টানা কয়েক দিন ধরেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে আর এতে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে করে ঘরের পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পাশাপাশি নদীগুলোয় উজানের পানির ঢলে দেশের অনেক এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বহু মানুষ। এই পরিস্থিতিতে বাড়ছে নানা সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তারা ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগ, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) এবং কিছু ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ ও ই-এর মতো পানিবাহিত রোগ নিয়ে সচেতন করেছেন।
যেসব রোগ হতে পারে
জলাবদ্ধতা বা বন্যার সময় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন প্রথমত ঝুঁকি তৈরি হয় বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাবার এবং স্যানিটেশনের সংকট থেকে। ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, চারদিকে অনেক পানি আছে, কিন্তু খাবার মতো পানি নেই। এটাই বন্যার সময় সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। ফলে নিরাপদ পানি ও খাবার নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন খাবার ও পানিবাহিত রোগ দ্রুততম সময়ের মাঝেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ডায়রিয়া মূলত পেটের একটি অসুখ। সাধারণত দূষিত পানি আর পচা খাবার থেকে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। ডায়রিয়ার কারণে খুব দ্রুত শরীর থেকে পানি এবং ইলেক্ট্রোলাইট (খনিজ লবণ) বের হয়ে রোগী শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে আর এতে মৃত্যুর ঝুঁকি দেখা দেয়। বিশেষ করে, ডায়রিয়ায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
এদিকে কলেরা হলো ডায়রিয়াজনিত একটি সংক্রামক রোগ, যা দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়। অর্থাৎ সব ডায়রিয়া কলেরা নয়, তবে কলেরার প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র ডায়রিয়া। কলেরার জন্য দায়ী একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া। কলেরার জীবাণুতে আক্রান্ত হলে শরীরে ডায়রিয়া দেখা দেয় ও রোগী ক্রমাগত বমি করতে পারে। রোগী বারবার বমি ও মলত্যাগ করতে থাকে। রোগী পানির তৃষ্ণা বেড়ে যেতে পারে। আবার দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া কিংবা হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে অনেকের। আবার অনেক রোগীর রক্তচাপও কমে যেতে দেখা যায়। আর কারও অবস্থা জটিল হয়ে গেলে কিডনি ফেইলিউর হলে, শকে চলে গেলে বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গেলে মাইক্রো বায়োলজিক্যাল পরীক্ষার দরকার হয়।
মুশতাক হোসেন বলেন, কলেরা ও ডায়রিয়া আলাদা ভাইরাসের কারণে হলেও লক্ষণ প্রায় একই। দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরে পানিশূন্যতা ঠেকানো। আর এজন্য রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব ওরস্যালাইন (ওআরএস) খাওয়ানো, পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করা এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয় ধরনের ঝুঁকি আসে বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে তৈরি হওয়া দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত কারণে। এমনকি শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সাপ লোকালয়ে চলে আসে, ফলে সাপের কামড়ের ঘটনাও বাড়তে পারে। এছাড়া, জলাবদ্ধতার পানিতে হাঁটার সময় কাচ, টিন বা কোনো ধারালো বস্তুর আঘাতে পায়ে ক্ষত হতে পারে আর দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বন্যার পরে যেসব রোগের ঝুঁকি থাকে
বন্যা বা জলাবদ্ধতা না থাকলেও কিন্তু স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকেই যায়। অনেক সময় কিছু রোগ এরপর দেখা দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টাইফয়েড এবং হেপাটাইটিস এ ও ই (জন্ডিস)। বাংলাদেশে পানি ও খাদ্যবাহিত রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এই টাইফয়েড। এই রোগের জটিলতায় শিশুর মস্তিষ্কে প্রদাহ, হেপাটাইটিস, পিত্তথলিতে প্রদাহ, অন্ত্র ছিদ্র হয়ে যাওয়া, অন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। অন্ত্রে রক্তক্ষরণ হলে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ ৭৮ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন এবং এতে প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের ৬৮ শতাংশই শিশু।
হেপাটাইটিস এ ও ই সংক্রান্ত রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পায় বন্যা বা জলাবদ্ধতা কবলিত এলাকায়। হেপাটাইটিস এ ও ই অন্যান্য হেপাটাইটিসের মত মারাত্মক নয়। তবে গর্ভবতী মায়েদের জন্য হেপাটাইটিস ই বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় নিরাপদ পানির ব্যবহার। পাশাপাশি, তৈজসপত্র ধোয়া, গোসল করা এবং অন্যান্য ব্যবহারের পানিও যেন বিশুদ্ধ থাকে সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
জলাবদ্ধতা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাসের ফলে চর্মরোগের ঝুঁকিও তৈরি হয়। কারণ অনেকসময় মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে তিন বা তিন দিনের বেশি সময় ধরে থাকতে হয়। আর সে খান থেকেই অনেকের মাধ্যমে চর্মরোগ ছড়িয়ে যায়। ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, চর্মরোগ যদি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে না পারেন, সেখান থেকে কিডনির সমস্যা হতে পারে। যেমন, যদি কারও স্ক্যাবিস থাকে এবং সে হাত দিয়ে ভাত খায়, তাহলে কিডনির ভেতরে সেই ইনফেকশন যায়।
উল্লেখ্য, স্ক্যাবিস একটি প্যারাসাইটিক বা পরজীবী চর্মরোগ। যে স্থান ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এটা বেশি দেখা যায়। এছাড়া, কারও ত্বকে সংক্রমণ বা ফোঁড়া থাকলেও তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ডা. হোসেন আরও জানান আশ্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘদিন অবস্থানের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যাও বাড়তে পারে।
বন্যা বা জলাবদ্ধতায় নারী-পুরুষ যে কেউ ইউটিআই বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে নারীরাই সাধারণত এতে বেশি আক্রান্ত হন। অন্যদিকে বন্যার মতো দুর্যোগের সময় মানুষের পাশাপাশি অনেক পশু-পাখিও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকে।আর সেখান থেকে প্রাণিবাহিত রোগ অ্যানথ্রাক্স হতে পারে।
কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে সমাধানের উপায়
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারীরা বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে থাকেন। সেই সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই, জ্বর, পেশিব্যথা, ডায়রিয়া বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা নিতে হবে। গর্ভবতী নারীদের, বিশেষ করে যাদের প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসলে তাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে নিতে হবে।
এ ছাড়া ছয় মাস থেকে দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য বুকের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাবারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়া, নিরাপদ টয়লেট, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ দেন ডা. মুশতাক হোসেন।
যাদের শরীরে কাটা বা ক্ষত রয়েছে এবং দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ পানিতে থেকে কাজ করতে হয় তাদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সুস্থ থাকতে জলাবদ্ধতার পানি এড়িয়ে চলতে হবে। এতে নানান রোগ হয়। আর যদি পানিতে নামতেই হয় তাহলে দ্রুত সাবান পানি দিয়ে পরিষ্কার হতে হবে। পরিষ্কার পোশাক পরতে হবে।




