্ক থাকুন

তুলসী ড্রপ সবার জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে। কারো কারো অ্যালার্জি, ত্বকে র‍্যাশ বা গলায় অস্বস্তি হতে পারে। এটি রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা ডায়াবেটিসের ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াও করতে পারে। তাই নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে বা গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দীর্ঘদিন অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, তীব্র মাথাব্যথা বা উপসর্গ বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

শত ক্যানভাসের আত্মত্যাগেই জন্ম নেয় এক মাস্টারপিস : ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ

সৈয়দা আশাপূর্ণা
শত ক্যানভাসের আত্মত্যাগেই জন্ম নেয় এক মাস্টারপিস : ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ
ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের মাস্টারপিস ‘স্টারি নাইট’

কোনো আর্ট গ্যালারিতে আলো-ঝলমলে কাঁচের ফ্রেমে বাঁধাই করা ছবি দেখে দর্শকেরা যখন মুগ্ধ হন, তখন কেবলই ভেসে ওঠে এক নিখুঁত সৃষ্টির রূপ। কিন্তু সেই অনন্য সাধারণ সৃষ্টির পেছনে ঢাকা পড়ে থাকে কতটা যন্ত্রণা, কত না-ঘুমানো রাত, চোখের জল, আর রাগের মাথায় ছিঁড়ে ফেলা ক্যানভাসের নীরব হাহাকার—তার খবর রাখে ক’জন?

পৃথিবীর কোনো কালজয়ী জিনিসই এক মুহূর্তে আকাশ থেকে নেমে আসে না। বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তার নিঃসঙ্গ ও রক্তাক্ত জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এই চিরন্তন সত্য। তিনি বুঝেছিলেন—ইতিহাসে অমর হয়ে থাকার মতো একটা ‘মাস্টারপিস’ আঁকতে গেলে, তার আগে শত শত ভাঙাচোরা, এলোমেলো আর নষ্ট হওয়া ক্যানভাসকে নীরবে আত্মাহুতি দিতেই হয়!

ভুল মানেই কিন্তু পরাজয় নয়
১৮৮৯ সালের কথা। ভ্যান গঘ তখন জীবনের তীব্র ঝড়ঝাপটা আর একাকীত্বের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সেই সময়ে ভাই থিওকে লেখা এক চিঠিতে তিনি ক্যানভাসের পেছনের আসল যন্ত্রণাটা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন—শিল্পের পথ কোনো রাজপথ নয়, এটি আসলে বারবার আছাড় খাওয়ার গল্প।

আমরা বাইরে থেকে কেবল শিল্পীর শেষ মুহূর্তের ওই ‘মাস্টারপিস’টাই দেখতে পাই। কিন্তু সেই একটামাত্র সফল ছবির অন্তরালে জমে থাকে কত কত ছোপ ছোপ নষ্ট রঙের দাগ, কত বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া চেষ্টা!

ভ্যান গঘ তার ওই চিঠিতে এক অসাধারণ বার্তা দিয়ে গেছেন—এই যে ক্যানভাসগুলো ‘নষ্ট’ হলো, এগুলো কিন্তু শিল্পীর অযোগ্যতা নয়। বরং এগুলোই তো জ্বলন্ত প্রমাণ যে মানুষটা মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি; সে নিজের সবটুকু দিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছে!

শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের ক্যানভাসে

চিত্রশিল্পীদের রঙ-তুলির লড়াই ছেড়ে একটু চোখ ফেরালেই দেখা যায়—এই দর্শন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার সঙ্গেও একইভাবে প্রাসঙ্গিক:

  • সৃজনশীল সাহিত্য: একটি অনন্য কবিতা বা গল্প পাঠকের মন জয় করার আগে লেখকের ঝুড়িতে জমা হয় শত শত দলা পাকানো খসড়া কাগজ।

  • উদ্যোক্তার পথচলা: সফল কোনো উদ্যোগ বা ব্যবসা দাঁড় করানোর প্রক্রিয়ায় পুরো রূপরেখা শতবার সংশোধন ও বাতিল করে একদম শূন্য থেকে শুরু করতে হয়।

  • দক্ষতা অর্জন: কোডিং, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা যেকোনো নতুন বিদ্যা রপ্ত করার সূচনালগ্নের প্রাথমিক ভুলগুলো না থাকলে আজকের এই পরিপক্কতা অসম্ভব থেকে যেত।

নিখুঁত হওয়ার ভয় কাটাতে হবে

অধিকাংশ মানুষ কাজ শুরু করতেই দ্বিধায় ভোগেন কারণ মাথায় চেপে বসে থাকে প্রথমবারেই অলৌকিক কিছু করে দেখানোর অদৃশ্য চাপ। আর ব্যর্থতার এই ভয়ই মানুষকে ক্যানভাসে তুলি ছোঁয়াতে বাধা দেয়।

ভ্যান গঘ তার জীবনদর্শন দিয়ে সেই ভয়ের পথেই আলো জ্বালিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন—ভুল হওয়াটা কোনো চূড়ান্ত বিপর্যয় নয়, বরং তা শেখার প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক অংশ। বাতিল হওয়া প্রতিটি ক্যানভাস আসলে শিল্পীকে নীরবে দিকনির্দেশনা দেয়, ঠিক কোন জায়গাটিতে শুধরে নিতে হবে।

প্রথমবারেই সব নিখুঁত হতে হবে—এই মানসিক চাপ ঝেড়ে ফেলে মূল কাজে হাত দেওয়াই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। ভুল হোক, কাজ নষ্ট হোক কিংবা সময় ব্যাহত হোক—ভয় না পেয়ে পথ চলাই আসল কথা। শত শত ব্যর্থ ও নষ্ট হওয়া চেষ্টার পর ছাইভস্ম থেকেই একদিন নীরব আভিজাত্যে জন্ম নেয় কালজয়ী ‘মাস্টারপিস’।

জীবনে যেসব পরিস্থিতিতে চুপ করে থাকাটাই ভালো | কালের কণ্ঠ