একসময় পড়াশোনা শেষ, চাকরি, বিয়ে ও সন্তান—এটাই ছিল জীবনের স্বাভাবিক ধারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন অনেক তরুণী বিয়ে দেরিতে করছেন, আবার কেউ কেউ বিয়ে না করার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। সম্প্রতি সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া জাতিসংঘ (ইউএন), পিউ রিসার্চ, সার্ভেমাংকি এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণাতেও একই প্রবণতার কথা বলা হয়েছে।
ক্যারিয়ার ও আর্থিক স্বাধীনতাই এখন অগ্রাধিকার
বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণী আগে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চান। উচ্চশিক্ষা শেষ করে ভালো চাকরি এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেন। অনেকের মতে, আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বিয়ে করলে নিজের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তারা জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হারানোর ভয়
জেন-জি প্রজন্ম নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মতামত ও জীবনযাপনকে অনেক গুরুত্ব দেয়। অনেক তরুণীর ধারণা, বিয়ের পর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। সংসার ও পারিবারিক দায়িত্ব বেড়ে গেলে নিজের স্বপ্ন, শখ এবং ক্যারিয়ারে আগের মতো সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই তারা আগে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে চান।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় কারণ
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৫৭ শতাংশ তরুণ-তরুণী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবাসন সংকট এবং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়ানোর বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। বিয়ের খরচ, সংসার চালানোর দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের আর্থিক চাপ অনেককে বিয়ে পিছিয়ে দিতে বাধ্য করছে।
সফল জীবনের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে
সিএনবিসি ও সার্ভেমাংকির যৌথ জরিপে দেখা গেছে, জেন-জি প্রজন্মের মাত্র ৩৭ শতাংশ মনে করেন, সফল জীবনের জন্য বিয়ে অপরিহার্য। তাদের কাছে আর্থিক স্থিতিশীলতা, নিজের বাড়ি, ক্যারিয়ারে সাফল্য এবং মানসিক শান্তি এখন বিয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্কে আস্থা কমে যাচ্ছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডেটিং অ্যাপের বিস্তারের কারণে সম্পর্কের ধরন বদলেছে। সম্পর্ক গড়া যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রতারণা ও বিচ্ছেদের ঘটনাও। চারপাশে অসুখী দাম্পত্যের উদাহরণ দেখে অনেক তরুণীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়ানোর ভয় তৈরি হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা একে 'কমিটমেন্ট ফোবিয়া' বলে উল্লেখ করেছেন।
যোগ্য জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন
অনেক তরুণীর মতে, নিজের মানসিকতা, মূল্যবোধ ও জীবনধারার সঙ্গে মিল রয়েছে—এমন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু বিয়ে করার জন্য আপস করতে তারা রাজি নন। তাই উপযুক্ত মানুষ না পাওয়া পর্যন্ত অনেকেই একা থাকাকেই স্বাচ্ছন্দ্য মনে করছেন।
মায়েদের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক তরুণী তাদের মায়েদের বৈবাহিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন। বিয়ের পর একতরফা সংসারের দায়িত্ব, মতপ্রকাশে বাধা, ক্যারিয়ার ছেড়ে দেওয়ার চাপ এবং পারিবারিক প্রত্যাশার পুনরাবৃত্তি তারা নিজেদের জীবনে চান না। তাই তারা আগে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা
বিশ্বের অন্যতম কম জন্মহার দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটির অনেক তরুণী মনে করেন, বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার কারণে তাদের কষ্ট করে গড়ে তোলা ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বজনিত বৈষম্য, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সন্তান লালন-পালনের বড় দায়িত্ব নারীদের ওপরই পড়ে। এসব কারণে দেশটিতে অনেক তরুণী বিয়ে ও সন্তান—দুটিই এড়িয়ে চলছেন। সেখানে এই প্রবণতাকে 'সাম্পো প্রজন্ম' নামে ডাকা হয়। এর অর্থ—সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তান—এই তিনটি বিষয় থেকে দূরে থাকা।
সবাই কি বিয়ে করতে চান না?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্ম বিয়ের বিরুদ্ধে নয়। বরং তারা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক পরে বিয়ে করতে চান। শিক্ষা শেষ করা, ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার পরই তারা সংসার শুরু করতে আগ্রহী। অর্থাৎ, বিয়েকে তারা জীবনের শুরু নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরিণত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণীদের বিয়ে নিয়ে এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি বদলে যাওয়া অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।








