‘আমার কথা কেউ শোনে না, প্রশাসনও আসে না। আমার একার পক্ষে বিশাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব না। কিন্তু চোখের সামনে নদী-নালার দেশি মাছ এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারি না।’
তীব্র ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের খামারগাঁও গ্রামের যুবক হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া।
স্থানীয়রা জানায়, প্রতিদিনই একা বাড়ি থেকে বের হয়ে যান হেলাল। ঘুরে বেড়ান খাল-বিলে। কোথাও অবৈধ চায়না দুয়ারি বা রিং জাল দেখলেই প্রতিবাদ জানান। কেউ শোনেন, কেউ পাগল বলে আখ্যায়িত করেন, ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেন। অনেক জায়গায় লাঞ্ছিতও হতে হয় তাকে। কিন্তু দমে যান না।
জানা গেছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে নান্দাইল উপজেলার নদী, খাল-বিল এবং উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে হাজার হাজার নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ বা রিং জাল ছড়িয়ে পড়েছে। সুক্ষ্ম ফাঁসের এই রাক্ষুসে জালে রেণু থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ ধরা পড়ছে। এমনকি শামুক, ঝিনুক ও অন্যান্য জলজ জীবও রক্ষা পাচ্ছে না। ফলে এ অঞ্চলের দেশি মাছ এবং প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অবৈধ জাল উচ্ছেদ ও মৎস্য সম্পদ রক্ষা করার মূল দায়িত্ব উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের হলেও, রহস্যজনকভাবে সেখানকার কর্মকর্তারা নীরব। প্রশাসনের এই উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু দেশি মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের এই ব্যর্থতার মুখে হতদরিদ্র যুবক হেলাল একা মাঠে নেমেছেন। তিনি নাছোড়বান্দা এবং কোনো হুমকির মুখে হাল ছাড়ার পাত্র নন। যেখানেই অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল দেখছেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানি থেকে সেই জাল টেনে ওপরে তুলে নিয়ে আসছেন।
এখানেই শেষ নয়, হেলাল উদ্দিন বিভিন্ন জলাশয় থেকে অবৈধ জালের হাত থেকে উদ্ধার করা ডিমওয়ালা মা মাছ ও ছোট মাছের পোনা নিজ উদ্যোগে খাল-বিল ও নদীতে অবমুক্ত করছেন। এমনকি নিজের বাড়ির ছোট ছোট পুকুরে তিনি শোল, গজার, টাকি (লাঠি মাছ) ও মলা-ঢেলাসহ বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের পোনা এনে বড় করছেন, যাতে প্রাকৃতিকভাবে এসব মাছের বংশ বাড়ানো যায়।
এদিকে, হেলালের এই ব্যতিক্রম উদ্যোগ ইতিমধ্যে উপজেলার বাসিন্দাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে এটা করতে গিয়ে তিনি পড়েছেন চরম বিপাকে। এলাকার প্রভাবশালী ও অসাধু মাছ শিকারিদের একটি চক্র তাকে প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার চোখের সামনে অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল যেভাবে পাতা হচ্ছে, তা যদি এখনই প্রতিরোধ করা না হয়, তবে আমাদের পরের প্রজন্ম আর দেশি মাছের স্বাদ পাবে না। দেশি মাছ সব বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’ এ ব্যাপারে প্রশাসনের সহযোগিতা চান তিনি।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একজন দরিদ্র যুবক যেখানে নিজের খেয়ে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জীবন বাজি রাখছেন, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের এমন নিষ্ক্রিয়তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এ ব্যাপারে নান্দাইল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন কালের কণ্ঠকে বলেন, মাঠপর্যায়ে আমাদের লোকবলের অভাব রয়েছে। তার পরও প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো মতেই অবৈধ জালের ব্যবহার থামানো যাচ্ছে না।’




