জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ‘জুলাই সনদ কার্যকরের কথা বললেও সরকার বাস্তবে তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় উপেক্ষা করে সরকার মৌখিক প্রতারণা করছে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কার ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।’
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) জাতীয় জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। আবু সাঈদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা শুধু মুখে বলছে, বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটি জনগণের সঙ্গে মৌখিক প্রতারণা।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার তাদের ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নেও ব্যর্থ হয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা চাই গণভোটের রায়ের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার হোক, দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।’
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর ‘সরকার ও বিরোধী দল মিলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে’—এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকার যদি সত্যিকার অর্থে ইতিবাচকভাবে সংস্কার করতে চায়, তাহলে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। অতীতেও করেছি। বিচার, সংস্কার, ফ্যাসিবাদের বিলুপ্তি ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আমরা দলীয় নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই আন্তরিকতার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না। জুলাই সনদ অবশ্যই গণভোটের রায়ের আলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর বাইরে কোনো উদ্যোগে আমাদের সহযোগিতা থাকবে না।’
আবু সাঈদকে স্মরণ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আবু সাঈদ আমাদের শহীদদের ঈমাম, জুলাই বিপ্লবের রুহানী নেতৃত্ব এবং আমাদের সংগ্রামের অগ্রসেনানী। তার সাহসিকতা পুরো জাতিকে আন্দোলনের পথে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
আমরা শুধু আবু সাঈদ নই, শহীদ মুগ্ধ, ওয়াসিম, ফারহান ফাইয়াজ, নাঈমা সুলতানা, হৃদয় চন্দ্রসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদ এবং প্রায় ৩০ হাজার আহত যোদ্ধাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। পাশাপাশি শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, নারী, আলেম, প্রবাসী এবং ছাত্রসমাজসহ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব মানুষের আত্মত্যাগও জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।’
রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের তিনটি দাবি ছিল—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু বিচার ও সংস্কার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় হলেও তা কার্যকর হয়নি। আপিলের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। আমরা দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি করে রায় কার্যকরের দাবি জানাচ্ছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আবু সাঈদ হত্যার বিচার দ্রুত কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোরও বিচার সম্পন্ন করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’
১৬ জুলাইয়ের তাৎপর্য তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই দিনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু সাঈদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার শাহাদাতের মধ্য দিয়েই গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তাই ১৬ জুলাই শুধু শোকের দিন নয়, এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের দিন।’
এর আগে নাহিদ ইসলাম এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন। পরে তিনি শহীদের বাবা মকবুল হোসেন, মা মনোয়ারা বেগম ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজখবর নেন এবং সমবেদনা জানান।
এ সময় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. আতিক মুজাহিদ, যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাদিয়া ফারজানা দিনা, জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জাহিদ আহসান, সদস্য সচিব ফরহাদ সোহেল, রংপুর জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মো. আল মামুন, সদস্য সচিব আবু রেজা মো. আব্দুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।