১৫৯ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে নাটোরের লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। আজও জাতীয়করণের বাইরে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ঐতিহ্য, ধারাবাহিক সাফল্য এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ না হওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যে, ‘এটি এখন লালপুরবাসীর প্রাণের দাবি’।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ১৮৬৭ সালে পুঠিয়ার মহারাণী শরৎ সুন্দরী দেবী ‘শরৎ সুন্দরী মধ্য ইংরেজি স্কুল’ নামে লালপুরে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৩৫ সালে ‘চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়’ এবং সর্বশেষ ১৯৪১ সালে ‘শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এটি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করে।
১৯৩১ সালের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিন বছরের মাথায় ১৯৩৪ সালে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্থানীয় জমিদার ও শিক্ষানুরাগীদের চেষ্টায় ১৯৩৬ সালে পুনরায় পাঠদান শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটিতে। ১৯৪৮ সালে মূল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা আরো শক্তিশালী হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে পাইলট স্কিমভুক্ত এবং ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতির অনুদান লাভ করে বিদ্যালয়টি। পরে ১৯৯৬ সালে এসএসসি (ভোকেশনাল), ২০০১ সালে এইচএসসি (বিএম) এবং ২০১২ সালে মডেল প্রকল্পভুক্ত হলে এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়।
শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়া ক্ষেত্রেও বিদ্যালয়টির রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিক ভালো ফল ছাড়াও ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, স্কাউট ও বিএনসিসি কার্যক্রমে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে।
মহান মুক্তিযুদ্ধেও এ প্রতিষ্ঠানের ৬৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন, যাদের মধ্যে অনেকে শহীদ হন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিযোগ, সরকারি নীতিমালার সব মানদণ্ড পূরণ করায় ২০১৭ সালে জাতীয়করণের জন্য তখনকার প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া যায়। তবে পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং নাম পরিবর্তন করে তুলনামূলক কম যোগ্য একটি প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু রায়হান বলেন, ‘বিদ্যালয়টি সবদিক থেকে জাতীয়করণ হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।’
সহকারী শিক্ষক শারমিন আক্তার জুথি বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও সাফল্যের যথাযথ স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয়করণ হওয়া উচিত। এতে শিক্ষার মান আরো উন্নত হবে।’
সাবেক শিক্ষার্থী ও ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. অমল কুমার চৌধুরী বলেন, ‘এত পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বাইরে থাকা সত্যিই দুঃখজনক।’
সাবেক শিক্ষার্থী ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। এখন আমার সন্তানও এখানে পড়ে। এত পুরনো একটি প্রতিষ্ঠান এখনো জাতীয়করণ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।’
প্রধান শিক্ষক খাজা শামীম মো. ইলিয়াস হোসেন জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা এক হাজার ২৯৩। শিক্ষক ও কর্মচারী ৪৫ জন। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের জন্য পুনরায় আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব হারুনার রশিদ পাপ্পু বলেন, ‘জাতীয়করণের জন্য তালিকায় নাম আসার পরও রাজনৈতিক কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের দাবি জানাচ্ছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার চাইলে জাতীয়করণের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।’
৫৮ নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতীপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এর গৌরবময় ইতিহাস ও অবদান বিবেচনায় জাতীয়করণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।’