মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন পিইডিপি-৪ (PEDP-4) প্রকল্পের সাতটি ওয়াশব্লক নির্মাণে চরম ধীরগতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চুক্তি অনুযায়ী ১০ মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১৮ মাস পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্য একজনকে দিয়ে কাজ করানো হয়েছে এবং কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এতে সাতটি বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ভোগান্তিতে পড়েছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয় সূত্র জানায়, কমলগঞ্জ উপজেলার দরগাপুর, রসুলপুর, তিলকপুর, জামিরকোনা, ড. চেরাগ উদ্দিন, ফুলবাড়ী ও কোনাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একতলা আইসোলেটেড আরসিসি (RCC) ওয়াশব্লক নির্মাণের জন্য ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর কুড়িগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নুর ট্রেডার্স-কে ১ কোটি ৩০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯৯ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ১০ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মাত্র দুই-তিনটি বিদ্যালয়ে নামমাত্র কাজ শুরু করে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালের জুনে বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কায় কুলাউড়ার সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লকের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। প্লাস্টার, পানির সংযোগ, বেসিন, নিচতলার টাইলস ও সিঁড়ির কাজ শেষ হয়নি।
তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ বাকি। পুরোনো টয়লেট ভেঙে ফেলা হলেও নতুন ওয়াশব্লক চালু না হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী শিক্ষক ও ছাত্রীদের আশপাশের বাড়িতে গিয়ে শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া দরগাপুর, রসুলপুর, ড. চেরাগ উদ্দিন, জামিরকোনা ও কোনাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লকগুলোরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০০৮ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় চুক্তি বাতিল বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বরং নিম্নমানের ইট, খোয়া, টাইলস ও ফিটিংস ব্যবহার করে কাজ সম্পূর্ণ না করেই জুন মাসে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কার্যাদেশপ্রাপ্ত নুর ট্রেডার্সের কোনো প্রতিনিধিকে কখনও অফিসে দেখা যায়নি। কুলাউড়ার সিরাজুল ইসলাম নামের একজন ব্যক্তি পুরো কাজ পরিচালনা করছেন।
একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, নির্মাণকাজে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক স্থানে টাইলস ও ফিটিংস খুলে পড়তে শুরু করেছে।
তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বলেন, ‘আমাদের সমস্যার কথা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে জানানো হলেও কোনো সমাধান হয়নি।’
ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দিন, রসুলপুরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফাহিমা বেগম এবং জামিরকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমত আরা জোন্স দ্রুত ওয়াশব্লকগুলোর কাজ শেষ করে চালুর দাবি জানান।
কাজের দায়িত্বে থাকা কুলাউড়ার সিরাজুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি অফিসের মাধ্যমে কাজ করছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক সম্পর্কে বিস্তারিত জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী সুজন স্যার জানেন।’
কমলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বাবর বলেন, ‘কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের। আমরা শুধু চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের নাম পাঠিয়ে থাকি।’
অভিযোগের বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুজন আহমেদ বলেন, ‘কাজটি নুর ট্রেডার্সই পেয়েছে। অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ নেই। কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং মানসম্মত টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে।’